ফেসবুকে সরকারি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের হুমকির পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (রাকসুর জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে তেজোদৃপ্ত জবাব দিয়েছেন তার মা রোকেয়া খানম। মূহুর্তের মাঝে এটি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। শত শত সাহসী মায়েরা রোকেয়া খানমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফ্যাসিবাদী অপশাসনের অবসান এবং ভয়ের সংস্কৃতি তথা ভিন্নমত দমন থেকে সমাজকে মুক্ত করতে সোচ্চার থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
নিজের সন্তান সম্পর্কে আত্মতৃপ্তি ও গৌরববোধ প্রকাশ করে নিজেকে একজন ‘গর্বিত বিপ্লবীর’ মা হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাকসুর জিএস আম্মারের সংগ্রামী জীবন এবং তাদের পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন রোকেয়া খানম।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল ২০২৬) রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে আম্মারের মা লিখেছেন, ‘আমি এক গর্বিত বিপ্লবীর মা বলছি: সালাহউদ্দিনকে নিয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আমার অনেক বেশি চিন্তা হতো। যেদিন আবু সাঈদ শাহাদাত বরণ করলেন, সেদিনই আমি আমার একমাত্র ছেলেকে দেশের মানুষের জন্য দিয়ে দিয়েছি। আম্মারকে কেউ ঘৃণা করলে সেটা দলের জন্য ঘৃণা করে, আর তাকে ভালোবাসলে দেশের জন্য ভালোবাসে।’
নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লেখেছেন, ‘আমি আমার জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। আমার আপন ভাইকে বিএনপি করার কারণে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটাতে দেখেছি। আমার স্বামীকে জামায়াত সমর্থনের কারণে কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যেতে দেখেছি, যে নির্যাতনের জেরস্বরূপ তিনি আর সুস্থ হতে পারেননি।’
‘এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালে সালাহউদ্দিনকে একরকম চুপিচাপি দূরে পাঠিয়ে দেই।’
তারপর আম্মারের মা ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা অনেকে তার কাজকর্মে বিরক্ত হন, আবার অনেকে পোস্ট ও কমেন্ট করেন- ২০২৪-এর আগে কোথায় ছিলি! তার কৈশোর কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট লীগ। এই ইস্যুগুলো দেখতে দেখতে তার জীবনে কারো জন্য, এমনকি নিজের জন্যও কোনো বিন্দুপরিমাণ আবেগ নেই। শাহবাগে তার রক্তাক্ত ছবিটা দেখেও বোঝেননি আপনারা?’
দেশের জন্য নিবেদিত সন্তানের প্রতি আত্মতৃপ্তি ও গৌরববোধ প্রকাশ করে মা রোকেয়া খানম লিখেছেন, ‘তাকে থামতে বলতে বলতে চলতে শিখে গেছি। থামতে আর বলি না- চলতে থাকুক। এখন শুধু নামাজান্তে দোয়া করি, আল্লাহ যখন তাকে নিয়ে যাবেন তখন যেন আমি তাকে হাসিমুখে বিদায় দিতে পারি।
উল্লেখ্য, ছাত্রদল সভাপতি রাকিব বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল ২০২৬) তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘৫ আগস্টের পর এই সালাউদ্দিন আম্মারদের আবির্ভাব, কিন্তু ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে উত্তীর্ণ। তারা মজলুম, তারা নির্যাতিত, তারা নিপীড়িত। অথচ সেই মজলুমদের নিয়েই ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে আবির্ভাব সালাউদ্দিন আম্মার আজ এ ধরনের অশ্রাব্য ভাষায় প্রতিনিয়ত গালি দিয়ে যাচ্ছে, চরিত্র হরণ করে যাচ্ছে। সালাউদ্দিন আম্মারকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ছাত্রদল শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী জেলা, মহানগর ইউনিটে সমৃদ্ধ নয়, আম্মারের জন্মস্থান যেখানে তার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতাসহ পরিবারের সদস্যরা বসবাস করেন, সেখানে যেমন ছাত্রদল রয়েছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, জেলা, মহানগর, উপজেলায় ছাত্রদলের লাখ লাখ নেতাকর্মী রয়েছে।’
ছাত্রদলের সভাপতির হুমকি প্রসঙ্গে এই মা লিখেছেন, ‘১৬ জুলাই ২০২৪ থেকে ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত আমাকে আর তার বাবাকে ঘরবন্দী করে রেখেছিল লীগ আর ডিবি। তার বাবার ওষুধ পর্যন্ত নিতে দেয়নি। তাদের একটাই কথা ছিল- সালাহউদ্দিনকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে আসি, না হলে আমার স্বামীকে মেরে ফেলবে। আমি সেদিনও তাকে থামতে বলতে পারিনি। আপনাদের এই হুমকির সাথে আমি পরিচিত। ছেলের জন্য আমাকে মারবেন? নাকি আমার অসুস্থ স্বামীকে মারবেন? আল্লাহ সবকিছুই দেখছেন।’
থানায় জিডি করার পরামর্শ দেওয়া স্বজনদের উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিন আম্মারের মা লিখেছেন, ‘প্রয়োজন হলে করব, তবে নিরাপত্তার জন্য নয়; জাহেলি যুগের মতো ইতিহাসের সাক্ষী থাকার জন্য। আমার পরিবারের কোনোদিন কিছু হলে যেন এই জিডির কপি দেখে বাংলাদেশের বিপ্লবী সন্তানদের মা-বাবারা সাহস পান।’
‘বললাম না- বিএনপি করার কারণে আমার আপন ভাইকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছিল; সেই ভাই এখন সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়। এটা দেখে আমি বুঝে গেছি, যেই ক্ষমতায় আসুক সালাহউদ্দিন তাদের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে, আর যত বড় রক্তের মানুষ হোক না কেন, তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলবে। আমি একজন বিপ্লবী দেশপ্রেমিকের মা হয়ে বলব- রাজনীতি করুন, এটা আপনার অধিকার। সব দল, মত ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করুন, তবে সেটা যেন ইতিবাচক হয়। শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে যেন আমরা বাংলাদেশকে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দেখতে পাই।’ বলছেন সালাহউদ্দিন আম্মারের তেজোদৃপ্ত মা!

