উত্থানের পথে বাংলাদেশ, মূল্যবোধ ফেরানো ও জাতি গড়ার স্বপ্ন || ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী

প্রবন্ধ-কলাম সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

পাঁচ.

ব্রিটেনের কয়েক দশকের কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটা বিষয় আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়েছে- যেকোনো জাতির উন্নয়নের জন্য নাগরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে তাদের সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা প্রয়োজন। আর এই সক্রিয়তা সৃষ্টি হয় প্রতিবেশী ও আশপাশের কমিউনিটি থেকে। জাতির উন্নয়নের পক্ষে এটা অতীব জরুরি- এ কথা আমি হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি।

একটি জাতি কেবল অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেই উন্নত হয় না। সার্বিক উন্নতির জন্য দেশের জনতার মধ্যে ক্ষমতায়ন করতে হয়। দেশের নাগরিকদের মধ্যে থাকতে হয় জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ, যেকোনো কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারার যোগ্যতা, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই পালটে দেওয়ার অদম্য বাসনা ও প্রতিজ্ঞা।

ব্রিটেনে থাকাকালীন অনেক তৃণমূল সংগঠন ও কমিউনিটি গ্রুপের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তখন আমি বুঝেছি, সমাজের পরিবর্তন শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। সবাই যখন একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে, তখন সে জাতির পরিবর্তন ঘটবেই। তবে এজন্য প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি সদস্যকে জ্ঞানী ও সক্রিয় করে গড়ে তোলা। এ ছাড়া তারা স্রেফ জনসংখ্যা; জনশক্তি নয়।

বছরের পর বছর ব্রিটেনে থেকে আমি আরও একটা জিনিস ভালো করে বুঝেছি। সেটা হলো- গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের নাম নয়। গণতন্ত্র মানে হলো, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। দেশ ও সমাজের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সর্বস্তরের জনগণের কণ্ঠস্বরকে ভ্যালু করার নামই গণতন্ত্র। যেখানেই জনজীবন সংশ্লিষ্ট, সেখানেই জনতার কণ্ঠস্বর। একটি দেশের প্রতিটি নাগরিক যখন জ্ঞানী হবে, দেশের প্রতিটি কাজে সংশ্লিষ্টতা রাখবে এবং একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে, তখনই সেখানে গণতন্ত্র ফুল-ফল-পত্র-পল্লবে পরিস্ফুটিত হবে।

ব্রিটেনের বিভিন্ন সংগঠন থেকে আমি এই শিক্ষাই পেয়েছি, বিশেষত সিটিজেনস ইউকে। এই সংগঠনে কাজ করে আমি দেখেছি, তৃণমূলের সংশ্লিষ্টতা কতটা পাওয়ারফুল। নিরাপদ আবাসন প্রকল্প থেকে শুরু করে, শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সকল কাজে তৃণমূলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই সংগঠনের কাজকে সাফল্যমন্ডিত করেছে। এই সফলতা সরাসরি আসমান থেকে নাজিল হয়নি। এজন্য কাজ করতে হয়েছে। তারা সকলেই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ না করত, নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে নিজেরা ভূমিকা পালন না করত, তবে এই সকল সফলতা ছিল কেবল দিবাস্বপ্ন।

এখানে আরও একটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হচ্ছে, নৈতিকতা। নৈতিকতাকে সাথে নিয়ে নেতৃত্ব প্রদান। ইতিহাসে এ পর্যন্ত যত আন্দোলন সফল হয়েছে, যত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, সবকিছুর পেছনে ছিল এই নৈতিকতা। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে সাউথ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল এই নৈতিকতার অপরিহার্য ভূমিকা।

এসব আন্দোলন এমন সব নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যারা ছিলেন নৈতিকতার প্রশ্নে শতভাগ উন্নীত এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। তারা কেউই নিজের স্বার্থে ক্ষমতায় যেতে চাননি; বরং তারা চেয়েছিলেন ইনসাফ, ন্যায়, আত্মমর্যাদাবোধ ও আপামর জনতার কল্যাণ প্রতিষ্ঠা। তাদের অদম্য সাহসিকতা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও উন্নত নৈতিকতা গোটা জাতিকে নিজস্ব সার্থ ও আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে উঠিয়েছিল। সকলেই দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পেরেছিল।

ব্রিটেনে শেখা আমার সেই নেতৃত্বের অপরিহার্যতা পরবর্তী সময়ে আমার কাজে আমাকে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করেছিল। বিশেষত আমি যখন যুবক ও যুব সম্প্রদায়ের সুপ্ত প্রতিভা নিয়ে কাজ করি, তখন এটি আমাকে খুব করে সাহায্য করে। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি, যেকোনো সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ এর যুব সম্প্রদায়ের হাতে। শিক্ষাদীক্ষা, নাগরিক সমাজের সাথে সংশ্লিষ্টতা, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয়- এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে যুব সম্প্রদায় জাতির জন্য একটি সুন্দর আগামী তৈরি করে। এই বিশেষ ক্ষমতা স্রষ্টা তাদের দিয়েছেন।

সেজন্য আমি প্রায়ই যুব নর-নারীর সঙ্গে কাজ করি, তাদের নিয়ে কাজ করি। আমার ফোকাস থাকে বিশেষত কর্মজীবী যুবক-যুবতিদের ওপর। কারণ, তাদের মধ্যে দেশকে কিছু দেওয়ার মানসিকতা সহজেই সঞ্চারিত করা যায়। একসময় এই দেশ তাদের দিয়েছে। এখন তারা বড়ো ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশকে দেবে। যুবকদের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে একটি সমাজ কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক ও নাগরিক বিভিন্ন সংগঠন পর্যন্ত সবখানে যুব সম্প্রদায়ের অন্তহীন গতিশীলতা অতীব জরুরি। যুবকদের ছাড়া আপনি একটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কখনোই পৌঁছতে পারবেন না। আমাদের আগের প্রজন্ম দেশ ও জাতির কল্যাণে করা যেসব কাজ অসমাপ্ত রেখে গেছেন, সেগুলোর সুন্দর সমাপ্তির জন্য যুবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যুবকদের হাত ধরেই এসব অসমাপ্ত কাজ থমকে না গিয়ে পরবর্তী সময়ে আবারও চালু হবে, চলতে থাকবে এবং আরও বিস্তার লাভ করবে। যুবকদের সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় এসব কাজ আরও আধুনিক হয়ে যুগের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। (ধারাবাহিক চলবে)

ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *