বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় গ্রেপ্তার হন মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান : মুক্তির পর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

এক মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/1814172182964643

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেন। পরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে তাঁর সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ট্রলির সংকট, লাগেজ থেকে মালামাল চুরি এবং যাত্রী হয়রানিসহ বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদ করেছিলেন মেজর আখতারুজ্জামান। তাঁর প্রতিবাদের ভাষা কঠিন হলেও তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন আমীরে জামায়াত।

এক মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর সহকর্মীকে আবার তাঁদের মাঝে ফিরে পেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছেন ডা. শফিকুর রহমান । তিনি বলেন, মেজর আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দফায় নতুন ট্রলি সংযোজন, লাগেজ বেল্টে ক্যামেরা স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীরা আগের তুলনায় দ্রুত লাগেজ পাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, এসব উদ্যোগের সুফল সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি প্রবাসীরাও পাচ্ছেন। মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও প্রবাসীরা সভা-সমাবেশ, মিছিল ও বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন।

অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চরিত্রহননের চেষ্টা বন্ধ করে নিজেদের ব্যর্থতা ও অদক্ষতা কাটিয়ে জনগণের সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও অদক্ষতার সমালোচনা মোকাবিলা না করে বিরোধী দলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতেই এ ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের চরিত্রহনন বাদ দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার সমাধানের চেষ্টা করুন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে পারলে জনগণ আপনাদের সমর্থন করবে।’ অতীতের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, ‘যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে। ছোবল দিয়ে সাপ পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরদেহ পড়ে থাকবে।’ এ সময় ‘বসন্তের কোকিল’ উপমা ব্যবহার করে সুসময়ে পাশে থাকা ব্যক্তিদের দুঃসময়ে না পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলেন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের কারাবাস ও গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, জনগণের পক্ষে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলার সাহস মহান আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

গ্রেপ্তারের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনের বিবরণ দিয়ে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হলে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানোর কথা জানিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারে আপত্তি না থাকলেও তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আখতারুজ্জামান দাবি করেন, তাঁর চোখ বেঁধে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এখতিয়ার আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আখতারুজ্জামান বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ তদন্ত করতে পারে। তবে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নামে জিজ্ঞাসাবাদ গ্রহণযোগ্য নয়।

নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও বিষয়টি চেম্বার আদালতে নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ধরনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আবেদন জানাবেন বলে জানান তিনি।

প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একটি রিসিপশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মুক্তির পর সংবর্ধনার আয়োজন এবং কারাবাসের সময় পাশে থাকার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় ডা. শফিকুর রহমানও মেজর আখতারুজ্জামানের মুক্তির পর দেশবাসী ও প্রবাসীদের সহানুভূতি, সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। বিশেষ করে প্রবাসীদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে।

সকাল ১০টায় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এমপি মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামানকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভ্যর্থনা জানান জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোঃ মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ঢাকা জেলা আমীর মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, জয়নাল আবেদীন এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার এবং আইনজীবী শেখ মোঃ রোকন রেজা প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *