স্বাগতম ‘পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ’। উৎসবমুখর পরিবেশ ও বর্ণিল আয়োজনে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা। এবারে মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল ২০২৬) সকাল ৯টার পর বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে বরণ করে নিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি বের হয়।
সকাল ৯টা ৫ মিনিটে চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শোভাযাত্রার সূচনা হয়। এতে অংশ নেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এ দিনটি এখন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি একযোগে মেতে উঠেছেন বর্ষবরণের আনন্দে।
শোভাযাত্রার শুরুতে পুলিশের অশ্বারোহী দল আভিজাত্যের ছাপ রাখে। এরপর জাতীয় পতাকা হাতে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়। মূল ব্যানার নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি, শিক্ষক-কর্মচারী ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে যুক্ত হন। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন একসঙ্গে অংশ নেয়।
এছাড়া সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং ১১৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি শোভাযাত্রায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ স্থান পেয়েছে— মোরগ, হাতি, ঘোড়া, পায়রা ও দোতারা। এসব প্রতীকের মাধ্যমে নতুন সূচনা, ঐতিহ্য, শান্তি, সহাবস্থান ও সংস্কৃতির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং এবং বাঘ, মাছ, ময়ূর ও হরিণ শাবকের প্রতিকৃতি শোভাযাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল পাঁচটি পটচিত্র, যা নির্মাণ করেছেন পটশিল্পী টাইগার নাজির। এসব পটে সুন্দরবনের দেবী বনবিবি, সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গাজীর পট এবং মনসামঙ্গলের বেহুলার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানা মোড় ঘুরে রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হবে।
এদিকে শোভাযাত্রা ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুখোশ পরে প্রবেশ, ব্যাগ বহন, ইংরেজি প্ল্যাকার্ড, বেলুন, ফেস্টুন ও আতশবাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রিও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শোভাযাত্রা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারে ক্যাম্পাসজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। দোয়েল চত্বর, কার্জন হলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ পাবলিক টয়লেট।
নববর্ষ উপলক্ষ্যে চারুকলা অনুষদে সাংস্কৃতিক আয়োজনও রাখা হয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বকুলতলায় লোকসংগীত, নৃত্যসহ বিভিন্ন পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া ১৫ ও ১৬ এপ্রিল ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’ শীর্ষক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হওয়ার কথা রয়েছে।

