লন্ডন বারা অব টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ৪র্থ বারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক লুৎফুর রহমান। এবার একঝাঁক মেধাবীদের নিয়ে গড়েছেন তাঁর পারিষদ। কর্মঠ ও উদ্যমী ব্যক্তিত্বদের অগ্রাধিকার দিয়ে গঠন করা হয়েছে কাউন্সিলের নতুন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও ক্যাবিনেট ।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) নতুন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্তদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সভাটি বুধবার (২০ মে ২০২৬) হোয়াইটচ্যাপেল রোডস্থ টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়।

বেথনাল গ্রিন ওয়েস্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মুস্তাক আহমদ স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ল্যান্সবারি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন।
স্পিকার হিসেবে কাউন্সিলর মুস্তাক আহমদ বারার প্রথম নাগরিক (ফারস্ট সিটিজেন) হিসেবে বিভিন্ন নাগরিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনে প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বারার একজন দূত হিসেবে কাজ করবেন। তিনি কাউন্সিল সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের স্বাগত জানাবেন।

চলতি মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসনের ক্যাবিনেট পোর্টফোলিও হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের নামও বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) চূড়ান্ত করা হয়।
কাউন্সিলর মাইউম তালুকদার বিধিবদ্ধ (স্ট্যাটুটরি) ডেপুটি মেয়র হিসেবে বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবেলা, গ্রাহক সেবা উন্নয়ন এবং স্বেচ্ছাসেবী খাত সম্পৃক্ততা বিষয়ক পোর্টফোলিও (ক্যাবিনেট মেম্বার ফর ট্যাকলিং ইনইকুয়ালিটি অ্যান্ড দ্য কস্ট অব লিভিং, ইমপ্রুভিং কাস্টমার সার্ভিসেস, অ্যান্ড ভলান্টারি সেক্টর এনগেজমেন্ট) পরিচালনা করবেন।
ক্যাবিনেট মেম্বার ফর হোমবিল্ডিং অ্যান্ড এনহ্যান্সিং কাউন্সিল হোমস অ্যান্ড নেবারহুডস (গৃহনির্মাণ ও কাউন্সিল আবাসন এবং আশপাশের এলাকার উন্নয়ন) হিসেবে কাউন্সিলর সাইদ আহমেদ, ক্যাবিনেট মেম্বার ফর ফাইন্যান্স, অ্যাসেটস অ্যান্ড গভর্নেন্স (অর্থ, সম্পদ ও প্রশাসন) হিসেবে কাউন্সিলর আবু তালহা চৌধুরী, ক্যাবিনেট মেম্বার ফর সেফ কমিউনিটিজ অ্যান্ড কমিউনিটি কোহেশন (নিরাপদ সম্প্রদায় ও সামাজিক সংহতি বিষয়ক) হিসেবে কাউন্সিলর কবির আহমেদ এবং ক্যাবিনেট মেম্বার ফর এ ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন বারা (পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বারা) হিসেবে কাউন্সিলর শফি আহমেদ দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া, ক্যাবিনেট মেম্বার ফর হেলদি, কেয়ারিং অ্যান্ড ইনক্লুসিভ কমিউনিটিজ সুস্বাস্থ্য, সেবা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ) হিসেবে কাউন্সিলর সাবিনা আক্তার, ক্যাবিনেট মেম্বার ফর লেজার, কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম (অবকাশ, সংস্কৃতি ও পর্যটন) হিসেবে কাউন্সিলর মিনারা খাতুন, এবং ক্যাবিনেট মেম্বার ফর জবস, এন্টারপ্রাইজ, স্কিলস অ্যান্ড গ্রোথ (কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধি) হিসেবে কাউন্সিলর সোনালি মিয়া এবং ক্যাবিনেট মেম্বার ফর চিলড্রেন, ইয়াং পিপল অ্যান্ড লাইফ চান্সেস (শিশু, তরুণ ও জীবনমান উন্নয়ন) হিসেবে কাউন্সিলর ফয়সাল আহমেদ দায়িত্ব পালন করবেন।
একই সঙ্গে কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর চেয়ারদের নামও নিশ্চিত করা হয়েছে। ওভারভিউ অ্যান্ড স্ক্রুটিনি কমিটির (সার্বিক পর্যালোচনা ও যাচাই কমিটি) চেয়ার হয়েছেন কাউন্সিলর হালিমা ইসলাম, ডেভেলপমেন্ট (উন্নয়ন) কমিটির চেয়ার কাউন্সিলর আবদুল ওয়াহিদ এবং স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপমেন্ট (কৌশলগত উন্নয়ন) কমিটির চেয়ার হয়েছেন কাউন্সিলর আমিন রহমান।
জেনারেল পারপোসেস (সাধারণ উদ্দেশ্য) কমিটির চেয়ার হিসেবে রয়েছেন কাউন্সিলর কামরুল হোসেন, পেনশনস কমিটির চেয়ার কাউন্সিলর সুলুক আহমেদ এবং লাইসেন্সিং কমিটি ও লাইসেন্সিং রেগুলেটরি (লাইসেন্সিং কমিটি ও লাইসেন্সিং নিয়ন্ত্রণ) কমিটির চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাউন্সিলর পিটার গোল্ডস। হিউম্যান রিসোর্সেস (মানবসম্পদ) কমিটির চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাউন্সিলর হারুন মিয়া।

নির্বাচনের পর এক প্রতিক্রিয়ায় স্পিকার মুস্তাক আহমদ বলেন, “এটি আমার জন্য গভীর সম্মান, বিনয় এবং বড় দায়িত্বের মুহূর্ত। টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, যাদের আস্থা আমার জনসেবার আকাঙ্খাকে সম্ভব করে তোলে এবং যা একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য সর্বোচ্চ সম্মান।”
তিনি আরও বলেন, “আমার জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ কাজ, কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে গড়ে ওঠা। রেস্টুরেন্টে কাজ থেকে শুরু করে ব্যবসা এবং পরবর্তীতে পরিবার লালন-পালনের পাশাপাশি শিক্ষায় ফিরে আসা- এসব অভিজ্ঞতা আমাকে কাজের মর্যাদা, সুযোগের গুরুত্ব এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগ সম্পর্কে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।”
মুস্তাক আহমদ টাওয়ার হ্যামলেটসকে আধুনিক ব্রিটেনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এটি বৈচিত্র্যময়, দৃঢ়, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কমিউনিটি-কেন্দ্রিক একটি বারা।” তিনি জানান, পরবর্তী কাউন্সিল সভায় তাঁর নির্বাচিত দাতব্য সংস্থাগুলোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

উল্লেখ্য, অ্যাসপায়ার নেতা টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারি দল লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলামকে হারিয়ে বিপুল ব্যবধানে বিজয় লাভ করেছেন। সিরাজ পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট।
এই বারায় দেশে প্রধান দল সমূহকে হারিয়ে ৪৫ আসনের মাঝে ৩৩টিতে বিজয়ী হয়েছেন অ্যাসপায়ার প্রার্থীরা। লুৎফুর রহমান গত এক যুগে দেখিয়েছেন সুদৃঢ় নেতৃত্বের ফলে স্থানীয় কাউন্সিল কিভাবে রূপান্তরমূলক হতে পারে। যে নেতৃত্বের শৈলী অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং লক্ষ্য অর্জনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
লুৎফুর রহমানের রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব (Transformational Leadership) দূরদর্শী, অনুকরণীয়, এবং কর্মীদের ক্ষমতায়ন, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে কাজের মান ও আনুগত্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এখন টাওয়ার হ্যামলেটসের বহু মানবিক ও নান্দনিক উদ্যোগ গ্রেট ব্রিটেনে অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারো লুৎফুর রহমান ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ফ্রি ট্রাভেল পাস, সুইমিং পুল, প্রেগন্যান্সি পেমেন্ট, পার্কিং সুবিধা সহ ১৪৮ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লুৎফুর রহমান।
জনগণ তাদের প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসায় মূল্যবান ভোট প্রদানের জন্য মেয়র লুৎফুর রহমান কমিউনিটির সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কাউন্সিলের জনগণ আমার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন। তাদের কাছে আমার দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে গেল। যারা এবারো ভোট দিয়েছেন এবং যারা ভোট দেননি, সবাকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও অঙ্গীকার করেন তিনি।
প্রায় এক যুগ আগে, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথম বাংলাদেশী নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন লুৎফুর রহমান। ২০১৪ ও ২০২২ সালে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর প্রাগমেটিক নেতৃত্বে (Pragmatic Leadership) কমিউনিটির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর যৌক্তিক এবং কার্যকর সমাধান প্রদানের মাধ্যমে গণ মানুষের মাঝে আস্থার জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
ফলে দীর্ঘ সময়ের নির্ভরযোগ্যতায় নির্বাহী মেয়র হিসেবে চতুর্থ বার বিজয়ী হয়ে নতুন রেকর্ড সৃস্টি করেছেন। তার দল, অ্যাসপায়ার পার্টি ২০২২ সালের নির্বাচনে তখনকার সরকারি দল কনজারভেটিভ ও বিরোধী দল লেবারকে হারিয়ে লন্ডনের একটি কাউন্সিলে বিজয়ী প্রথম দল হিসেবে ইতিহাস গড়ে। এবারও অ্যাসপায়ার আরো বড় ব্যবধানে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
৭ মে যুক্তরাজ্যের সর্বত্র স্থানীয় নির্বাচন হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচন। মূলত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ২০১০ সালের ২১ অক্টোবরের নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের বিজয়ের মধ্যদিয়ে বৃটিশ বাংলাদেশিরা বৃটেনে এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেন। ১ম বাংলাদেশি নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখান লুৎফুর রহমান। বৃটেনে ১৩ জন নির্বাচিত মেয়রের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র অশ্বেতাঙ্গ এবং প্রথম মুসলিম ও প্রথম বাংলাদেশি মেয়র। অন্য সকলেই শ্বেতাঙ্গ।
তখন বৃটেনের শীর্ষ পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফে সেরা ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন মেয়র লুতফুর রহমান। টানা ৩য় বারের মতো তিনি এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আগের বারের চেয়ে পরের বার তিনি ২৫ ধাপ এগিয়ে ৫৩ নম্বরে স্থান করে নেন। টপ হান্ড্রেডস মোস্ট ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তিদের মধ্যে লুৎফুর রহমান ২০১১ সালে ৭৮তম স্থান লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি ১০ জনকে টপকে যান। এভাবে দু বছরে ২৫ জনকে ছাড়িয়ে ৭৮ থেকে ৫৩তে স্থান করে নেন।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

