ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাবেক প্রধান ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাকে সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য করে তার বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর ২০২৬) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তার বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, হারুন-অর-রশীদ ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত হন। তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইল ঠিকানায় একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, হারুনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ০০৫/২০২৫ নম্বর বিভাগীয় মামলা করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি। এমনকি জবাব দেওয়ার জন্য সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ২২ জুন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে ৬ আগস্ট দাখিল করা প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(গ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০ আগস্ট তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু এবারও তিনি কোনো জবাব দেননি।
বিভাগীয় তদন্তের পর হারুন-অর-রশীদের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত চাওয়া হয়। কমিশন গত ১ অক্টোবর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের পক্ষে মতামত দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলার নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষ অভিযোগ প্রমাণিত বলে সিদ্ধান্ত নেয়। গত ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন। এতে বরখাস্তের আদেশ অবিলম্বে কার্যকরের কথা বলা হয়েছে।
উল্লখ্য, মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ একসময় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে তিনি ডিবিপ্রধানের দায়িত্ব পান। এর আগে ২০২১ সালে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডিবিপ্রধান থাকাকালে বিভিন্ন আলোচিত ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে নিপীড়নের অভিযোগ এবং তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার ছবি প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে ডিবিপ্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ৬ আগস্ট থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন বলে পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট হারুন-অর-রশীদসহ ১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভাগীয় তদন্ত, কারণ দর্শানোর নোটিশ, সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মধ্য দিয়ে হারুনের বিরুদ্ধে এবার চূড়ান্ত শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

