আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের লুটেরাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মারাত্মকভাবে উৎকণ্ঠিত ইসলামি ব্যাংকের ৫০ লাখ প্রবাসী গ্রাহক

অর্থনীতি প্রবাসী বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

লন্ডনে ‘ইসলামি ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদ’ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এই ব্যাংকে এস আলম গ্রুপ-সহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের লুটেরাদের আইনের আওতায় না নিয়ে বরং বর্তমান সরকারের আমলেও তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে। এতে সৃষ্ট চলমান অস্থিরতায় প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী গ্রাহক মারাত্মকভাবে উৎকণ্ঠিত। এ ব্যাপারে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, আর্থিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যতায় ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ প্রবাসী দেশে রেমিটেন্স প্রেরণে বিমুখ হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক গোলাম মুর্তজা সিআইপি এ কথা বলেছেন। আরো বক্তব্য রাখেন সদস্য সচীব মাহদুদুর রহমান সুমন, সিনিয়র যুগ্ম আবায়ক বদরুজ্জামান বাবুল, যুগ্ম আবায়ক মাওলানা জুবেয়ের আহমদ, উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আতাউর রহমান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা কেএম আবুতাহের চৌধুরী-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র হিসাবধারী, আমানতকারী ও শুভানুধ্যায়ী প্রবাসীবৃন্দের পক্ষ থেকে “ইসলামি ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদ” গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক এই ব্যাংকের বৈধ ও প্রতিষ্ঠাতাদের মালিকানা কেড়ে নিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে ঋণ প্রদানে অনিয়ম, শেল কোম্পানির নামে অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতির মতো সংকটে জর্জরিত হয়।

‘প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা’ তুলে ধরে সাংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, বিগত প্রায় তিন দশক ধরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি প্রবাসী আয় সংগ্রহে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকটি রেমিট্যান্স সংগ্রহে দেশের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স গিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে একাই প্রায় ৬.৮৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে ইসলামী ব্যাংক, যা আগের অর্থবছরের প্রায় ৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। এই বিপুল অঙ্কের প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে আমাদের মতো লাখো মানুষের প্রবাসজীবনের ঘাম ঝরা পরিশ্রম এবং দেশ ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা। আর এই ব্যাংকের ভালো-মন্দের সাথে আমাদের প্রবাসীদের ভাগ্য সরাসরি জড়িত।

‘জাতীয় অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকের অবদানে’র বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শুধু একটি ব্যাংক নয়, এটি দেশের প্রথম শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৮৩ সাল থেকে জাতীয় অর্থনীতির একটি স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সবগুলো ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত আমানতের মধ্যে একাই প্রায় ৩৮ শতাংশ আমানত ধরে রেখে ইসলামী ব্যাংক শীর্ষস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এই ব্যাংকের বাজার-অংশ প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা প্রমাণ করে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত মূলত এই একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। সারাদেশে প্রায় চারশত শাখা, আড়াইশতাধিক উপশাখা ও হাজার হাজার এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে ব্যাংকটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন, কৃষিঋণ, ইসলামী মাইক্রোফাইন্যান্স এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শীর্ষ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও পরিচিত।

বক্তারা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু একটি ব্যাংকে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জাতীয় অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ইসলামি ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর আমরা আশা করেছিলাম জাতীয় স্বার্থে এই ব্যাংককে তার আপন মহিমায় ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে আওয়ামী লুটেরাদের আইনের আওতায় এনে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করবে। কিন্ত তা না করে ব্যাংকটির প্রকৃত পরিচালনা পর্ষদে বারবার রদবদলের ফলে এখন চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একাধিকবার চেয়ারম্যান পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এবং সবশেষ লুটেরা এস আলম-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে ইসলামি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের পর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বহু গ্রাহক বিপুল পরিমান টাকা উত্তোলন করেছেন।

‘প্রবাসীরা কেন এই ব্যাংকের বিষয়ে সচেতন’- সে বিষয়ে বলা হয়, আমরা প্রবাসীরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে কষ্ট করে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাই আমাদের বাবা-মায়ের সেবা ও চিকিৎসা, পরিবার ও আত্নীয়-স্বজনকে সহায়তা এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্য। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৫০ লাখের অধিক প্রবাসীর অর্থ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমেই দেশে পৌঁছায় এবং অনেক প্রবাসীর পরিবারের হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও বিনিয়োগ এই ব্যাংকেই রক্ষিত। তাই ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ি আমরা প্রবাসীরা— যারা দেশে গিয়ে ব্যাংকের প্রাত্যহিক পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। প্রবাস থেকে সংবাদপত্র ও স্বজনদের মাধ্যমে ব্যাংকের সংকট সম্পর্কে অবহিত হয়ে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ থেকেই আমরা প্রবাসীরা সংগঠিত হয়ে আমাদের অধিকার ও দাবির কথা তুলে ধরছি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে “ইসলামি ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদ” নেতৃবন্দ বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট ৮দফা দাবি জানিয়েছেন।

১. স্বাধীন ও পেশাদার পর্ষদ গঠন
প্রবাসী ও দেশীয় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সততা, দক্ষতা ও ইসলামী ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে ইসলামী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। একটি স্থায়ী ও যোগ্য পর্ষদ ছাড়া ব্যাংকের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল থাকবে, যা প্রবাসীদের পাঠানো আমানতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

২. প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা প্রত্যর্পণ
২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেভাবে এই ব্যাংকের বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠাতা মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। মালিকানার এই অস্বচ্ছতা দূর না হলে ব্যাংকটি বারবার রাজনৈতিক পালাবদলের শিকার হতে থাকবে এবং প্রবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা আর ফিরে আসবে না।

৩. লুটপাটের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন
ইসলামী ব্যাংক-সহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এস আলম-সহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের বিচারের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ব্যাংকিং খাতকে এভাবে জিম্মি করার সাহস না পায়।

৪. স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে যেকোনো বিতর্কিত বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ছড়ানো উদ্দেশ্য প্রণোদিত গুজব ও অপপ্রচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে প্রবাসীদের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক তৈরি না হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাহত না হয়।

৫. পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ
একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় সমন্বয় করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি এসব মামলায় উচ্চ আদালত থেকে অভিযুক্তরা যেন কোনো অন্যায্য ‘স্থিতাবস্থা’ বা অযাচিত আইনি সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিতে প্রয়োজনে দ্রুত আইন সংশোধন করতে হবে।

৬. প্রবাসীবান্ধব সেবা নিশ্চিতকরণ
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ, পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ অনলাইনে স্থানান্তর, বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সেবাসমূহ যেন ব্যাংক-সংকটের কারণে কোনোভাবে ব্যাহত বা বিলম্বিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. রাজনৈতিক ও কর্পোরেট প্রভাবমুক্ত পরিচালনা
ইসলামী ব্যাংককে সব ধরনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও কর্পোরেট প্রভাবমুক্ত রেখে প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতাদের মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিং নীতিমালার আলোকে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ব্যাংকটি পুনরায় কোনো লুটেরা বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের কবলে না পড়ে এবং এর ব্যাংকের ইসলামী চরিত্র অক্ষুণ্ন থাকে।

৮. প্রবাসী পরিচালক নিয়োগ
প্রবাসী রেমিট্যান্স সংগ্রহে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বরাবরই দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় অর্ধকোটি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধার অক্লান্ত পরিশ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। তাই ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের সময় প্রবাসী প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণের কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের মধ্য থেকে অন্তত একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিনিধিকে পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর ফলে প্রবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে এবং প্রবাসীবান্ধব ব্যাংকিং সেবা আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হবে।

* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *