উনিশ.
শাপলা বাগান পেছনে ফেলে নৌকা ভিড়লো ঘাটে। শানবাঁধানো ঘাট। পাশেই বিশাল নিম গাছ। সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। নিমগাছে পাখিদের কলরব। নীড়ে ফিরছে ওরা। এরিমধ্যে ছৈয়ের ভিতর থেকে বাইরে এলেন আম্মা। ঘটলাজুড়ে তখন খালা-মামাদের জটলা; দু’চারজন কাজের মহিলাও আছে। আম্মাকে দেখে হৈ হৈ করে উঠলো সবাই। আনন্দের পাখিরা যেনো পাখ মেললো আকাশে। সাবধানে নামলেন আম্মা নৌকা থেকে। আম্মার হাত ধরে আমিও নামলাম। বড়মামা মালসামানগুলো মাঝিদের বুঝিয়ে দিয়ে তিনিও ঘাটলার সিঁড়িতে পা রাখলেন।
বাড়িজুড়ে যেনো একটা উৎসব উৎসব ভাব। বেশ কতকটা পথ হেঁটে তারপর পৌঁছতে হয় অন্দরমহলে। বাগান এবং ঘাটলার ধার ঘেঁষে বৈঠকখানা। পরিপাটি করে তৈরি চৌচালা বড়সর একটি টিনের ঘর। ভিতরটা সাজানো গোছানো। কারুকাজ করা চেয়ার-টেবিল পাতা। এ ঘরে নানারা বসে আড্ডা বৈঠক করেন। রায়তদের সাথে মতবিনিময়ে সময় দেন। আর থাকেন একজন মৌলভী এবং একজন স্কুলশিক্ষক।
মুসাফিরদের ছিল অবাধ যাতায়াত এ বাড়িতে। এমন সিলসিলা নানাদের বাপদাদার আমল থেকেই। বলা চলে মুসাফিরখানা। থাকা খাওয়া, ঘুম, এসবের কোনো বাধা নাই। নানারাও বংশগত এ রেওয়াজ ধরে রেখেছেন। আদর আপ্যায়নে যেনো কোনো কমতি না পড়ে সে দিকটির প্রতি কড়াকড়ি নজর রাখেন।
দু’টি গেইট পিছনে ফেলে অন্দরমহলে পা রাখলাম আমি আর আম্মা। সাথে খালা, মামা আর বাড়ির কাজের মহিলারা। বাড়িজুড়ে আনন্দের ফুলঝুড়ি। বড় নানি আমাকে নিয়ে, অন্যদিকে আম্মাকে নিয়ে ছোট নানি, যেনো আকাশ থেকে চাঁদ খসে পড়েছে এমন সব কান্ডে মেতে উঠলেন। খালা-মামাদের টানাটানিতে আমি একেবারে চিঁড়া চ্যাপটা। প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে শুকিয়ে এলো জিব্বা-ঠোঁট।
কোথায় যেনো হারিয়ে গেলেন বড়মামা। নজর ঘুরালাম এদিক সেদিক। অন্ধকার নেমে আসছে খুব সাবধানে। ঝিঁঝিরা ডাকছে দল বেঁধে। অন্ধকার ফুটো করে উড়ছে জোনাকি। নানাবাড়ির কুকরটির নাম ভোলা। বিশাল বপু, কুচকুচে কালো। সেও বারবার ঘেউ ঘেউ করে উঠছে। এ আনন্দে সামিল হতে চাচ্ছে ভোলা। তেমন বার্তাই উঠে আসছে তার ঘেউ ঘেউ শব্দ থেকে।
নিভতে শুরু করলো উৎসবের আলো। কমছে একজন দু’জন করে। কালো থেকে কালোর দিকে যাচ্ছে অন্ধকার। এমন সময় উদয় হলেন দুই নানা। খানাপিনার ব্যবস্থার জন্য হাঁকডাক দিলেন দুই নানা, একসাথে। আম্মা সালাম দিলেন, কুশল বিনিময় করলেন। ছোট নানা আড্ডায় মেতে উঠলেন আমার সাথে।
ভিতর বাড়িতে জ্বলছে হেজেক লাইট। গ্রামে এমন বাতির নাম পাম্পলাইট। এই বাতি জ্বালাতে পাম্প করে বাতাস দিতে হয়। বাতাস গিলে গিলে উজ্বল হয় চিমনির ভিতরে টানানো একরকম ছোট জ্বাল। হেজাকের আলোতে ফকফক করছে ভিতরবাড়ি। খুশির প্রজাপতি উড়ছে বাড়িময়। যেনো বিয়েবাড়ির আনন্দ হৈ-হুল্লুড়।
এ আয়োজনের সবই আমাদের আসা উপলক্ষে। পোলাও-কোরমার গন্ধে মৌ মৌ করছে তামাম বাড়ি। বড় ঘরে বিছানো হলো ফরাশ। জমিদারি কায়দায় শেষ হলো খাওয়া-দাওয়া। শেষ করতে রাত হয়ে গেলো অনেক। এ ঘরে থাকেন বড় নানা। মুখোমুখি চারখানা বিশাল বিশাল টিনের ঘর। ছোট নানা থাকেন দক্ষিণমুখি ঘরটিতে। আর অন্যদুটি মামা খালাদের দখলে। পেছন দিকে আছে আরো দুখানা ঘর। যেখানে কাজের বুয়াদের বসবাস।
অন্দরমহলের উত্তর কোনায় বিশাল একটি কুয়া। পাকা চত্তর চারদিক ঘিরে। এখানে মহিলাদের গোসল-টোসল, কাপড় কাচার জন্য। সবগুলো ঘরের বারান্দা ঘেঁষে ডালিমগাছতো আছেই। ফুলগাছ আছে হরেক কিসিমের। বরুইগাছ, আমগাছ আছে বাড়ির পেছন দিকটায়। কুয়ার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মাঝিরি ধরনের পেয়ারাগাছ। মজার মজার পেয়ারা যেমন স্বাদ তেমনি খুশবু।
এই পেয়ারা গাছের ডালে ডালেই কাটতো সারাটা দুপুর। আম্মার নজর এড়িয়ে। তিনি তখন ব্যস্ত থাকতেন, খালা-নানিদের সাথে কাজ-কর্মে। কোনো সময় আড্ডা-গল্পে। হুমায়ূন মামা ছিলেন আমার সম বয়সি। কিছুদিনের বড়ও হতে পারে। পেয়ারাগাছ, বরুইগাছ সব এলাকায়ই আমরা মানিকজোড়। ডালে বসেই সাবাড় করি ঢাসা ঢাসা পেয়ারা। স্কুল-টিস্কুল ডুব দেয় পানিতে। আর পড়াশোনা ভাসে কলার ভেলায়। স্বপ্নের ফড়িং তখন উড়তে থাকে আগে আগে।

বিশ.
আম্মার শাসনে কতকটা ভাটার টান। এখন আর কারণ ছাড়াই বারণের তালা ঝুলে না। সময় অসময়ের কপাট খুলতে পারি হুটহাট। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে পারি, সূর্য যখন তালু বরাবর ঝুলতে থাকে। পানির ওপর ভাসছে গ্রাম। কচুরিপানা আসছে যাচ্ছে দল বেঁধে। কোনোটিতে নানান ধরনের পাখি। উড়ে উড়ে শিকার করছে পোকা, ছোট মাছ। কোনোটিতে বসে বসে ঝিমাচ্ছে একটি কি দুটি বক। ছোট ছোট নৌকা নিয়ে এ পাড়া ও পাড়া করছে ছেলেরা। কেউ আবার জাল দিয়ে মাছ ধরছে। দলবেঁধে কাটছে সাঁতার।
বৈঠকখানার বারান্দায় বসে এসব দৃশ্য দেখতাম আমি আর হুমায়ুন মামা। দুই গ্রামের ফাঁক বরাবর বইছে মেঘনা। পানিতে ঝিকমিক করছে সূর্য। ঢেউয়ের মাথায় মাথায়। কোনো কোনো দিন এভাবেই কাটতো আমাদের দুপুর। গোসলের সময় আসতো ঘনিয়ে। ঠিক এ সময়টিতে বার্তা হাজির হতো আম্মার। গোসলের তাকিদ, সাথে সাবধান বাণী। পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করা যাবে না বেশি সময়। গোসল সেরে উঠতে হবে ঝটপট।
আমি কত বড় হয়ে গেছি, সাঁতার কাটতে পারি। আট দশ হাততো যেতেই পারি। এরপরও আম্মার এতো কাউসালি, ভয়। বড় মামাকে পাঠাতেন। তিনি এসে বসে থাকতেন ঘাটলায়। অনেক সময় ধরে ঝাঁপাঝাঁপি করতাম পানিতে। আম্মার চোখ ফাঁকি দিয়ে। বড় মামা ছিলেন ভরসা। এই ভরসায় ভরসা করেই সারতাম রোজকার, ডুবসাঁতার, গোসল।
থৈথৈ পানিতে ভাসছে সারাগ্রাম। বর্ষায় আগানগরের চেহারাটা এমনই হয়। নৌকা ছাড়া উপায় থাকে না চলাফেরায়। যখন বৃষ্টি নামে তখন আলাদা একটা মজা। টিনের চালে টুপটাপ বৃষ্টি। দলবেঁধে সাঁতার কাটছে অনেকগুলো হাঁস। কোনো কোনোটি ডুব দিতো পানিতে। আবার ভেসে উঠতো ওপরে। কারো কারো ঠোঁটে মাছ। ছটফট করছে । পালানোর মতলবে।
মেঘ বাদলার সময়গুলোতেই বসতো খুশির বাজার। কোত্থেকে যেন আসতো হাঁস ঝাঁকে ঝাঁকে। উথালপাতাল করতো পানি। একটি দুটি কোষা নৌকায় এপাড়া-ওপাড়া করতো ছোটরা। কারো মাথায় থাকতো মাথাল জাতিয় কিছু। আবার কারো উদলা শরীর। এই ভিজা ভিজিতেই যেন তাদের আনন্দ, খুশি। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের সাথে একাকার হয়ে বালক-মাঝিদের আনন্দ খুশি, চুইয়ে পড়তো পানিতে।
ঘাটলার পাশ ঘেঁষেই নানাদের নামাজঘর। সে ঘরের চালায় জুবুথুবু সাত আটটি কাক। পালক থেকে ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা পানি। সূর্যের ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে ঝরতো ক্লান্তির ঘাম। সময়ের ঘরে যেনো কারা তালা মেরেছে। দুপুর না বিকাল বুঝতে কেমন ধাাঁধায় পড়তে হয়। বৃষ্টির ধারায় টান পড়ে একসময়। তখনই তলব আসে অন্দরমহল থেকে। নড়ে চড়ে বসতাম আমি আর হুমায়ুন মামা। কখন যে কানের কাছ দিয়ে চুপিচুপি চলে গেছে সময় কে জানে। বাদল দিনের আদল দেখতে দেখতে ভুলেই যেতাম সূর্যের কথা। সময়ের আন্দাজ।
নানাবাড়ির বাগানটি তেমন বড় ছিলো না। তবে পরিপাটি করে সাজানো। এই জন্য প্রশংসা পেতে পারে সুলতান মিয়া। সকাল-বিকাল সাফ-সুতর করতো বাগান। ফুলগাছে যত্ন-আত্তিতেও ছিলো তার দারুণ মনোযোগ। এই বাগানকে ভাবতো তার আপন সংসারের মতো। ফুল তো দূরের কথা, গাছের পাতায় কাউকে হাত লাগাতে দেখলেই চোখের মণিতে আলতা এসে জমা হতো। ফুঁসতে থাকতো রাগে।
বাগানের গোলাপ গাছটি ছিলো অন্যরকম। সারা গাছ জুড়েই ফুটতো ফুল। তখন মৌ মৌ করতো আশপাশের এলাকা। পথ-ঘাট। বাগানের উত্তর কোণা বরাবর একটি গন্ধরাজ গাছ। বিশাল বিশাল ফুটতো ফুল। মাখন মাখন পাপড়ি। বাতাস উথাল-পাথাল করা গন্ধ। আমার খুব প্রিয় ছিলো এই গন্ধরাজ।
সুলতান মিয়া বুঝতো মনের খবর। প্রায় বিকালে আমাকে নিয়ে ঢুকতো বাগানে। তারপর ফুল আর ফুলগাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতো। কোনো কোনোদিন সাথী হতেন হুমায়ুন মামাও। অপরাজিতার লতা মাড়িয়ে বেরিয়ে আসতাম বাগান থেকে। সূর্য যখন জগমোহনপুর গ্রামের পেছনটায় মুখ লুকাতো, পানিতে তখন দাঁড়কাকের পালক, থরে থরে বিছানো। ভয় ভয় বাতাস কানের কাছ ঘেঁষে উড়ে যেতো।
গ্রামের অন্ধকার এক ভিন্নরকম চেহারার। কারা যেনো পানি ফুটো করে উঠে আসতো। ভয়ে কাঁপা আঁধার মেখে মেখে আমি আর হুমায়ুন মামা পা রাখতাম অন্দরমহলে।
একুশ.
আব্বার কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলাম না। আম্মার কাছে হয়তো থাকতে পারে। জিজ্ঞেস করতে ফুরসত কই! মাছধরা সাঁতার কাটা আর কোষা নৌকায় এ পাড়া ও পাড়া করতেই সময় কাবার। সূর্য উঠছে আর নামছে। এই উঠা নামাতে কতোগুলো দিন যে গিলে খেয়েছে কে জানে।
কুমিল্লার ঠাকুরপাড়া আর ভৈরবের আগানাগর যেমন লম্বা পথ, ঠিক তেমনি সময়ের ঘোড়াও লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে আগে। দিনক্ষণের পর্দা ছিড়ে ছুড়ে। কেন যেন ঠাকুরপাড়াার দৃশ্য হাঁটাহাঁটি করছে ভাবনার গলিপথে। ঐতো যাচ্ছে অমর, ইউসুফ, মিনারা। দিঘিতে গোসলের ঝুপঝাপ শব্দ। পাতাঝরা গাছের সারি। একটা মায়া মায়া বাতাস হু হু করে বইছে মনে, চোখের মণি বরাবর।
আব্বার ডাকাডাকি নাকি কানে এসে আছড়ে পড় বারবার। কেন এমন লাগছে। এরিমধ্যে অনেকটা উপরে উঠে গেছে কুসুম রং সূর্য। উঠানের মাঝখানটাায় জটলা। দুই নানি, আম্মা, খালারা, সাথে কাজের মহিলারাও। সবার চেহারা চুয়ে পড়ছে ঝিংয়ে ফুলের পাপড়ি। আনন্দের গোলাপী আবির। বড় নানা এবং ছোট নানাও যেন কেমন ব্যতিব্যস্ত। দুজনে ফিসফাস করছেন। হাসি হাসি ভাব।
বড় মামাকে দেখলাম না কোথাও। তামাম নানাবাড়ির বাতাসে যেন উড়ছে আনন্দের প্রজাপতি, ঘাসফড়িং। এমন আলামতে আমি কতকটা অবাক হলাম। জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে আম্মার চোখে চোখ রাখলাম। আম্মা আমাকে কাছে টেনে নিলেন। তারপর আমার মাথার এলোমেলো চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন- তোমার আব্বা আসবেন আজ বিকালে। নৌকা রওয়ানা হয়ে গেছে আশুগঞ্জের পথে। তোমার বড় মামাও গেছেন সে নৌকায়। খবর শুনে আমিতো লাফিয়ে উঠলাম।

বাইশ.
নানাবাড়ি জুড়ে খুশি আর আনন্দ থৈ থৈ করছে। ভিতর বাহির করছেন নানারা। তাদের চেহারায় উচাটন ভাব। বৈঠকখানায় পাতা চেয়ারে এসে বসেন, আবার অন্দরমহলে ঢুকেন। আসর আর মাগরিবের মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়ে গেছে সময়। না দিন, না সন্ধ্যা। ঠিক এই সময় নৌকা এসে ভিড়লো ঘাটে।
ঘাটলায় মানুষের জটলা। গ্রামেগঞ্জে এমনটাই হয়। নৌকা থেকে নামলেন আব্বা, পাশাপাশি বড় মামা। নানারা অপেক্ষা করছিলেন তফাতে। আব্বা সালাম দিলেন, তারপর কুশল বিনিময় করে অন্দরমহলে ঢুকলেন। আমিও আব্বার হাত ধরে থাকলাম। এতো দিন পর আব্বার দেখা পেলাম, বুকের ধরফরানিটা যেন থামতেই চায় না। অন্দরমহলে পৌঁছতেই অন্যরকম দৃশ্য। খালা মামারা এসে ঘিরে ধরলো আব্বাকে। কাজের মহিলারাও জড়ো হলো। সবার চোখ থেকে যেনো ঝরছে খুশির ঝরনা, ঝমঝম। নানিদের সালাম জানিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন আব্বা।
উত্তর ঘরের বারান্দায় বসে হ্যাজাক বাতি ঠিকঠাক করছিল সুলতান মিয়া। এদিকে মিটমিট করছে পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যের চোখ। আনন্দ উল্লাসের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভুলেই গিয়েছিল সতিশের কথা, বাড়ির সবাই। তাইতো, কি খবর মাছের। নানাদের চেহারায় ঝুলে আছে অস্থির অস্থির ভাব। সতিশ না এলে তো বেইজ্জতির এক শেষ হবে।
এমন ভাবনারা যখন দৌড়ঝাপ করছিল ঠিক তখনি সতিশের নৌকার গলুইর ভিতর মাছের আছারি পিছারি আওয়াজ। আমি আর হুমায়ুন মামা দৌড়ে গেলাম নৌকার কাছে। উদলা নৌকা। জেলেদের নৌকা এমনটিই হয়। নৌকাজুড়ে দুটি মাছ। চারপাঁচ জনে মিলে মাছ দুটিকে বের করে আনল। তারপর সোজা অন্দরমহলের উঠানে। আগে থেকেই আয়োজন করে রাখা হয়েছিল। বিছানো ছিল বাঁশের খলপার তৈরি দুখানা চাটাই, পাশাপিাশি।
বারান্দায় ঝুলানো ছিল হ্যাজাক বাতি। হ্যাজাকের আলোতে ফক ফক করছিলো সারা বাড়ি। মাছ দুটি তখনো লাফাচ্ছে। শরীর জুড়ে হেজাকের আলো ঝিকমিক করছে? সতিশ ছোট নানাকে জানালো এরচে বড় আর ধরা পরেনি। আপনার পছন্দ হয়েছে হুজুর? নানা জানালেন আমার নাতির পসন্দ হলেই আমি খুশি। কি বল নাতি, বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন নানা।
বিশাল আকারের দুটি মাছ। একটি কাতলা অন্যটি পাঙ্গাশ। আম্মা জানিয়ে ছিলেন। পাঙ্গাশের উজন নাকি সাতাশ সের, আর কাতলাটি ছিল প্রায় একমণের কাছাকাছি। এতো বড় মাছ এর আগে কখনো দেখিনি। আব্বাাকে নিয়ে এলেন বড় মামা। আব্বাও খুশি হলেন। মেঘনার পাঙ্গাশের নাকি খুব নাম ডাক।
সতিশ আর সতিশের ছেলে নিতিশ আব্বাকে এসে প্রণাম জানালো দুই হাত জোড় করে। আব্বাও ওদের দুজনকে বখশিশ দিয়ে দিলেন। বাড়ির জামাইদের নাকি এমনটি করতে হয়। তাছাড়া তোমার আব্বা এতো বড় বাড়ির জামাই বখশিশ টকশিশ না দিলে তোমার নানাদেরই তো লজ্জা। আম্মা চুপিচুপি আমাকে বলেছিলেন। মনে আছে চারদিক ঘিরে বসে ছিলাম আমরা ছোটরা। দুই ঘরের বারান্দায় দুখানা করে পাতা হয়েছিল চেয়ার। পশ্চিম বারান্দায় দুই নানা। উত্তর বারান্দায় আব্বা এবং বড় মামা। মাছ কাটাকুটি সারতে সারতে সকাল ছুৃঁইছুঁই।
নানাবাড়িতে সেদিন ঈদ ঈদ গন্ধ। আনন্দ খুশিরা লুকালুকি খেলছে এ ঘর-ও ঘরে। হ্যাজাক বাতি জ্বললো কদিন, আব্বার সম্মানে। তখন নানাবাড়িতে রাত আর রাত থাকলো না। দিন দিন ভাব বাড়ির কোনা কামছায়ও। আসরের পর পরই হ্যাজাক পয়-পারিষ্কারে লেগে পরতো সুলতান মিয়া। সেসব পাশে বসে বসে দেখতাম। হারিকেন আর হ্যাজাকের চেহারা সুরতে আলাদা আলাদা। আলোও জ্বলজ্বল করে।
শো শো একটা আওয়াজ কোত্থেকে যেনো লাফিয়ে পড়ে বাইরে। হারিকেনে এমন কিছু শোনা যায় না। মনোযোগ দিয়ে দেখলাম সুলতান মিয়ার হ্যাজাক জ্বালানো। এখানেও আম্মার শাসনের বেত লকলক করতো। কাছে ভিড়তে বারণ করতেন। দুর্ঘটনার নাকি হাত-পার অভাব নাই। যেকোনো সময় গলাটিপে ধরতে পারে। এসব শুনে ভয় ভয় লাগতো মাঝে মধ্যে। যখন আগুনে ধপধপ করে উঠতো হ্যাজাক।
সুলতান মিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হ্যাজাক লাইটের ঠিকানা। সুলতান মিয়া বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকলো। তারপর অনেক ভাবনা-চিন্তা করে জানালো এ বাড়ির দু’টি হ্যাজাক দু’ ঘরে থাকে। একটি উত্তর ঘরে, অন্যটি পশ্চিম ঘরে। আব্বা বসেছিলেন পশ্চিম ঘরের বারান্দায়। তিনিও শুনলেন সুলতান মিয়ার জবাব।
আব্বা আমাকে কাছে ডাকলেন হাসতে হাসতে। হ্যাজাক বাতির ঠিকানা বলতে কী জানতে চাও? কে বা কারা তৈরি করেছে এই তো! সুলতান মিয়া কাজের লোক, তার তো এসব জানার কথা নয়। শোনো এই হ্যাজাক লাইট তৈরি করেছিলেন জার্মানির এক লোক, তার নাম ছিল ম্যাক্স গ্রেইটজ। সময় ছিল ১৯১০ সাল। এর আগে অবশ্য স্প্রিট ল্যাম্প নামে এক রকম বাতির ছিল। গ্রেইটজ সেগুলোর মতো করেই হ্যাজাক বাতি তৈরি করেছিলেন।
এতোটুকু আসতেই আম্মার ডাকাডাকি। বৈকালিক নাস্তা তৈরি করে বসে আছেন। নানাবাড়ির একটা রেওয়াজ আসরের পর পরই চা-নাস্তার আয়োজন। বাড়ির কাজের লোকরাও এতে শামিল হয়। হ্যাজাকের পুরু ঠিকানা আগামিতে জানবো-এই ওয়াদার পর আমি আর আব্বা ঘরের দিকে রওয়ানা দিলাম। এমন সময় কোত্থেকে যেনো হুমায়ুন মামা এসে হাজির। আমরা তিনজন নাস্তা সাজানো ফরাশের দিকে পা বাড়ালাম।
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

