ইরানে হামলার ঘোষণা বাতিলের পর চুক্তি নিয়ে সমঝোতার দাবি ট্রাম্পের

আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য
শেয়ার করুন

অলিভিয়া আয়ারল্যান্ড বিবিসি

ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে আবারও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া তেহরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর তা বাতিলও করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের সাথে যুদ্ধ অবসানের একটি দুর্দান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছি”।
তবে চুক্তির খবরগুলোকে “অনুমাননির্ভর” এবং “এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি” বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।

ট্রাম্প অতীতেও বেশ কয়েকবার দাবি করেছেন যে চলমান সংঘাত থামাতে দুই দেশ চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এছাড়া এবারের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের ওপর “খুব কঠোর” আঘাত হানবেন।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যার জবাব দেয় ইরান। এছাড়া বিশ্বের তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয় তারা।

এপ্রিলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে এই সপ্তাহে দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

একই সময়ে, ট্রাম্পও বারবার ইরানের সাথে চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন। ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের পর অপরিশোধিত তেল ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলারে নেমে এসেছে।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছেন, “আমাদের এমন একটি চুক্তি হয়েছে যেখানে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবে না, আর এটাই ছিল আমাদের এই সব প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। তাই এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়”।

তিনি আরও জানান, কাগজপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর “ইউরোপে সম্ভবত একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে” এবং তা “খুব দ্রুত” সম্পন্ন করা উচিত। চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সাথে সাথেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি উপসাগরীয় মিত্রদেশ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ আঞ্চলিক নেতাদের সাথে কথা বলেছেন এবং “পুরো মধ্যপ্রাচ্য এতে অত্যন্ত খুশি”।

আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও। যদিও ইসরায়েল জানিয়েছে যে, এই সমঝোতা স্মারকে কোনো পক্ষ হিসেবে তাদের অংশগ্রহণ ছিল না।

নেতানিয়াহু এই চুক্তির লক্ষ্যে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে- “সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সীমাবদ্ধ করা এবং ইরান সমর্থিত আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোর সমর্থন বন্ধ করা”।

ইরানের মুখপাত্র মি. বাঘাই বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশ টেক্সট ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র “অতিরিক্ত দাবি” ও “নতুন শর্ত” জুড়ে দিচ্ছে। তিনি আরও জানান যে, তার দেশ তাদের “রেড লাইন” বা মূল অবস্থান থেকে সরবে না।

এর আগেও একাধিকবার ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন বা চুক্তির খুব কাছাকাছি বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গত ২০শে এপ্রিল ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সাথে চুক্তি “তুলনামূলক দ্রুত” হবে। সাতই মে যুদ্ধ “দ্রুত শেষ হবে” এবং উভয় পক্ষ ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি করেন মি. ট্রাম্প।

ইরানের শান্তি চুক্তি “মূলত সম্পন্ন হয়েছে” এবং শিগগিরই এর বিস্তারিত জানানো হবে বলে ২৪শে মে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ২৮শে মে ট্রাম্প জানান যে, ইরানের চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে “সন্তুষ্ট নন” তিনি। চুক্তিটি “খুব কাছাকাছি” কিন্তু চূড়ান্ত নয় বলে ২৯শে মে দাবি করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

পরে ৩০শে মে, ইরানের সাথে আলোচনার বিষয়ে “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” নিতে বৈঠক করেন ট্রাম্প। তবে পরবর্তীতে কোনো চুক্তি ঘোষণা করা হয়নি।

চুক্তির আলোচনার পাশাপাশি, ট্রাম্প ইরানের তেল অবকাঠামো বিশেষ করে খারগ দ্বীপ দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। খারগ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল, যেখান দিয়ে দেশটির ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।

ওই সময় ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, “ভেনিজুয়েলার মতো আমরা তেল ও গ্যাস বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেব।” ট্রাম্পের এমন অবস্থানের জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী “আগের চেয়েও কঠোর” প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছিল।

“ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হুমকির প্রেক্ষিতে, হয় তেল ও গ্যাস রপ্তানি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কেউই তা ব্যবহার করতে পারবে না,” বলে জানিয়েছিল ইরান।

গত সোমবার উপসাগরীয় এলাকায় একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আবারও হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়।

বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক ও রাডার সাইট লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানোর কথা জানায়।

যার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। বাহরাইনে ইরানি ড্রোন হামলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু আহত হয়েছে বলেও জানা গেছে।

জর্ডান জানিয়েছে যে তারা প্রায় ২০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে তারা “আকাশ পথে হামলা”- মোকাবিলা করেছে।

এদিকে, ওমান উপসাগরে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ভারত একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কূটনীতিককে তলব করেছে।

ওই জাহাজটিকে ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ লঙ্ঘনের অভিযোগে আক্রমণ করা হয়েছিল। তবে জাহাজের ২১ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত নয়টি জাহাজে গুলি চালিয়েছে, যার মধ্যে তিনটি এই সপ্তাহেই আক্রান্ত হয়েছে। এই অবরোধের লক্ষ্য হলো ইরান যাতে তেল রপ্তানি থেকে মুনাফা অর্জন করতে না পারে, সেজন্য তাদের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে তিনি “গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”

মুখপাত্র বলেন, “তিনি (মহাসচিব) সব পক্ষকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ফিরে আসার এবং পরিস্থিতি আর যাতে অবনতির দিকে না যায়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।”

এছাড়া পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত এবং সৌদি আরবও চলমান উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *