ছয়.
বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আমি বুঝতে শিখেছি- বড়োদের সম্মান করতে হয়। বড়োদের সম্মান করার এই শিক্ষাটা আমি আমার পরিবার ও গ্রামীণ পরিবেশ থেকে পেয়েছি। বাবা-মা ও বাংলাদেশের এই গ্রাম থেকে আমি যেসব মূল্যবোধ শিখেছি, তা পরবর্তী সময়ে আমার জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। আমি আমার সারাজীবন ধরে এসব মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরেছি ও চর্চা করেছি।
এজন্যই ব্রিটেনে আমাদের আগে যারা প্রবাসী হিসেবে এসেছিলেন, তাদের অবদান আমি কখনোই অস্বীকার করতে পারি না। তাদের যে তখন কেমন ও কতটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, তা আমি পুরোপুরি না বুঝলেও কিছুটা টের পাই। বিভিন্ন কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েও তারা এসব সমাজ কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আর আমরা প্রবাসীরা এখন এসবের ওপর নির্ভরশীল। এ কথা ভাবতেই তাদের জন্য অজান্তেই শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে।
বর্তমান প্রজন্মের মানুষ হিসেবে আমি তাদের এই অবদানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করি। তাদের করে ও রেখে যাওয়া প্রতিটি কাজের প্রতি আমি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। এবং আমি চাই, আমাদের পরবর্তীর প্রজন্মও তাদের এসব কাজকে যত্নের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে পড়ে এসব কাজ বন্ধ হয়ে যাবে না; বরং আরও বিকশিত হবে।
আমি প্রতিটি কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে পছন্দ করি। শুধু কাজ নয়; চিন্তাভাবনা ও মতাদর্শিক দিক থেকেও আমি মধ্যমপন্থি। এটি একই সাথে আমার পারিবারিক শিক্ষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। যেটি পরবর্তী সময়ে আমার প্রতিটি কাজে পথ দেখিয়েছে।
আমার প্রতিটি কাজের মূলে থাকে সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জাতির স্বার্থ। এ দুটিকে সামনে রেখেই আমি যেকোনো কাজে হাত দিই। এর পাশাপাশি আমি আধ্যাত্মিক উন্নয়নের ব্যাপারটাকেও খুব করে অনুভব ও স্বীকার করি। আমি মনে করি, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ব্যতীত মানবতার অস্তিত্বের বিদ্যমান জটিলতা নির্মূল করা অসম্ভব।
এই দুটি জায়গায় ব্যালেন্স করতে পারা খুব জরুরি। আমি চেষ্টা করি, এখানে ভারসাম্য ধরে রাখার। কর্মের চাহিদা ও ব্যক্তিগত মতাদর্শ এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমন জরুরি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি নিশ্চিত করার মধ্যকার ভারসাম্য। কাজ করতে করতে যেন নিজেকে হারাতে না হয়। আবার নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকতে থাকতে যেন কর্মযজ্ঞ ব্যাহত না হয়।

কর্মের এই যাত্রায় আমি এক অনন্ত মুসাফির। এই পথে পথ চলতে চলতে আমি বুঝতে পেরেছি, ব্রিটেনে আমার পেশাগত পরিচয় ও ব্যক্তিগত পরিচয় অনেকটাই একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কারণ, আমি কেবল নিজেকে নিয়ে থাকি না; বরং আমি নিজেকে আমার সম্প্রদায়ের একটা অংশ মনে করি। ফলে আমাকে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, মিশতে হয় তোদের সঙ্গে।
ব্রিটেনে কাজ করে আমি একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছি। আর তা হলো মানুষের সঙ্গে একত্রিত হয়ে কাজ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আরও অনুধাবন করেছি নৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা, বৃদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের অপরিহার্যতা।
আমার লেখা BANGLADESH RISING: Reclaiming Values, Rebuilding a Nation বইটি মূলত এই অনুধাবনেরই ফলাফল।
২০২৪-এর আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র বিপ্লবও বাংলাদেশজুড়ে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের এক নতুন ধারা তৈরি করেছে। আমি যখনই এটা নিয়ে ভাবি, তখনই আমার মনে পড়ে যায় ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির স্ট্রাগলের কথা। আমার মনে হয়, এ দুটি একই সুতোয় গাঁথা। কারণ, দুটিই ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। দুটিই সামাজিক পরিবর্তন ও জনগণের ক্ষমতায়নের কথা বলে।
১৯৭০ দশকের শেষ দিকে ব্রিটেনে আমার যাত্রা শুরু হয়। আমি যখন ব্রিটেন আসি, তখন আমি যুবক। এখানে আসার আমার প্রধান কারণ ছিল পড়াশোনা ও পেশাগত স্থিতিশীলতা তৈরি করা। কিন্তু এখানে আসার পর আমার মিশন ও ভিশন কেবল এ দুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিদেশের মাটিতে বসেও আমি আমার দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবতে থাকি। কী করে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক একটা জাগরণ তৈরি করা যায়, এটাই হয়ে যায় আমার প্রধান চিন্তা ও মিশন।
আপনাদের মনে হতে পারে, এই বইয়ে আমি মূলত আমার ব্যক্তিগত কথাবার্তা লিখেছি। কিন্তু এটা পুরোপুরি সঠিক নয়; বরং এর পাশাপাশি আমি এর মধ্য দিয়ে প্রতিটি বাংলাদেশিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নেতৃত্বের দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে আহ্বান জানিয়েছি। পড়াশোনা, শিক্ষাদীক্ষা, দেশ ও দশের সেবা করা, বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে দেশের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছি।
আমি সব সময় বিশ্বাস করি, ব্রিটেনে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা যদি প্রতিকুলতা কাটিয়ে উঠতে পারে, তারা যদি সকল বিপদ ও ঝঞ্ঝা পাড়ি দিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে, তবে বাংলাদেশি নেটিভরা কেন পারবে না? বরং আমার শক্ত বিশ্বাস, বাংলাদেশিদের মধ্যেও সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিভা রয়েছে।
সঠিক জ্ঞান, বিদ্যা, ঐক্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ করে যাওয়ার দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ যদি দেওয়া যায়, তবে আমার দেশের মানুষেরাও এগিয়ে যাবে। এটাই প্রতিটি সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি। এর হাত ধরেই সংগ্রাম শক্তিতে পরিণত হয়। (ধারাবাহিক চলবে)
ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট

