ধর্মীয় সফর ঘিরে নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার প্রতিবাদে বন্ধ আইফেল টাওয়ার

ইউরোপ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

ড্যান সেইলস এবং মিমি সোয়াবি বিবিসি গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স রিপোর্টার

হিন্দু ধর্মীয় দর্শনার্থীদের একটি দলের ভ্রমণের সময় নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু হওয়ায়, সোমবার থেকে আইফেল টাওয়ার বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার কর্মী ও কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্সের রাজধানীতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি গত শনিবার পরিদর্শন করেন- বোচাসানওয়াসি আকসার পুরুষোত্তম সোয়ামিনারায়ণ সংস্থা বা বিএপিএস গ্রুপের সাথে যুক্ত প্রায় ১০০ জনের একটি প্রতিনিধি দল।

আইফেল টাওয়ার কর্মী ইউনিয়নের প্রতিনিধি ডায়ান ডেভয়েন জানান, এই দর্শনার্থীরা স্মারকটিতে পৌঁছানোর পর সেখানে কর্মরত নারীদের স্থান পরিবর্তন করতে বলা হয়েছিল।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, “এই প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনের সময় নারী কর্মীদের তাদের কর্মস্থল ছেড়ে চলে যেতে বলা হয় এবং সেখানে পুরুষদের রাখা হয়।”

ডেভয়েন আরও জানান, এই ঘটনার পর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

ডেভয়েন বলেন, “কর্মচারী ও বিশেষ করে নারীদের কাছে বিষয়টি একেবারেই মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। তারা সবাই অপমানিত বোধ করেছেন যে তাদের সাথে কেন এমন আচরণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সপ্তাহের শেষ দিকে এই ঘটনা ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তাই আজ সকালে কর্মচারীরা বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন- প্রথমত, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করতে এবং দ্বিতীয়ত, কোম্পানিতে যেন আর কখনো নারীদের সাথে এমন আচরণ করা না হয় তা নিশ্চিত করতে।”

বার্তা সংস্থার এএফপি এর তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসের এই স্মৃতিসৌধ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সোসিয়েতে দ’এক্সপ্লোয়াসিওঁ দে লা তুর আইফেল বা সেতে নিশ্চিত করেছে যে, প্রতিনিধি দলটি ‘নারীদের সঙ্গে মেলামেশা’ সীমিত রেখে সফরটি আয়োজন করার জন্য অনুরোধ করেছিল।

তারা আরও যোগ করে যে, এগুলো “সেতে-এর মূল্যবোধ এবং নারী ও পুরুষের সমতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।” সেতের প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়েল ওয়েল বলেন, “এটি স্পষ্টভাবে কোনো গ্রহণযোগ্য অনুশীলন নয়।”

“আমি প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার প্রতি আইফেল টাওয়ারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি,” বলেন তিনি।

সিজিটি ইউনিয়নের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। রোববার প্যারিসের একটি উপশহরে, ফ্রান্সে নিজেদের প্রথম বড় উপাসনালয়ের উদ্বোধন করেছে বিএপিএস।

আইফেল টাওয়ার সাময়িক বন্ধ রাখার বিষয়টি নোটিশ আকারে লিখে রেখেছে কর্তৃপক্ষ

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে প্যারিসের বিএপিএস মন্দির জানিয়েছে যে, “অন্যদের ভ্রমণে ব্যাঘাত বা অসুবিধা এড়ানো নিশ্চিত করতে, আইফেল টাওয়ার টিমের সহযোগিতায় স্বাভাবিক খোলার সময়ের শুরুতে” তাদের এই ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তারা “এর ফলে সৃষ্ট যেকোনো কষ্ট বা অসুবিধার জন্য” ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যোগ করে, “আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সেবার সর্বজনীন মূল্যবোধে বিশ্বাসী।”

তাদের ওয়েবসাইটে বিএপিএস নিজেদের একটি “আধ্যাত্মিক, স্বেচ্ছাসেবক-চালিত সংঘ” হিসেবে বর্ণনা করেছে যা হিন্দু মূল্যবোধের মাধ্যমে সমাজকে উন্নত করার জন্য নিবেদিত। লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সিডনিসহ বিশ্বের বড় বড় শহরে তাদের মন্দির রয়েছে।

এদিকে, এই ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “আইফেল টাওয়ারের কর্মচারীদের প্রকাশিত ক্ষোভ আমি আমলে নিচ্ছি এবং আমি তাদের বলতে চাই যে তাদের এই অসন্তোষ সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।”

“নারী ও পুরুষের সমতা আমাদের ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধগুলোর পাদদেশে বা এই শহরের কোথাও কখনোই থেমে থাকবে না। এটি সর্বত্র এবং সবার জন্য প্রযোজ্য হতে হবে,” বলেন তিনি।

ফরাসি উগ্র-ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন বলেন, “ফ্রান্সে আমরা এটি কখনো মানবো না যে, নারীর উপস্থিতি ‘সীমাবদ্ধ’ করা হোক।”

সাবেক মধ্য-ডানপন্থি ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আটাল, যিনি আগামী বছর রাষ্ট্রপতি পদে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বলেন, “ফ্রান্সে কোনো সংস্কৃতি, কোনো বিশ্বাস, কোনো উপাসনা, কিছুই বা কেউ নারীদের তাদের অবস্থান নির্দেশ করতে আসতে পারে না।”

ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের সভাপতি ইয়েল ব্রাউন-পিভেট বলেছেন, “আমি বিদেশি দর্শনার্থীদের দাবি মেটাতে নারীদের সরে দাঁড়াতে বাধ্য করার বিষয়টি কিছুতেই মেনে নেব না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *