কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা বাজারে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের ছেলে মো. শাহরিয়ার জামান। বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) রাত ৮টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আহত শাহরিয়ারকে প্রথমে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়ী করে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দিয়েছেন তাঁর বাবা সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, বুধবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মো. শাহরিয়ার জামান গচিহাটা বাজার এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিতভাবে তাঁর ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এতে তিনি রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সৈয়দ শাহরিয়ার অনিক জানান, শাহরিয়ার জামানের বুকের কাছাকাছি স্থানে বেশ গভীর ক্ষত হয়েছে। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ছেলের ওপর হামলার ঘটনার পর বুধবার রাত ১১টার দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান।
ফেসবুক লাইভে তিনি অভিযোগ করেন, সহশ্রাম-ধূলদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সম্মিলিতভাবে তাঁর ছেলের ওপর হামলা করেছেন। তাঁর দাবি, সহশ্রাম-ধূলদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির এক সহসভাপতির নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আখতারুজ্জামান বলেন, অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনাচিত্তে জানাচ্ছি, এখন আমাদের রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর ছেলে গ্রামের বাড়িতে ব্যবসা করেন এবং সেখানে তাঁর একটি খামার রয়েছে। সেই ছেলের ওপরই স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হামলা করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও জানান, হামলার বিষয়টি কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিএনপির সভাপতিকে অবহিত করেছেন। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের নামও পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় অনেকেই অভিযুক্তদের পরিচয় জানেন এবং এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন সাবেক এই সংসদ সদস্য।
ফেসবুক লাইভে আখতারুজ্জামান আরও অভিযোগ করেন, হামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কয়েকজন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত এবং গচিহাটা রেলস্টেশন এলাকায়ও তাঁরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালান বলে অভিযোগ করেন।
আখতারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি এসব কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। বর্তমানে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা মনে করে কেউ কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে এ ঘটনায় বিএনপিকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, এটি বিএনপির দলীয় বিষয় নয়। বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। বিএনপি যেন তাঁদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয় এবং কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা না দেয়, সে আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আইনের মাধ্যমে ঘটনার বিচার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির সভাপতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে জানান তিনি।
ফেসবুক লাইভের শেষ দিকে আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আজকে জামায়াতের ওপর বিএনপির লোকেরা আক্রমণ করা শুরু করেছে। এখন আমাদের রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে।’ এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে বিষয়টি দেখবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কটিয়াদী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, তিনি ঘটনার বিষয়ে অবগত হয়েছেন। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য থানার ওসিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সার্বক্ষণিক ঘটনার খোঁজখবর রাখছেন।
প্রকাশ্য বাজারে এমন হামলার ঘটনায় গচিহাটা বাজারসহ আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হামলার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

