অবৈধ বালু উত্তোলন : সিলেটের জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের ২৫ গ্রাম বিলীন হওয়ার পথে

সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

* সংসদ সদস্যদের নির্দেশনায় কাজ হচ্ছে না * ৫ মন্ত্রীর কাছে আবেদন

হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সিলেট থেকে :

সিলেটের বিভিন্ন নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। এতে নদী তীর, কৃষি জমি, বাড়ীঘর সহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর ভয়াবহ চিত্র দেখলে মনেই হয় না যে দেশে কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কার্যকর আছে। কোন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাকি দিয়ে বা মহল বিশেষকে হাত করে ইজারা বহির্ভূত স্থান থেকেও বালি উত্তোলন চলছে।

সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে ইজারা বহির্ভূত যায়গা থেকে বালি উত্তোলন করে একটি চক্র দৈনিক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শুক্রবার স্থানীয় এমপি মুফতি আবুল হাসারনর শরণাপন্ন হলে তিনি উপজেলা প্রশাসককে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেন। কিন্তু শনিবারও ইজারা বহির্ভূত যায়গা থেকে বালু লুটের দৃশ্য দেখা যায়।

এদিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদী তীরের ঘাগটিয়া তীরবর্তী অবস্থা ভয়াবহ। অবৈধ বালু উত্তোলনে ঘটিয়া গ্রামও বিলীন হতে চলছে। ভাঙ্গনের মুখে বাড়ী ছেড়ে অনেক পরিবার চলে গেছেন দুটি স্থান থেকে।

জকিগঞ্জের শাহগলির চক গ্রামের মারুফ নামের স্বল্প আয়ের বাসিন্দার বসত ভিটা সুরমা নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হলে তিনি দিন রাত আহাজারি করছেন। তার আহাজারি দেশ-বিদেশে ভাইরাল হলেও কোন প্রতিকার নেই। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা মারুফকে হুমকী দিয়ে চলছে।

মারুফ বলেন, অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। স্ত্রী ও ছোট তিন বাচ্ছা নিয়ে আমার যাওয়ার যায়গা নেই। পরিবেশ ধংশী ‘চারটি হাইড্রোলিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে ২০-২২টি বড় বড় ষ্টীল বডি নৌকায়। এলাকার সবজি গ্রাম সমবায় সমিতির কোটি টাকা ব্যয়ে পানির পাইপ লাইন বিলীন হওয়ার পথে।

হুমকীর মুখে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মসজিদ, বসতবাড়ী, হাটবাজার, দোকানপাট, ফসলী জমি, স্কুল সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গ্রামবাসীর অনেকেই ক্ষোভে ফুঁসছেন।

সূত্র মতে জনৈক ব্যক্তি এক কোটি ৬৪ লাখ টাকা ইজারা মূল্যে সুরমা নদীর দক্ষিণের অংশে জকিগঞ্জ নয়াগ্রাম এলাকার একটি বালু মহাল ইজারা নেন। কিন্তু ইজারাদারের লোকজন ইজারা বহির্ভূত কানাইঘাটের কায়স্থগ্রাম সহ আরো কয়েকটি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালি উঠাচ্ছেন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

গ্রামবাসী জানান, এতে এলাকার বহু স্থাপনা নদী ভাঙ্গনে পড়েছে। প্রতিবাদ জানালেও কাজ হয়নি। দৈনিক অন্তত কোটি টাকার বালি উঠানো হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ অবৈধ ।

প্রতিকার চেয়ে বুধবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সহ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৫ জন মন্ত্রী- বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রী বরাবরে লিখিত আবেদন করেছেন। সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অভিযোগ শুনেছি। কোন ধরণের অবৈধ কার্যক্রম চলবেনা। এসবের বিরুদ্ধে শিগ্রই টাষ্ক ফোর্স নামানো হবে।’

গত ৩০ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার টিএনও-কে জরুরী ভাবে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। নিদের্শনার পর উপজেলা প্রশাসন আবারো ‘লালপতাকা’ টানিয়ে ইজারাকৃত ভূমি চিহ্নিত করে ইজারাদাকে সতর্ক করেন। কিন্তু তারা ইজারা বহির্ভূত এলাকা থেকে বালি উত্তোলন করে চলছেই।

সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের চোখ ফকি দিতে তারা ভিন্ন কৌশলে বালি উত্তোলন করছে। ভোর ৩ টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ইজারা বাহিভূত যায়গা থেকে বালি উত্তোলন করে। আর দিনের বেলা তারা ড্রেজার বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে।

জকিগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজিত কুমার চন্দ্র জানালেন, তিনি অফিস থেকে লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা বলেছে, ইজরাকৃত যায়গা থেকে বালি তুলছে। অবস্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অবৈধ বালি উত্তোলনে কানাইঘাটে সুরমা নদী তীব্র ভাঙ্গনে মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে কানাইঘাটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহদী হাসান শাকিল বলেন, জকিগঞ্জে বালি উত্তোলনের বিষয়টি ঐ উপজেলার এখতিয়ারধীন।

অন্যদিকে কানাইঘাট উপজেলার বাণীগ্রাম ইউপির বড়দেশ দক্ষিণ ও কায়স্থগ্রামের বাসিন্দারা জানান, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরামা নদীর দুই তীরে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এ গুলো বিলীন হওয়ার পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *