ইব্রাহীম ও ইসমাইল আলাইহিসসালামের জীবন থেকে দশটি শিক্ষা ।। ব্যারিষ্টার হামিদ আজাদ

প্রবন্ধ-কলাম সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

পবিত্র ঈদুল আজহার বরকতময় দিনগুলো আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। এ মহিমান্বিত দিনগুলো এসেছিল অনেক বরকত ও পুরস্কারের বার্তা নিয়ে। এ বার্তার মাঝে সুশোভিত শিক্ষা সমুহ লুকিয়ে আছে মহান আল্লাহর একান্ত প্রিয় বান্দাহ ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) কর্তৃক শুধু আল্লাহর জন‍্যেই নিবেদিত ত‍্যাগ ও কোরবানীর অনন‍্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ইতিহাসের মধ‍্যে।

এ মহিমান্বিত দিনগুলোর বিদায় লগ্নে আসুন, আমরা ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর জীবন থেকে উৎসারিত চিরন্তন শিক্ষার আলোকে জীবন গঠনের অঙ্গীকার করি। এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষাগুলো নিয়ে চিন্তা করি এবং সেগুলোকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ধারণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।

নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাঈল (আ.)-এর জীবন থেকে আমি দশটি মৌলিক শিক্ষা অনুধাবন করেছি, যার অনুসরন আমাদের ব‍্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে সুখী, সমৃদ্ব ও আলোকিত জীবনে রুপান্তরিত করতে পারে। তাই আমার ঈদের দিনের খুতবা ছিল কোরআন ও হাদীসের রেফারেন্স-সহ (reference) মূলত এ শিক্ষাকে কেন্দ্র করে। কেউ যদি এ শিক্ষাসমূহ থেকে সামান‍্য উপকৃত হন তাহলে আমার লেখা সার্থক হবে- এ প্রত‍্যাশায় আল্লাহর প্রিয় এ দুই পয়গাম্বরের সার্থক জীবনের বাগান থেকে কুড়ানো দশটি শিক্ষা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।

১. জীবন যখন সহজ ও স্বচ্ছন্দ থাকে, তখন নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্যের জন্য প্রিয়তম কিছু বিসর্জন দিতে পারার মাধ‍্যমেই ঈমানের সত্যতা প্রমাণিত হয়। নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাঈল (আ.)-এর আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ঈমান ত্যাগ ও আনুগত্যের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়।

২. আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম নির্ভরতা কঠিনতম পরীক্ষাকেও অনন্তকালের বিস্ময়ে পরিণত করে। তাঁদের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের সব নিশ্চয়তা ও পার্থিব উপায় যখন নিঃশেষ হয়ে যায়, তখনই আল্লাহর প্রজ্ঞা ও হিকমত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৩. একজন নেককার পিতা-মাতা কেবল কথার মাধ্যমে নয়, নিজের জীবনাচরণ ও আদর্শের মাধ্যমেই সন্তানের ঈমানভিত্তিক জীবন গড়ে তোলেন। নবী ইবরাহিম (আ.) তাঁর চরিত্র, কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে ইসমাঈল (আ.)-কে নিষ্ঠা, সাহস ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

৪. সবচেয়ে সূদৃদৃঢ় পরিবার আরাম-আয়েশের বন্ধনে নয়; বরং অভিন্ন ঈমান ও নিরেট আল্লাহর ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকে।
পিতা ও পুত্র আনুগত্য, ধৈর্য ও ইবাদতে একসঙ্গে অবিচল ছিলেন। ইবরাহীম ও ইসমাইল (আঃ) আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসে উদ্ভাসিত ঐক্যবদ্ধ পরিবার গঠন ও সংরক্ষনে এক অনন্য ও চিরন্তন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

৫. কোরবানি প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ ও বিসর্জন দেওয়ার নাম নয়; বরং আল্লাহকে সবকিছুর চেয়ে অধিক ভালোবাসার নাম। কোরবানির শিক্ষা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পার্থিব সব সম্পর্ক, আকর্ষণ ও আসক্তির ঊর্ধ্বে আল্লাহকে স্থান দিতে হবে।

৬. হৃদয় যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন তিনি সে হৃদয়ে কষ্টের পরিবর্তে রহমত ও অনাবিল প্রশান্তি দান করেন। আল্লাহ তাঁদের কোরবানির পরিবর্তে একটি দুম্বা দান করেছিলেন এবং তাঁদের আনুগত্য ও একনিষ্ঠতাকে যুগে যুগে সম্মানের আসনে সমাসীন করেছেন।

৭. পৃথিবীর স্বীকৃতি লাভের বহু আগেই মহান উত্তরাধিকার নির্মিত হয় আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ভিত্তির ওপর। কাবা শরিফের পুনর্নির্মাণ শুরু হয়েছিল বিনম্র আনুগত্য, বিশুদ্ধ নিয়ত এবং অবিচল ঈমানের মাধ্যমে।

৮. অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার সময়ে ধৈর্য ধারণই আল্লাহপ্রদত্ত পুরস্কারের দ্বার উন্মুক্ত করে। হাজেরা (আ.), ইবরাহিম (আ.) এবং ইসমাঈল (আ.) প্রত্যেকেই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে পবিত্র ইতিহাসের অংশ এবং স্থায়ী ইবাদতের নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

৯. ঈমানের আলোয় লালিত সন্তান জীবনের বোঝা নয়; বরং নেককাজে সহযাত্রী ও একনিষ্ট সহযোগী বন্দ্বুতে পরিণত হয়।
ইসমাঈল (আ.) সর্বশ্রেষ্ঠ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে ঈমান, মর্যাদা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি অকপটে তার বাবাকে আল্লাহর হুকুম পালনার্থে তাকে কোরবানী করার ক্ষেত্রকে দ্বিধা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে এ কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্যশীল হিসেবে পাবেন।

১০. সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করা হয় তাঁদের, যারা আত্মম্ভরিতা ও প্রবৃত্তির পরিবর্তে আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত বিনয়ী জীবনকে বেছে নেন। হাজার বছর পরও কোটি কোটি বনি আদম ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) হযরত হাজেরা (রা.) এর প্রতিসম্মান প্রদর্শন এ বাস্তবতার এক চিরন্তন নিদর্শন।

নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাঈল (আ.)-এর ঘটনা যুগে যুগে এবং বিশ্বব্যাপী অগণিত মুমিনের হৃদয়ে প্রেরণা, শক্তি ও পথনির্দেশনার উৎস হয়ে আছে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের সোনালী জীবন থেকে উৎসারিত শিক্ষার আলোতে জীবনকে আলোকিত করার তৌফিক দান করুন, আমীন।

* ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ এমসিএ’র কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট, খ্যাতিমান আইনজীবী ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *