বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প জাতীয় বাজেট পেশ করেছে । বাজেটে জনপ্রশাসন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিকল্প বাজেট পেশ করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি।
উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুর রব, অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, মো. সেলিম উদ্দিন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ড. মো. রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান ও সেক্রেটারি জেনারেল জনাব নিজামুল হক নাঈম, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর আবদুল মাজেদ আতহারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর আহমাদ আলী কাসেমী এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজি।
আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশবাসী, আমরা সকলে ইতিহাসের সাক্ষী। আজকের বাংলাদেশের সূচনা মূলত ১৯৪৭ সালে। ৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং আরও তিনটি প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝখানে ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা রয়েছে। ১৯৪৭ সালে যে ভূখন্ডটি অখণ্ড ভারত থেকে এবং ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের যে সীমানা ছিল,তাই আজকে বাংলাদেশের সীমানা। মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং বায়ান্নতে যারা জীবন দিয়েছেন, লড়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের শহীদ হিসেবে কবুলের জন্য দোয়া করেন এবং বেঁচে থাকা আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান আমীরে জামায়াত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চব্বিশের জুলাইতে দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার আগে নেতারা জনগণকে ওয়াদা দিয়েছিলেন- এমন একটি দেশ আমরা জনগণকে উপহার দেব, যেখানে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং অর্থনৈতিক সংকট দূর হবে। বেকারত্ব থাকবে না। আমরা সমস্ত শিশুদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করব। কিন্তু না, তার কোনো ওয়াদা পূরণ হয়নি। বরং ক্ষমতায় বসে জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে তৎকালীন সরকার দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। যার কারণে দুঃখজনকভাবে তাদেরকে বিদায় নিতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ক্রমাগত পথ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এ দেশের মানুষ একটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে বুক পেতে লড়াই করেছিল। লড়াই কোনো দলের পক্ষ থেকে হয়নি। এই লড়াই হয়েছে জনগণের পক্ষ থেকে। সমগ্র দেশবাসী, ছাত্র, জনতা, শ্রমিক-কৃষক- সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং লড়াইয়ের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকার অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিক সকল জায়গায় আজকের নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ স্পষ্ট। সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা কর্পোরেশন সবগুলোয় সেই থাবা বিস্তৃত হচ্ছে এবং সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। এভাবে যদি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তাহলে জাতির গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে প্রশ্ন রাখেন আমীরে জামায়াত।
জামায়াতের জনবান্ধব বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা মনে করি আগামীর বাজেট কেমন হওয়া উচিত, সেই ব্যাপারে জনগণের অভিপ্রায়কে অনুধাবন করে জনগণের সামনে আমাদের চিন্তাগুলা পেশ করা দরকার।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি একটি বাজেট নয়, এটা বাজেটের পূর্ব ধারণা। এখান থেকে যদি সরকার ভালো কিছু পিকআপ করেন, জনগণ উপকৃত হবে এটা কোনো দলের বিষয় নয়। আমরা এই বাজেট কোনো দলের জন্য দিচ্ছি না। এই বাজেট ১৮ বা ২০ কোটি মানুষের জন্য হতে পারে। আমরা যে প্রস্তাবনাটা জনগণের সামনে পেশ করব- এটার শর্ত আছে। শর্তগুলো হলো-এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা লাগবে, জবাবদিহিতা লাগবে। সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার যদি নিশ্চিত করা যায়। আমরা মনে করি যে বাজেট প্রস্তাবনা আমরা করব। সেটা অবশ্যই অর্জনযোগ্য। কিন্তু যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং অ্যাকাউন্টেবিলিটি না থাকে, তাহলে বাজেট যে সরকারই দিক না কেন, ওই বাজেট কার্যকর হবে না।
তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাবনায় আরও কিছু বিষয় থাকবে। সেটা এখানে এবং সংসদে। আমাদের অর্থবছর হচ্ছে জুলাই টু জুন। জুন মাস, বর্ষা খড়া, দুর্যোগ, সাইক্লোন- এগুলোতে সাধারণত আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা লক্ষ্য করি, এডিপির একটা বিশাল অংশ শেষের দুই মাসের তাড়াহুড়ো করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। একটি বাস্তবায়ন নয়, এটি হচ্ছে গণলুটপাট। এর সুফল জনগণ পায় না। কিছু অসৎ সুবিধাভোগীর পকেটে সুফল চলে যায়। আমাদের অর্থবছরটি ক্যালেন্ডার বছরের সাথে মিলিয়ে করা হোক আমরা সংসদে সেই প্রস্তাব দেব। তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে না। এই টাকাগুলোর খবর পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, নিয়ম রয়েছে বাজেট পুরো হওয়ার মিনিমাম তিন মাস আগে সম্পূরক বাজেট সংসদে পেশ করতে হবে। কিন্তু আমরা সম্পূরক বাজেট পাবই শেষ মাসে। বৈধ অবৈধ, ন্যায্য-অন্যায্য সব খরচ হয়ে গেল। কালো টাকা সাদা হয়ে একাকার হয়ে গেল। তারপরে সম্পূরক বাজেট সংসদে আসল, তাতে জনগণের লাভ কি?
আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের ট্যাক্স কালেকশনের যে পদ্ধতি রয়েছে, সেটা দারুণ ত্রুটিপূর্ণ। যারা ট্যাক্স দেন তারা তিন ধরনের ট্যাক্স দেন। একটা ট্যাক্স ট্রেজারে (সরকারি কোষাগারে) জমা হয়, একটা কিছু ব্যক্তির পকেটে যায় (ট্যাক্স আদায়কারীদের একটি অংশ)। আরেকটা চাঁদাবাজদের পকেট যায়। ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। যার কারণে ট্রেজারির ট্যাক্সটা তার নম্বর ভলিউমের দিক থেকে ছোট হয়ে আসে।
তিনি বলেন, যদি সততা এবং স্বচ্ছতা মেনে ট্যাক্স কালেকশন করা যায়, অটোমেটিক্যালি ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহে আরও বেশি ট্যাক্স দিবেন জনগণ ও রাষ্ট্রকে। এতে রাষ্ট্র এবং জনগণ উপকৃত হবে। তাছাড়া ট্যাক্স বেইস সম্প্রসারণ করার প্রয়োজনকে আমরা অস্বীকার করি না। আমরা প্রিয় দেশবাসীর কাছে জনবান্ধব একটি বাজেট প্রস্তাবনা আমাদের বিবেচনায় পেশ করতে যাচ্ছি। আসল বিচারক হবেন জনগণ। বাজেট পেশ করার পরে আমরা সচেতন জনগণের কাছ থেকে ফিডব্যাক আশা করব। আমাদের কোনো প্রস্তাবনা তাদের কাছে ভালো লাগলে সেটা বলার দরকার নেই। কিন্তু কোনো প্রস্তাবনা যদি জনস্বার্থের বিপক্ষে হয়, তারা যেন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, আমাদের সমালোচনা করে সহযোগিতা করেন।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সমালোচনাকে অভিনন্দন জানাব। এখান থেকে শিখব আমাদের জ্ঞানের ঘাটতি পূরণ করব। জনগণের জন্য আগামীতে আরও সুন্দর এবং আরও পরিপূর্ণ চিন্তা করার প্রয়াস পাব।
পরিশেষে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তোলার তাওফিক কামনা করে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন আমীরে জামায়াত।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন) বাজেট উপস্থাপন করেন।

