৩১ অক্টোবর ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ: দেশবাসীর প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি; বাধা এলে প্রতিহতের হুঁশিয়ারি

আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ২০২৬) সকালে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আসন্ন লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি।

সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জোটভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে লংমার্চের উদ্দেশ্য, কর্মসূচির পরিকল্পনা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরেন আল্লামা মামুনুল হক।

ব্রিফিংয়ে মামুনুল হক বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সারসংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও তুলে ধরা হবে।

তিনি বলেন, নাগরিক জীবনের সংকট নিরসন ও জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্য দেশব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। এর আগে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলে দুটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর তৃতীয় ধাপের কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

মামুনুল হক আরও বলেন, জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নাগরিক জীবনের সংকট নিরসনেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

লংমার্চের কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি জানান, আগামী ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর পথে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন শেষে লংমার্চ কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানের সুযোগ-সুবিধা, প্রবেশপথ ও জনসমাগমের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত কর্মসূচিস্থল নির্ধারণ করা হবে।

লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানান মামুনুল হক। তাঁর ভাষ্য, কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো পক্ষ লংমার্চে বাধা বা অপতৎপরতা চালালে তা প্রতিহত করে কর্মসূচি সফল করা হবে।

তিনি বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্য এখন পর্যন্ত সহনশীল কর্মসূচি পালন করছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার চেষ্টা করা হলেও সরকারের আচরণে বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ১১ দলীয় ঐক্য নীরব থাকবে না। প্রয়োজনে কমিশনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারসংক্রান্ত বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ বক্তব্য জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও শঙ্কা বাড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সফরসঙ্গীদের কয়েকজনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদনমূলক সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
সংসদ অধিবেশনের আগে ফের বৈঠক

জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশন প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের পথে এগোবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। অধিবেশনের আগে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আবারও বৈঠকে বসে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা

গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে লংমার্চের গাড়িবহর যাওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।

তিনি দাবি করেন, গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থী ও দেশপ্রেমিক বিপুলসংখ্যক মানুষ লংমার্চে অংশ নেবেন। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অপতৎপরতা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় তাঁরা প্রস্তুত থাকবেন বলেও জানান তিনি।

একই সঙ্গে গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায় সরকার ও প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও বৃহত্তর ঐক্যের প্রত্যাশা

১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, এ ঐক্য কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অংশ নয়। রাষ্ট্র সংস্কার, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যেই তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের সংগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।

ব্রিফিংয়ে ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ বিষয়ে যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরাই বিস্তারিত বলতে পারবেন।

সবশেষে আগামী ৩১ অক্টোবরের ঢাকা–খুলনা–কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক নাগরিক, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *