উত্থানের পথে বাংলাদেশ, মূল্যবোধ ফেরানো ও জাতি গড়ার স্বপ্ন || ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী

প্রবন্ধ-কলাম সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

চার.

ব্রিটেনকেন্দ্রিক আমার যত কার্যμম ছিল, তন্মধ্যে অন্যতম ছিল লন্ডন ২০১২ অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক গেমসের (London Olympic and Paralympic Games – LOCOG) বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত থেকে কাজ করা। এই গেমস আসলে কেবল খেলা ছিল না; বরং এটি ছিল বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানানোর একটি অনুষ্ঠান। একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ ঐক্যের মধ্য দিয়ে কী অর্জন করতে পারে, তার একটি জমকালো প্রদর্শনী।

এই ঐতিহাসিক প্রজেক্টের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি আরও একবার টের পাই সমন্বয়ের গুরুত্ব আসলে কতখানি। যেকোনো কিছুতে সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা কতখানি, তা আমি এই প্রজেক্টের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আরও একবার বুঝতে পারি।

সেবারের অলিম্পিকে রাজনৈতিক ঐক্যের যেই অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, তা ব্রিটেন আজও মনে রেখেছে। বিশেষ করে ঐক্যবদ্ধ কর্মের মধ্য দিয়ে অর্জিত ২০১২ সালের সামারের সেই সফলতা ব্রিটেনের স্মৃতিতে আজীবন অম্লান হয়ে থাকবে বলে আশা করি।

LOCOG-এর একজন বোর্ড মেম্বার হিসেবে আমি বুঝতে পারি, একটি বৈশ্বিক স্পোর্টস ইভেন্ট পরিচালনায় কী কী জটিলতা পোহাতে হয়। আমার জীবনের এই অভিজ্ঞতাটা ছিল আসলেই মূল্যবান। এতে করে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত হয়। আমি বুঝতে পারি, বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মূল্য কী।

একটি জাতি যখন পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তখন সম্ভাবনার যেই অজুত দুয়ার খুলে যায়, তা আমি সেবার হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বর্তমানের বিভক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে যতই দেখি, ততই আফসোস হয়। আমি দেখি, দেশের রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিভক্তি দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। এখানে পারস্পরিক সংলাপের কোনো স্থান নেই; আছে শুধু সহিংসতার ভাষা। ক্ষমতার পালাবদল বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডাগুলোকে ফিকে করে দিচ্ছে।

তবুও আমি বিশ্বাস করি, জাতি যদি এখনও ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে এখানে ইতিবাচক সমূহ পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব- এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অন্তত ২০১২ সালের সেই বৈশ্বিক স্পোর্টস আয়োজন থেকে প্রাপ্ত আমার অভিজ্ঞতা এই কথাই বলে। ২০১২ সালের সামারে আয়োজিত লন্ডনের সেই অলিম্পিক আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে- একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ অথচ ঐক্যবদ্ধ সমাজ মূলত কী অর্জন করতে পারে।

এই খেলাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত দর্শনার্থী আসতে শুরু করে লন্ডনে। আর লন্ডনও তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। এটি আক্ষরিক ও রূপক উভয়ভাবে লন্ডনের খ্যাতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। খেলাটা যদিও রমজানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তবুও এখানে আগত সকল দর্শনার্থী যেন যার যার মতো করে খেলাটা উপভোগ করতে পারে, তার যাবতীয় ইন্তেজাম আমরা করেছিলাম।

আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল সিটিজেনস ইউকে, লন্ডন মেয়র’স অফিস, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল অব মস্কস। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হই। রমজানে মুসলমানদের যা যা প্রয়োজন হতে পারে, তার সবই আমরা সরবরাহ করতে চেষ্টা করি। হালাল খাবার থেকে শুরু করে সালাত আদায়ের সুন্দর সুযোগ তৈরি করা পর্যন্ত যাবতীয় সমস্ত ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। সব মিলিয়ে লন্ডনে আগত সকল দর্শনার্থীর জন্য সেবারের অলিম্পিকটা ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

LOCOG-তার প্রতিষ্ঠাকাল (২০০৫ সাল) থেকেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংগঠন হিসেবে কাজ করে। তারা প্রতিটি সিদ্ধান্তে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি (ডাইভার্সিটি ও ইনক্লুজন-ডিএন্ডআই) এই দুটিকে বিবেচনায় রাখত। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাউথ আফ্রিকার আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু লন্ডন ভ্রমণ করেন। তিনি লন্ডনে অবস্থিত অলিম্পিক পার্ক ঘুরে ঘুরে দেখেন। অতঃপর খুব আশাবাদ ব্যক্ত করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি LOCOG-কে বলেন, তারা যেন আসন্ন অলিম্পিকের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারটা মাথায় রাখে। এই
বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের জায়গায় রেখেই যেন তারা নেতৃত্ব গ্রহণ করে। তার এই চমৎকার বক্তৃতাকে আমরা হৃদয়ভরে সাধুবাদ জানাই।

আশপাশের প্রতিটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে অলিম্পিকের চুক্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। যাতে করে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও এর ফলভোগী হতে পারে। তবে যেসব কোম্পানি তুলনামূলক বড়ো ছিল, তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছিল অতিরিক্ত দায়িত্ব। এককথায়, অলিম্পিকের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি (ডাইভার্সিটি ও ইনক্লুজন-ডিএন্ডআই) নিশ্চিত করার জন্য সকলকে দায়িত্বের আওতায় নিয়ে আসা হয়। চেষ্টা যেহেতু অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল, তাই এর রেজাল্টও ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বসবাসরত বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী অসংখ্য সুবিধা লাভ করে।

অবশেষে যখন খেলা শুরু হলো, গোটা দেশ এই খেলাকে কেন্দ্র করে সফলতায় ভেসে গেল। সবাই খেলার আয়োজক ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো। সবকিছু মিলিয়ে খেলাটা হয়ে উঠেছিল একটি উৎসাহমূলক, চমৎকার ও সৌহার্দমূলক ইভেন্টে।

খেলার এই সর্বাত্মক সফলতার পেছনে ছিল সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ ছাড়া এটা মোটেও সম্ভব ছিল না। এ কথা স্বয়ং LOCOG-এর চেয়ারম্যান লর্ড কু নিজে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই খেলায় আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা ছিল সুরুচিপূর্ণ। তারা মন থেকে সবকিছু করেছে। তাই এই খেলার সাফল্যের সিংহভাগই তাদের প্রাপ্য।’

এই খেলার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ মুসলিম কমিউনিটিতেও পরিবর্তন এসেছিল। একধরনের বিজয় এসে ধরা দিয়েছিল তাদের কাছে। কেননা, গত ৭/৭ বম্বিংয়ের ঘটনার পর থেকে তাদের একরকম কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। তারা এই খেলার আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনেকটাই হাঁপ ছেড়ে উন্মুক্ত পরিসরে উঠে আসতে পেরেছিল। তারাও যে ব্রিটেনের সফলতার একেকজন স্টেকহোল্ডার, এই খেলার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের স্থায়ী বাসিন্দারা তা বুঝতে পেরেছিল।

উদাহরণস্বরূপ মো ফারাহ’র জয়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তার জয়ের মধ্য দিয়ে সকলের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি কোমল মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। খেলায় তার জয়লাভের পর মুহূর্তে তিনি মাঠের মধ্যেই সিজদায় লুটিয়ে
পড়েন। এতে করে একদিকে যেমন ইসলামি ঐতিহ্য ঝকমকিয়ে ওঠে, পাশাপাশি সকলের কাছে ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও স্পষ্ট হয়ে যায়।

এর মধ্য দিয়ে মো কেবল তার ব্যক্তিগত বিজয় সেলিব্রেট করেনি; বরং তার সাথে সাথে সেলিব্রেশন হয়েছে ব্রিটেনের মাল্টিকালচারাল সমাজব্যবস্থার। এ প্রসঙ্গে কমেডিয়ান ইডি ইজার্ড মন্তব্য করেছিলেন, ‘মো’র বিজয় ছিল ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উজ্জ্বল প্রমাণ।’

এ ছাড়া খেলার সবকিছুই যথানিয়মে হয়েছিল। কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। সবকিছু পারফেক্ট ছিল। এমনকি পরিবেশ ও আবহাওয়াও আমাদের অনুকুলে ছিল। যানবাহন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। দেশের সর্বত্রই নিরাপত্তাব্যবস্থা
জোরদার করা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তাকে ইস্যু করে দেশের কোথাও কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

স্টার্টফোর্ডসহ দেশের আরও যেসব জায়গায় অলিম্পিক পার্ক বসানো হয়েছিল, সেগুলো ঠিকঠাকমতো রান করেছিল। তাদের প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে একত্রিত হতে পেরেছিল কোনো রকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই। এককথায়, সবাই যার যার নিজস্ব ভূমিকাটুকু সর্বোচ্চটা দিয়ে পালন করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল।

আমিও আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলাটাকে এনজয় করেছিলাম। খেলার উদ্বোধনী ও সমাপনী উভয় ইভেন্টে আমি উপস্থিত থেকেছিলাম তাদের নিয়ে। রাতের শেষ ভাগের রাজপথ ছিল লোকে লোকারণ্য। সবাই নির্ভয়ে চলাচল করছিল। নিজেদের ইচ্ছামতো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে পারছিল। যাতায়াতকে ঘিরে কারও মনে কোনো ধরনের টেনশন ছিল না।

সব মিলিয়ে লন্ডন যেন সেই সময় তার সবচেয়ে ভালো মূর্তি ধারণ করেছিল। মানুষ এমন একটা শহরের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিল, যেটা ছিল যুগপৎ ঐক্যবদ্ধ,
বৈচিত্র্যময় ও সম্ভাবনায় ভরা। আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, এই খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যেন ঐক্যের এই আবহটা অক্ষুণ্ণ থাকে। এটা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কিন্তু না; প্রকৃত চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০১৩ সালের পর থেকে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে পালটে যেতে শুরু করে। খেলাধুলা আমার মনে যতই আনন্দ আর ঐক্যানুভূতি তৈরি করুক না কেন, আমার মন কিন্তু সর্বদা পড়ে থাকত আমার মাতৃভূমিতে। বাংলাদেশকে নিয়ে আমার ভাবনা কখনো ফুরাত না। ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে যেই স্ট্রাগল আমি দেখেছি, তার মধ্য দিয়ে যেন গোটা বাংলাদেশের স্ট্রাগলটাই বারবার আমার মানসপটে জীবন্ত হয়ে উঠত।

ব্রিটেনের বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠী প্রায়শই পরিচয় সংকটে ভুগত। বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিলেই তার জন্য সমস্ত সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে আসত। সভ্য নাগরিক জীবন ও সমাজব্যবস্থা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। আমি ব্রিটেনে বসে এসব দেখতাম, আর ভাবতাম- বাংলাদেশের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এখন আর জাতীয় প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন সভ্যতার দায়ভারে পরিণত হয়েছে।

এক্ষেত্রে প্রতিটি বাংলাদেশিরই কিছু না কিছু করার আছে। এজন্য প্রথমেই সকলকে আমিত্ব বিসর্জন দিতে হবে। সবার আগে নিজ- এই মানসিকতা বর্জন করার কোনো বিকল্প নেই। তাদের এর ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে হবে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করতে হবে। নিজেদের উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে। (ধারাবাহিক চলবে)

ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *