সাত.
প্রতিটি প্রবাসীর মধ্যে দেশের জন্য ভালোবাসা কাজ করে। আর এই ভালোবাসা থেকেই দেশের জন্য কাজ করতে মন চায়। এ এক অদম্য ইচ্ছা। এই ইচ্ছা যে মানসিকতা তৈরি হয়, এখানে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না; বরং এটি হয় কর্তব্যবোধের এক গভীর অভ্যন্তরীণ আন্দোলন। তেমনই আমার কাছেও বাংলাদেশ বরারই একটি ভালোবাসার জায়গা। আমি এটিকে কেবল আমার জন্মভূমি মনে করি না। আমি মনে করি, এই দেশই আমাকে ‘আমি’ বানিয়েছে, আমাকে মূল্যবোধ শিখিয়েছে; গড়ে দিয়েছে আমার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। এই গল্প দৃঢ়তার গল্প। এই অঞ্চলের মানুষ অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে অভ্যস্ত। কিন্তু তবুও কোনো না কোনো কারণে আমার দেশের অমিত সম্ভাবনা এখনও বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। তবে ২০২৪-এর গ্রীষ্মে এই দেশ একটি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন এটি বিপ্লবী আন্দোলন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে ওঠে। এই আন্দোলন ছিল স্বদেশি আন্দোলন, নির্ভীক ও স্বপ্নবাজ মানুষদের আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূলে ছিল গণমানুষের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও সীমাহীন ধৈর্য শক্তি। এইসব মিলিয়ে এই আন্দোলন আমাদের দেশের গতিপথকে বদলে দিয়েছে।
যদিও আমি বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করি, তবুও এই দেশের ওপর থেকে আত্মবিশ্বাস আমার কখনোই নষ্ট হয়নি। আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেটি ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকে গণতন্ত্রের এক বিশাল বাতিঘরে পরিণত হতে পারে। বিভিন্ন কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও উন্নয়নমূলক পথপানে এগিয়ে যেতে পারে অমিত সম্ভাবনা সঙ্গে করে। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার দেশ আবারও বাংলা সালতানাতের স্পৃহায় উজ্জীবিত হয়ে পুনরায় জ্বলে উঠবে।
বাংলা সালতানাত হচ্ছে সেই যুগের নাম, যখন আমাদের এই বঙ্গভূমি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি সবকিছুর জন্য একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
যদিও আমাদের দেশ একটি স্বাধীন দেশ; সীমাহীন কষ্ট ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এই দেশের মানুষ এই স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তবুও বাংলাদেশ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক কম্পাস নির্ধারণ করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে, সংগ্রামের সম্মুখীন হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭১-এর প্রতিজ্ঞা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞা নয়; বরং এটি একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক শিক্ষিত ও উন্নয়নমূলক সমাজব্যবস্থার শুভ্র স্বপ্ন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বহু দশক পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং স্বপ্নবাজ নেতৃত্বের অভাবে এই দেশ এখনও পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণের ধারে কাছেও যেতে পারেনি।

এই যে বাংলাদেশ এক জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এর পেছনে একটি প্রধান সংকট কাজ করে। সেটি হচ্ছে, বুদ্ধিবৃত্তিক জড়তা। এটি আমাদের আমাদের পরিপূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের সোনালি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখন দেখা যাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। এই বাংলা ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের একটি প্রাণকেন্দ্র। বাংলা সালতানাতের সোনালি যুগের কথা আমরা ইতোমধ্যেই বলেছি। ১৪ শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত জুড়ে থাকা এই বাংলা সালতানাত জ্ঞানবিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অবাধ চর্চার এক বিকাশমান কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত হয়েছিল বিশ্বদরবারে।
এই বাংলা থেকেই বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, জ্ঞানবিদ পন্ডিত ব্যক্তিগণ দক্ষিণ এশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট রচনা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এই আত্মবিশ্বাস ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গেছে শতাব্দীব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়ারে। ব্রিটিশরা খুব সাবধানে ও চাতুর্যের সাথে আমাদের স্বভাবসুলভ জ্ঞান তৃষ্ণা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
সৃজনশীল জ্ঞানচর্চার বদলে আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে বশ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে এই অঞ্চল থেকে উন্মুক্ত ও সৃজনশীল জ্ঞানকেন্দ্র সরে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভূরিভূরি এমন প্রতিষ্ঠান, যেগুলো আমাদের আজ ভাষা, সংস্কৃতি ও চেতনার দিক থেকে ব্রিটিশদের গোলামি করতেই শেখায়। এরপর যখন বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হলো, তবুও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে এই গোলামি থেকে এই দেশ মুক্তি পেল না। এখনও পর্যন্ত এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশদের গোলামিই করে যাচ্ছে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনি অত্যন্ত সূক্ষভাবে লক্ষ করলে বুঝতে পারবেন, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রমোট করা হয় না; বরং এখানে না বুঝে কেবল মুখস্থ করার প্রবণতাই বেশি। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করা যায়নি বিধায় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো একেকটি রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই মুক্তচিন্তা চর্চা করার ছাত্রশক্তি বের হচ্ছে না।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের কারণে আমাদের সমাজ থেকে নৈতিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে গেছে। ফলে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতি নিয়ে স্বপ্নবাজ একদল লোক যে কাজ করবে, তারা বিভিন্নভাবে কোণঠাসা হয়ে আছে।
সুতরাং বোঝা গেল, বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা। কাজেই বাংলাদেশকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই আমাদের হারিয়ে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ কাজে আমাদের প্রয়োজন এমন এক প্রজন্মের, যেখানে চিন্তাবিদ, নেতা এবং স্বপ্নবাজ নাগরিকেরা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে আধুনিক সমাজের সমস্ত জটিলতা মোকাবিলা করতে পারবে। আধুনিক হতে গিয়ে তারা কোনোভাবেই আমাদের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেবে না।
আমাদের দরকার এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা শুধু পরীক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে জানার মানসিকতা তৈরি হবে। তৈরি হবে উদ্ভাবনী শক্তি ও জ্ঞানচর্চার এক অদম্য স্পৃহা। এই সময় কিন্তু চলে এসেছে। বাংলাদেশকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার সেই মহতী দায়িত্ব পালন করার মুহূর্ত আমাদের সামনে উপস্থিত।
আমরা চাই, আমাদের দেশ শুধু একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা না হয়ে বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে পারুক। কোনোমতে টিকে থেকে ইতিহাস হয়ে মানচিত্রে জায়গা দখল না করে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে থাকুক একটি আদর্শ দেশ হিসেবে।
এই বই কেবল অতীতের চিন্তাভাবনা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি স্পষ্ট আহবান। বাংলাদেশ আজ এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। এই দেশের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আর আসেনি। তা ছাড়া গোটা পৃথিবী এক অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই যদি এই দেশের জনগণ বর্তমান যুগের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মেটাতে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে না যায়, তাহলে এই দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
তদুপরি দেশ-বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক স্পৃহাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হবে। যেই স্পৃহা একসময় গোটা বাংলাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছিল, সেটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই জাতির এখন এমন এক ভাবুক, কর্মনিষ্ঠ ও নেতৃত্ব পরায়ণ প্রজন্মের প্রয়োজন, যারা তাদের ইতিহাসকে কখনো ভুলে যাবে না; বরং ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের গোড়াকে শক্ত রেখেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবে। এই জাতির নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্রকে কেবল গভর্নেন্স সিস্টেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং এটিকে একটি জীবন পদ্ধতি হিসেবে বাস্তবায়ন করবে। এই দেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি হবে এমন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজ কণ্ঠে অকুণ্ঠচিত্তে কথা বলতে পারবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার এই মহতী কার্যক্রমে নিজের ভূমিকাটুকু স্বাধীনভাবে পালন করতে সক্ষম হবে।
আমাদের মাথায় রাখতে হবে, কোনো জাতির সত্যিকারের শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতি কতটা শক্তিশালী, তা নির্ভর করে সে জাতির জনগণের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও নৈতিক মতাদর্শের ভিত্তির ওপর। আমাদের আরও স্মরণ রাখতে হবে, ১৯৭১-এর সংগ্রাম শুধু পাকিস্তান থেকে ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করার সংগ্রাম ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশকে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক জাতি এবং সব মিলিয়ে একটি উন্নয়নমুখী দেশে পরিণত করার সংগ্রাম।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বহু দশক পেরিয়ে গেলেও এই স্বপ্ন এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কর্মকান্ডে এ দেশের আপামর জনতার অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলে কী হবে, আমি কিন্তু আশা ছাড়িনি। আমার ব্যক্তিগত জীবন সফর থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার এই দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি আশাবাদী করে তুলেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের একটি ছোট্ট বইপ্রেমী বালক থেকে নিয়ে আজকের ব্রিটেনের একজন পরিপূর্ণ নাগরিক কর্মী হওয়া পর্যন্ত আমার এই পুরো সফরটাই এই দেশের ওপর অসীম আশাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আমি বিশ্বাস করি, আমার পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে আমার জীবনের শুরুর দিকে যে ক্যারিয়ার-এই সমস্ত জায়গা থেকে যে মূল্যবোধ আমি পেয়েছি, এগুলোই আমার আজকের ‘আমি’-কে গঠন করেছে। এইসব মূল্যবোধের কারণে ১৯৮০-এর দশকে ফিজিক্স নিয়ে আমার গবেষণা থেকে শুরু করে আমার শিক্ষকতা পেশা, নাগরিক সংশ্লিষ্টতা ও নাগরিক কর্মকান্ডে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ পর্যন্ত সবকিছুই ন্যায় ও নীতির ওপর অটল থেকেছে।
আমি বাংলাদেশে বিশ্বাসী। আমি বিশ্বাস করি, এই জনপদের জনগণ একদিন বিশ্ব মানচিত্রে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অবস্থানকে ঠিকই
পুনরুদ্ধার করবে। এ অঞ্চলের জনগণ কেবল দর্শক হিসেবে নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনকারী হিসেবে ভূমিকা রাখবে। (ধারাবাহিক চলবে)
ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট

