নয়নের দাড়িকাণ্ড: ছদ্মবেশ থেকে বিতর্ক, গল্পের বাঁকে গুপ্ত-সুপ্ত রাজনীতির নতুন প্রশ্ন!

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

একসময় দাড়ি ছিল তাঁর আন্দোলন ও আত্মগোপনের কৌশল! সেই দাড়ি নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়ন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর চেহারা, বদলেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কিন্তু দাড়ি নিয়ে অতীতের বক্তব্য ও বর্তমানের অবস্থান ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/2349645635870836

নয়নের দাড়িকাণ্ডের সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আলোচিত ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ প্রসঙ্গটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখানে দাড়ি কেবল চেহারার পরিবর্তনের অনুষঙ্গ নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মগোপন ও প্রকাশ্য অবস্থানের প্রতীকী ব্যাখ্যারও অংশ হয়ে উঠেছে।

রাজনীতির মঞ্চে কখনো কখনো একটি দাড়িও হয়ে উঠতে পারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু! যে দাড়ি একসময় নিজের পরিচয় আড়াল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে নয়ন দাবি করেছেন, সেই দাড়ি নিয়েই এখন রাজনৈতিক মিছিলের স্লোগান। এটি কি নিছক ব্যক্তিগত বিষয়, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতির কোনো গভীর বার্তা?

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের গল্পটা অনেকটা এমনই! যে দাড়ি ছিল তাঁর আন্দোলনের সঙ্গী! আন্দোলন, আত্মগোপন ও বন্দিজীবনের গল্প!

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মিছিল ও নানা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য পরিস্থিতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সময় দীর্ঘ চুল ও দাড়ির আড়ালে নিজের চেহারায় পরিবর্তন এনে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কৌশল বেছে নিয়েছিলেন বলে নয়ন নিজেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তিনগর মোড়ে মশাল মিছিলেও তিনি ওই দাড়ি নিয়েই অংশ নিয়েছিলেন। চেহারার পরিবর্তন ছিল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। অর্থাৎ, সেই সময় দাড়ি তাঁর কাছে কেবল মুখের লোম ছিল না; বরং আত্মগোপন করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার একটি উপায়ও ছিল।

তবে নয়নের দাড়ি বড় হওয়ার পেছনে আরেকটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গুমের শিকার হওয়ার পর তাঁকে দীর্ঘ সময় বন্দিজীবন কাটাতে হয়। কারাগারে সেলুনে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চুল ও দাড়ি বড় হয়ে যায়। দীর্ঘদিন দাড়ি রাখার কারণে মুখে ছত্রাকের সংক্রমণ ও ঘা হয়েছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ না-ও থাকতে পারে। দাড়ি বড় হওয়ার পেছনে বন্দিজীবনের বাস্তবতা যেমন ভূমিকা রেখে থাকতে পারে, তেমনি সেই চেহারা পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে আত্মগোপনের কৌশল হিসেবেও কাজে লেগে থাকতে পারে।

দীর্ঘ দাড়ির সেই পরিচিত চেহারা একসময় বদলে যায়। নয়ন দাড়ি কেটে ফেলেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা আলোচনা। কেউ কেউ তাঁর মুখে ছত্রাকের সংক্রমণের বিষয়টি সামনে আনেন। তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত এই দাবির স্বাধীন প্রমাণ না থাকায় সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

নয়নের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন দাড়ি রাখার কারণে তাঁর মুখে সংক্রমণ ও ঘা হয়েছিল। এখনো হালকা দাড়ি উঠলে সমস্যা দেখা দেয় বলে তিনি জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যগত কারণে দাড়ি কেটে ফেলার ব্যাখ্যাটি তাই একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিতর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয় অন্য জায়গায়- দাড়ি কাটার পর তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও স্লোগানকে ঘিরে।

সম্প্রতি দাড়িওয়ালা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যুবদল নেতা নয়নের কটাক্ষপূর্ণ কথা ও স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। তিনি ‘দাড়িওয়ালাদের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’-এ ধরনের স্লোগান দিয়েছেন।

এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, এ ধরনের বক্তব্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

জামায়াতের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কোনো ধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি কিংবা ধর্মীয় অনুষঙ্গ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। নয়নকে এ বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বানও জানান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। একই সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করেন।

এখানেই বিতর্কের মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। নিজের দাড়ি একসময় রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল বলে যিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি এখন অন্যদের দাড়ি নিয়ে কটাক্ষ করছেন কেন? এটি কি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ভাষা, নাকি ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীককে লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্য? দেশের ওলামা সমাজ ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

দাড়ি ধর্মীয় অনুশীলন, সাংস্কৃতিক পরিচয় কিংবা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ- বিভিন্ন মানুষের কাছে এর অর্থ ভিন্ন হতে পারে। রাজনীতিতে পোশাক, চেহারা ও ধর্মীয় পরিচয়ের নানা প্রতীকও কখনো কখনো রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো প্রতীককে রাজনৈতিক বিরোধিতার হাতিয়ার বানানো হলে তার প্রভাব শুধু প্রতিপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বক্তব্যের ভাষা ও লক্ষ্য যদি ধর্মীয় পরিচয়কে আঘাত করে, তাহলে রাজনৈতিক বিতর্ক সহজেই সামাজিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।

একন প্রশ্ন হলো দাড়ি কাণ্ডে নয়নের খোলস বদল, নাকি ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ রাজনীতির নয়া উদাহরণ? নয়নের দাড়ির গল্পে অবশ্য দুটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আছে রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় চেহারা বদলে আত্মগোপনের কৌশল এবং বন্দিজীবনে দাড়ি বড় হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর নিজের বর্ণনা।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে দাড়িওয়ালাদের নিয়ে স্লোগান এবং তার জেরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদ। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ প্রসঙ্গটিও নয়নকে ঘিরে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘ দাড়িতে তিনি একসময় ‘গুপ্ত’ সেজেছিলেন- এমন ব্যঙ্গাত্মক ব্যাখ্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। এখন দাড়ি কেটে প্রকাশ্যে এসে দাড়ি-বিরোধী অবস্থান নিয়ে তিনি কি ‘সুপ্ত’ হতে চাইছেন- এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।

এই তুলনা মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গের অংশ। এর মধ্য দিয়ে কেউ কেউ সুবিধাবাদ, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিচয়ের খোলস বদলানোর প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

নয়নের দাড়ি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে তাই একদিকে রয়েছে তাঁর নিজের বর্ণনায় আন্দোলন ও বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে রয়েছে দাড়িওয়ালাদের নিয়ে স্লোগান এবং তার জেরে ওঠা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদ। এই দুইয়ের মাঝখানে সুবিধাবাদ, খোলস বদল এবং ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ প্রসঙ্গটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু রবিউল ইসলাম নয়নের দাড়ি নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে একজন নেতা ভাষার সীমা কতটা মানছেন, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকছেন এবং নিজের বক্তব্যের দায় নিতে কতটা প্রস্তুত। কারণ, রাজনীতিতে চেহারা বদলানো কৌশল হতে পারে; কিন্তু দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো কৌশল নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *