* প্রশংসা কুড়াচ্ছে সিলেট নগরের বুক চিরে বহে যাওয়া ১৩টি প্রাকৃতিক ছড়া ও খাল নিষ্কাষণের প্রয়াস
* জলাবদ্ধতা, ময়লা আবর্জনা ও পুথি গন্ধময় মজা পুকুর পরিষ্কার করায় সৃষ্টি হচ্ছে নয়ন কাড়া দৃশ্য
* মশা-মাছি-পোকামাকড় ও বিষধর শাপ-বিচ্ছুর আবাস হচ্ছে ধ্বংস
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী সিলেট :
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নগরের বুক চিরে বহে গেছে ১৩টি প্রাকৃতিক ছড়া ও খাল। কিন্তু পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা উন্নয়নে গত দেড় দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি- অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা এবং ড্রেন-নালার ত্রুটির কারণে। সামান্য বৃষ্টি হলেই মালনি ছড়া, কালীবাড়ি ছড়া, মঙ্গলী ছড়া, যোগিনী ছড়া, হলদি ছড়া, ভুবি ছড়া, গোয়ালী ছড়া, ধোপা ছড়া ও গাভিয়ার খাল ভরে উপচে আবসিক এলাকা ডুবিয়ে দেয়।
নগরীর নয়টি ছড়া নগরের উত্তর দিকের পাহাড়-টিলা ও চা-বাগান থেকে নেমে দক্ষিণে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে। ওই নয়টি ছড়া দিয়ে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি নিষ্কাষণ হয়। সাথে নিয়ে আসে বালু মিশ্রিত মাঠি। ছড়াগুলো অবৈধ দখলে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতামুক্ত করতে হলে ছড়া পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই।
শেলটেক’র নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আল আমিন এ-সংক্রান্ত তথ্যাদি উপস্থাপন করে বলেছেন, ছড়ার ওপরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে ছড়াকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যাবে না। আর ছড়া স্বাভাবিক অবস্থায় না ফিরলে নগরে জলাবদ্ধতা কমবে না।
প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে নগরীর অভিজাত এলাকা সুরমা নদীর তীরে উপশহর, তালতালা, চাঁদনীঘাট, কুশিঘাট, মহাজনপট্রি, কাজীরবাজার, শেখঘাট, তোপখানা, জিন্দাবাজার-সহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
অবশ্য বর্তমানে সিসিক নিয়মিত খাল, ছড়া ও ড্রেনের নিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু রেখেছে। অবস্থার কিচু উন্নতি হলেও বেশ কিছু এলাকায় অনেক বাড়ীঘর ডুবে যায়। অবকাঠামো নষ্ট হয়।
নগরীকে একটি আধুনিক ও বসবাসের অযোগ্য করে তোলার বিষয়ে বর্তমান সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ূম চৌধূরী দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন কোন না কোন ওয়ার্ডেও ময়লা আবর্জনা বা পুথি গন্ধময় মজা পুকুর নিজে উপস্থিত থেকে পরিষ্কার করাচ্ছেন। এর ফলে ঘাসিটেলা পুকুর সহ আরো কয়েকটি পুকুর এর দৃশ্য নয়নকাড়া হয়েছে। মশা-মাছি পোকামাকড় ও বিষধর শাপ-বিচ্ছুর আবাস ধংশ হয়েছে। এলাকাবাসীও সাধুবাদ জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার তিনি নগরীর ৩৩ নং ওয়ার্ড পরিদর্শনকালে বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও জলাব্দতার বিষয়ে কোন ছাড় নয়। ১৯৫৬ সালের রেকর্ড অনুযায়ী নতুন করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও খাল উদ্ধারের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘ কোনো ব্যক্তির কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ মেনে নেওয়া হবে না। পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিসিক প্রশাসক বলেন, ‘নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে চাই’।
এ সময় সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. দেলোয়ার হোসেন নাদিম, সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী ইসমাইলুর রহমান, সেলিম আহমদ-সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও এলাকার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সিসিক প্রশাসক ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড পরিদর্শন কালে কয়েকটি স্থানে অবৈধভাবে টিলা কেটে প্লট তৈরি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে টিলা কাটা বন্ধের আহ্বান জানান।
অবৈধ দখল ও স্থাপনা: প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা নগীর ছড়া ও খালগুলোর দুই পাড়ে সহস্রাধিক অবৈধ বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনে। যত্রতত্র পলিথিন ও গৃহস্থালী বর্জ্য ফেলে ছড়ার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ পুরোপুরি আটকে দেওয়া হয়েছে। অনেক বাড়ি ও বহুতল ভবনের সেপটিক ট্যাঙ্কের বর্জ্য সরাসরি ড্রেন ও প্রাকৃতিক ছড়ায় ফেলা হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী বিগত ১৬ বছরে ড্রেনেজ ও ছড়া পরিষ্কারের পেছনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু তেমন সুফল পায়নি নগরবাসী। তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ ১৯৫৬ সালের সিএস ম্যাপ ও রেকর্ড অনুযায়ী ছড়া-খাল উদ্ধারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং সেপটিক ট্যাংকের অবৈধ সংযোগ তিন মাসের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করার হুশিয়ারি দিয়েছে।

