সাঈদ চৌধুরী :
শেখ হাসিনাকে সাধারণ কোনো যাত্রী বা বাণিজ্যিক ভ্রমণকারী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনা একজন পলাতক খুনি ও সন্ত্রাসী। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে নতুন করে পাসপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করতে হবে।
ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/1161502443189910
একই সঙ্গে চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোর বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শেখ হাসিনার পাসপোর্ট দেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে হাস্যকর। শেখ হাসিনা কোনো সাধারণ পর্যটক নন যে পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসে রংপুরে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাবেন।
“শেখ হাসিনা হচ্ছেন পলাতক খুনি, পলাতক সন্ত্রাসী। এখানে কি শ্বশুরবাড়ি রংপুরে বেড়াতে আসবেন যে তাঁকে পাসপোর্ট দেব? অপরাধীকে ধরতে পাসপোর্ট লাগে না, এটি হ্যান্ডওভার বা হস্তান্তরের বিষয়।”
প্রতিমন্ত্রীর দাবি, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া ও বিচারিক পরোয়ানা রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট দেওয়ার পরিবর্তে আইনি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াই প্রাসঙ্গিক।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সক্রিয় প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তি অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের হস্তান্তরের সুযোগ দেয়। তাঁকে একজন সাধারণ বাণিজ্যিক ভ্রমণকারী হিসেবে বিবেচনা করে পাসপোর্ট দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমরা তাঁর হস্তান্তর চাই।”
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এমন একজন ব্যক্তিকে স্বাভাবিক ভ্রমণকারীর মতো বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে প্রত্যর্পণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হতে হবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশা
শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নয়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন একটি নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে সরকার কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরের পর চীন সফর করেছেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’। পারস্পরিক সহযোগিতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ও চীন সামনে এগিয়ে যেতে চায়।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের ঢাকা সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, চীনের এই মন্ত্রী মন্ত্রিসভার মর্যাদাসম্পন্ন। তাঁর সফরে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সমঝোতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কীভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
পাশাপাশি সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যাশা, আগামী দিনে বেইজিং থেকে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকে বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের সফর আরও বাড়বে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোর নিয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান
বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়েও ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তাঁর মতে, করিডোরটি চালু হলে পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সবাই উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির।
সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে- শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি, চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার পরিকল্পনা এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা।
*সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

