বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটির আয়োজনে ‘বার্ষিক প্রতিনিধি সম্মেলন ও এ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় রাজধানির বিয়াম অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটির সভাপতি মাওলানা আবদুস শহীদ নাসিম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল মাহবুব উল আলম (অব.)।
এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- প্রফেসর মাহবুব আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির (অব.), প্রফেসর ড. শামীমা তাসনিম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আব্দুল হাকিম আজিজ (অব.)।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সোসাইটির সভাপতি মাওলানা আবদুস শহীদ নাসিম বলেন, বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কুরআনের আলো বিস্তার, আলোকিত সমাজ গড়া, সমাজ সেবা ও শিক্ষা বিস্তারে অবদানের জন্যে বিভিন্ন সময় বিদগ্ধ মণীষীদের এ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা প্রদান করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোসাইটি এ বছর ৯জন মনীষীকে ‘বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি এ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ প্রদানের জন্যে মনোনীত করে। তিনি বলেন, আমরা সাওয়াবের থেকে বেশি গুরুত্ব দিবো পরকালিন মুক্তির সনদ আল কুরআনের অধ্যয়নকে। পরকালে জান্নাত লাভ করলে তখন সাওয়াব কাজে লাগবে। কুরআন শুধু তেলাওয়াতের বিষয় নয়, কুরআন বুঝে পড়তে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে। তাই আমরা সমাজের সর্বস্তরে নিয়মিত কুরআন অধ্যয়নের প্র্যাকটিস চালু করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়াও প্রতি রমজানের ৩য় জুমআ বার হচ্ছে কুরআন দিবস। আমি প্রত্যেককে কুরআন দিবস পালন করার আহবান জানাই। জান্নাত লাভের আশায় কুরআনিক সমাজ বিনির্মাণে আপনারা সকলে এগিয়ে আসুন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি এ্যাওয়ার্ড-২০২৬ ও সম্মাননা পদক ও সম্মাননা পত্র প্রদান করা হয়। তাঁরা হলেন ইসলামি শিক্ষা ও উলামা ঐক্যে- মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সেবায়- প্রফেসর মাহবুব আহমদ, ইসলামি শিক্ষা ও উলামা ঐক্যে- মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক, মানাব কল্যাণে অনন্য অবদান- অধ্যাপক আবু নাছের মোহাম্মদ আবদুজ জাহের, মহিলাদের মাঝে দীনি দাওয়াত বিস্তারে- প্রফেসর ড. শামীমা তাসনিম, জুলাই বিপ্লব ২০২৪ এ অবদান- জনাব নাহিদ ইসলাম এমপি, আদর্শ প্রশাসক হিসেবে- শাহ আবদুল হান্নান (মরনোত্তর), আদর্শ প্রশাসক হিসেবে- এ জেড এম শামসুল আলম (মরণোত্তর), কুরআন ও দীন প্রচারে- জনাব মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম (মরণোত্তর), কুরআনের বৈজ্ঞানিক গবেষণায়-এয়ার কমোডর ড. সৈয়দ জিলানী মাহবুবুর রহমান (মরণোত্তর) অবদানের জন্যে এ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা স্বারক প্রদান করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেজর জেনারেল মাহবুব উল আলম (অব.) বলেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতায় নয়—বরং নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। কুরআনের শিক্ষা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা শেখায়, যা একটি সুশাসিত সমাজ গঠনের মূল উপাদান। তিনি সংগঠনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ঘরে ঘরে কুরআন শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত ও সৎ নেতৃত্বে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, তাহলেই সংগঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এছাড়াও পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে উল্লেখ করেন যে, এই স্বীকৃতি কেবল সম্মান নয়—বরং এটি একটি আমানত, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে দ্বীনি ও সামাজিক সেবায় অবদান রাখার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শুরুতেই অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পত্র দেওয়ার জন্যে বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা সোসাইটির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, বর্তমান মুসলিম উম্মাহ যে নানাবিধ সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন—তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনৈক্য ও বিভক্তি। তিনি পবিত্র কুরআনের আলোকে উল্লেখ করেন যে, মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘আল্লাহর রজ্জু’ দৃঢ়ভাবে ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনার মধ্যেই মুসলিম সমাজের শক্তি, স্থিতিশীলতা ও সফলতার মূল নিহিত রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, ভিন্ন ভিন্ন দল বা সংগঠনের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক; তবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা, কুরআনের শিক্ষা প্রসার এবং উম্মাহর কল্যাণের প্রশ্নে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি ভবিষ্যতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আব্দুল হাকিম আজিজ (অব.) বলেন, একটি শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক জাতি গঠনে কুরআনের শিক্ষা অপরিহার্য। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কুরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করলে নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। তিনি তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন শিক্ষায় সুদৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কুরআন শিক্ষা সোসাইটির কার্যক্রম দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রতি তিনি ঐক্য, দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রফেসর মাহবুব আহমদ বলেন, মরহুমদ্বয় শুধু সৎ, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাই ছিলেন না বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইসলামী অর্থনীতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অসামান্য অবদান রয়েছে। তারা উভয়েই খ্যাতিমান লেখক ছিলেন। তারা তাদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে আগামীতে সুখী, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে মূল্যবান দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। মরহুমদ্বয়ের রচনাবলী দেশ ও জাতির জন্য এক মহামূল্যবান সম্পদ। মূলত, তাদের দিকনির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারলেই সুখী, সস্মৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। তিনি দেশ ও জাতির জন্য মরহুমদ্বয়ের অবদান স্বীকৃতি তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান।
প্রফেসর ড. শামীমা তাসনিম বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে আরবি ভাষার পাশাপাশি মাতৃভাষায় কুরআন অনুধাবন করতে শিখিয়েছে। ফলে আমরা কুরআনের সাথে পথ চলা শিখছি এবং একই ভাবে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকেও কুরআন অনুসরণে পথ চলতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রোক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা সোসাইটির উপদেষ্টাগণ কমিটির সদস্যগণ। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটির সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান এবং সহকারি জেনারেল সেক্রেটারি আরশাদ মঞ্জুর চৌধুরী। এছাড়াও অনুষ্ঠানের প্রথম অংশে ৫০জন ছাত্রছাত্রীদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি বাবদ নগদ টাকা ও সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

