তেইশ.
আনন্দ উল্লাসের সুরুজ পশ্চিমে ডুবুডুবু। বাতাস দাঁড়িয়ে আছে উঠানে, বেজার বেজার চেহারা। নানা-নানিদের চোখের কোনায় দুঃখের ছানাপোনারা উঁকিঝুকি দিচ্ছে। খালা মামাদের গলায়ও হা-হুতাশ। ধব ধব জ্বলছে নিবছে হ্যাজাকের বাতি। তামাম নানাবাড়িটা যেন বদলে গেলো আতকা।
আমি অবশ্য আব্বার আসার দুদিন বাদেই ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। আম্মা জানিয়ে ছিলেন আমাকে। আমরা কুমিল্লা ফিরে যাচ্ছি। আব্বা নাকি চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা বদলি হয়েছেন আবার। আগামীকালই রওয়ানা হবো।
খবরটা শুনে একটা দুরন্ত খুশি লফিয়ে নামলো মনে। ইউসুফ-অমরদের সাথে দেখা হবে। কি মজা! পাশাপাশি নানাবাড়ির মায়া ছায়ার মতো হাঁটছে পিছন পিছন। এমন সংবাদ ঢেউয়ের মতো এসে আছড়ে পড়ছে মনে, শরীরে। দুঃখ আর খুশির মাঝখানে যেনো আটকে গেলাম।
হুমায়ুন মামার চোখে মুখে বেদনার ঝড়। এতো কিছুর পরও ছাড়তে হচ্ছে নানাবাড়ি। আম্মা গোছগাছ করছেন মালসামান। আব্বা আলাপচারিতায় ব্যস্ত খালা-মামাদের সাথে। বিদায়ের আগমুহূর্তে যা হয়। আমার আর হুমায়ুন মামার চোখে মুখে কোনো কথা ফুটছে না। কেবল বেদনারা বসে আছে নিঃশব্দ। চোখ থেকে পানি ঝরে ঝরে ভাব। কোনোরকমে সামলে নিলাম দু’জনেই।
এরপর বেরিয়ে পড়লাম গ্রামটা ঘুরে দেখি। আবার কখন আসা হয় কে জানে। উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, মধ্যপাড়া, সবপাড়াতেই ঘুরলাম। মসজিদের ঘাটলায় গিয়ে বসলাম কিছু সময়। চোখ যতদূর দেখে পানি আর পানি। আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে গ্রাম, গাছ, বৃক্ষ, পানিতে ডুবছে আর ভাসছে। নৌকা যাচ্ছে আসছে। কোনোটি পালতোলা কোনটা পালহীন। পাশাপাশি ভাসছে উড়ছে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ির ঝাঁক।
এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে উঠতে আর মন চাইছিল না। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ঘাটলার সিঁড়িতে। হুমায়ুন মামা বললেন উঠো, দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। তাই তো সূর্যটা মাথার তালু বরাবর এসে দাঁড়িয়ে আছে। উঠতেই হলো অনিচ্ছায়। একটা বক কানের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে বসলো পাশের বাঁশঝাড়ে। আরো অনেকগুলো বক বসে আছে সেখানে। কি মজার ছবি!
নানাবাড়ি পর্যন্ত আসতে আসেত ভালোমন্দ কথা হলো অনেকের সাথে। খেলার সাথীরা পিছন পিছন আসল নানা বাড়ির ঘাটলা পর্যন্ত। আমি কাল যাচ্ছি আবার আসবো। তবে কবে আসবো বলতে পারি না। খেলার সাথীদের চেহারায় কাঁদো কাাঁদো ভাব। কি আর করা তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নানাবাড়ির সীমায় পা রাখলাম। ওরা দাঁড়িয়ে থাকলো। একান্ত পরিচিত আপনজন ছাড়া কেউ নানাবাড়ির সীমায় পা রাখা বারণ। অনুমতি লাগে। পিছন ফিরে তাকালাম বার কয়েক। আশেপাশের প্রায় সবাই নাকি নানাদের রায়ত।

মখমলের বড়সর একটি ফরাশ। তাতে নীল আর লালের কারুকাজ। তার উপর বিছানো দুটি দস্তারখান। নানান রকমের পিঠা আর পরটা, মুরগির তরকারি, আব্বার জন্য কবুতরের ভূনা। আব্বা নাকি কবুতর পছন্দ করেন। তাই এ আয়োজন। মিষ্টান্ন আছে কয়েক পদের। আমরা নাস্তায় বসে পড়লাম। দুই নানাও বসেছেন আমাদের সাথে। এটি বিদায় নাস্তা। এরপরই আমরা রওয়ানা হবো আশুগঞ্জের দিকে। তারপর রেলগাড়িতে কুমিল্লা। ভিন্ন ঘরে আম্মা আর নানি, বাড়ির অন্যরাও নাস্তা সারলেন।
এদিকে নৌকা সাজানো হচ্ছে। বিছানাপত্র পাতায় ব্যস্ত আহমদ আর আব্দুল হেকিম। বরাবরই এ নৌকার দায়দায়িত্ব ওদের হাতে। নাস্তাটাস্তার পর এবার বিদায়ের পালা। সুলতান মিয়া বাক্সপেট্টা নৌকায় তুলছে। আমি আর আম্মাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সবায়। চোখে টলটল করছে পানি। বাড়ির কাজের লোকদেরও একিই হালত। যেন আপনজন হারানোর বেদনায় সবাই কাতর।
বিদায় বেলায় গ্রামের দৃশ্যটা একই রকম। ঘাটুরায়ও অবকিল ছবি দেখেছিলাম। দাদা-দাদিদের কাউসালি, মনোবেদনা একইভাবে ঝরে পড়েছিল। আগানাগরেও দুঃখের প্রজাপতি উড়ছে বাড়িময়। আব্বা তাগিদ দিলেন, আর দেরী নয়, সময়ের কাটা দৌড়াচ্ছে দ্রুত। তাই নৌকার দেকে পা বাড়ালাম। ধীরে ধীরে নৌকা ভাসলো পানিতে। উদ্দেশ্য আশুগঞ্জ ঘাট। সেখান থেকে রেলগাড়িতে কুমিল্লা। কুমিল্লার কোথায়, ঠাকুরপাড়ায় না অন্য কোথাও। এখনো জানা হয়নি।
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

