কোনো গণতান্ত্রিক সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করতে পারে না, বিএনপি গত ১৭ বছর গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে এবং সরকার গঠনের পরও সেই অবস্থান থেকে সরে আসবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ২০২৬) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. জাহেদ বলেন, কোনো রাষ্ট্র বা সরকার যদি কাউকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করে, তাহলে সেটি আর রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করে না। এটি খুন, যা যেকোনো মানুষই করতে পারে। একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে বিচার করার ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
তিনি আরও বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কিন্তু কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারব্যবস্থার হাতে তুলে দেওয়া যায়। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করা যেতে পারে, কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সুযোগ নেই।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে উপদেষ্টা বলেন, পাঁচ বছর পর রাতের ভোট বা ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার কোনো উদ্দেশ্য এই সরকারের নেই। তাই সরকার এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে তার ক্ষতি হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনায় মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করা হবে বলে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইজিপি তার পরবর্তী বক্তব্যে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে মনে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইজিপি তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং আগের অবস্থানে অনড় থাকেননি। এছাড়া সাংবাদিকদের বিষয়ে তার বক্তব্যে যে সাধারণীকরণ ও গুরুতর অভিযোগ ছিল, সেখান থেকেও তিনি সরে এসেছেন। তাই তার মতে এটা নিয়ে আর কথা বলা উচিত হবে না।
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণে তাকে পদে থাকার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ বলেন, বিষয়টি সাংবাদিকদের বিবেচনার। তবে তার মতে, আইজিপি আগের বক্তব্যে অনড় থাকলে সমস্যা হতো।
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে বেআইনি কাজের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা করতে বাধ্য নন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আইজিপির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন বলেও জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে আসতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ময়মনসিংহের ভালুকায় বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভুক্তভোগী হওয়ার কথা জানিয়ে ফেসবুক লাইভ করায় এক নারী উদ্যোক্তাকে ১৫১ ধারায় আদালতে পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ওই নারী উদ্যোক্তার বক্তব্যের কারণে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের অবস্থান সঠিক বলে তিনি মনে করেন না।
তবে মানুষের এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আরও অনেক ব্যক্তি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই ধরনের বক্তব্য আসলে দেওয়া যেতেই পারে।
আদালতে পাঠানোর পরের বিষয়গুলো বিচার বিভাগের এখতিয়ার উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আদালত সরকার নয়। আদালত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার জবাবদিহি সরকার করবে না। তবে সরকারের দায়িত্ব হলো, পুলিশের তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে হয়, তা নিশ্চিত করা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্তে ওই নারীর বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে না। কারণ ওই বক্তব্যে অপরাধের উপাদান পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে তিনি ইঙ্গিত পেয়েছেন।
রংপুরের পীরগঞ্জে তিনটি হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জাহেদ উর রহমান জানান, ঘটনাটি তার নজরে আসেনি। তবে সেখানে পুলিশ মোতায়েন ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে উগ্রপন্থি কিছু মানুষের আস্ফালনের প্রবণতা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ প্রবণতা বেড়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে থেকে বিচারের বাইরে থাকবেন, এটা হতে পারে না। আমি আপনাকে এটা নিশ্চিত করছি।’
তিনি আরও বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশে নিরাপদে বসবাস করতে চান। রাজনৈতিক দলের হাতে দেশের দায়িত্ব থাকলে তাদের কাছেও মানুষের প্রত্যাশা থাকে। বিএনপিকে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। ইউএনবি

