যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা বন্ধ করা হবে। তবে সহায়তা বন্ধের পরও ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে এবং দেশটির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কয়েক মাস আগেই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। খবর রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইসরাইলকে মার্কিন সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন রাজনীতিক এই সহায়তার বিরোধিতা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি সামরিক সহযোগিতা সমঝোতা অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরাইলকে মোট ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে: ৩.৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সামরিক অর্থায়ন (Foreign Military Financing), যার মাধ্যমে ইসরাইল মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারে। ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সহযোগিতার জন্য। অর্থাৎ, দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী বছরে মোট ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা। ট্রাম্পের উল্লেখ করা ৪ বিলিয়ন ডলার মূলত এই বার্ষিক সহায়তার আনুমানিক পরিমাণ।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দুই দেশের বিদ্যমান সামরিক সহায়তা চুক্তি নিয়ে। ২০১৬ সালের সমঝোতা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কাঠামো কার্যকর থাকার কথা। ফলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই সহায়তা বন্ধ করতে হলে বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিবছরের সহায়তার অর্থ ছাড় করতে কংগ্রেসের অনুমোদন ও বরাদ্দ প্রয়োজন। ট্রাম্প কীভাবে বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সহায়তা বন্ধ করবেন, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই মার্কিন সহায়তা বন্ধের বিষয়টি আলোচনায় তুলেছিলেন এবং এ বিষয়ে কয়েক মাস আগেই দুই নেতার মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর ইসরাইলের নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্যে একবারে সহায়তা বন্ধের পরিবর্তে আগামী কয়েক বছরে নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছিল।
ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী রাজনীতিক গাদি আইজেনকট বলেছেন, দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ ও জনগণ সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের খবর জানতে পারছে, যা উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা ইয়ার গোলান বলেছেন, একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ হলে ইসরাইলের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় বোঝা ইসরাইলের জনগণের ওপর পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণার সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমেছে।
ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদের নাম উল্লেখ করেন। আল-সায়েদ ইসরাইলকে শর্তহীন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ইসরাইলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনার হাতিয়ার হয়ে উঠুক, তা তিনি চান না। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নির্বাচনের দিন এই ঘোষণা দেওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, ইসরাইল প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারবে। অর্থাৎ অনুদান বা আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে অস্ত্র কেনাবেচা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও যৌথ উৎপাদনকেন্দ্রিক হতে পারে। এ ছাড়া আগে কেনা অস্ত্র ও সরঞ্জামের সরবরাহও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে না। কারণ অনেক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহে কয়েক বছর সময় লাগে।
ফলে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে: ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেটে নিজস্ব অর্থায়নের চাপ বাড়তে পারে। মার্কিন অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ইসরাইলকে আরও বেশি নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক অনুদাননির্ভর ব্যবস্থা থেকে বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার দিকে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইসরাইলনীতি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

