কাজি নজরুল দ্রোহের কবি। শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। সমানভাবে সমাদৃত তার জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গে। ভারত ও বাংলাদেশে রয়েছে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপেও নজরুল চর্চা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে নিয়ে গবেষনা হচ্ছে।
নজরুল কোনো নির্দিষ্ট কালে বা অঞ্চলে সীমিত নন। বিশ্বময় বিদ্রোহী কন্ঠ হিসেবে আলোচিত ও সমাদৃত। মানবতা ও সাম্যের কবি হিসেবে অনন্তকাল ধরে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।
এই মহান পুরুষের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সপরিবারে থাকার জন্য ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার পুরনো ২৮নং রোডের ৩৩০/বি বাড়িটি বরাদ্দ করা হয়। বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘কবিভবন’।
১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারি ভাবে কাজি নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। পরের মাসেই তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ স্বর্ণপদক ‘একুশে পদক’ সম্মানে ভূষিত হন।
৭৭ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি নজরুল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ সংলগ্ন কবরে তাকে সমাহিত করা হয়। ইন্তেকালের পরের বছর ১৯৭৭ সালে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির সম্মান প্রদান করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী কবি নজরুল সম্পর্কে যে গবেষণা (RESEARCH) চলছে তার অনেক কিছু জমা হচ্ছে বৃটিশ মিউজিয়ামে (BRITISH MUSEUM) । শিল্পকর্ম, প্রত্নসামগ্রী ও কারুপণ্যের সংগ্রহ ও প্রদর্শনীর বিচারে বিশ্বের প্রধানতম সংগ্রহশালা হচ্ছে বৃটিশ মিউজিয়াম। কবি নজরুলকে বাঙালি সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে মিউজিয়ামের নিজস্ব ওয়েবসাইটে।
লন্ডনে কবি নজরুল সেন্টার আছে। (KOBI NAZRUL CENTRE, 30 HANBURY STREET, LONDON E1 6QR)। এটি বিলেতে বেশ সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনস্থল ব্রিকলেন স্পিটালফিল্ডে অবস্থিত। ১৯৮২ সাল থেকে এখানে নজরুল চর্চার পাশাপাশি নিয়মিত বাংলা শিল্পকলার প্রচার, পারফর্মিং ও প্রদর্শনী হয়।
আমাদের জাতীয় কবিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য লন্ডনে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নজরুল স্কুল (KOBI NAZRUL PRIMARY SCHOOL, SETTLES STREET, LONDON E1 1JP) জনমনে বিশেষ করে শিশুদের মাঝে কবি নজরুল সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায়।
২০০২ সাল থেকে সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্ট কবি নজরুলকে নিয়ে লন্ডনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে দেশি-বিদেশী সাহিত্যিক-সাংবাদিক সহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে অংশ গ্রহন করেন। অনুভবে নজরুল শীরোনামে অনুষ্ঠানে বক্তারা কবির লেখা থেকে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
কবিকে ব্যাপক ভাবে বিশ্বময় পৌঁছে দেয়ার ব্রত নিয়ে কাজ করছে সংলাপ ফ্রন্ট। https://www.facebook.com/sanglap.front
এই লেখা যখন প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে, ঠিক সে সময়ে (১৪ নভেম্বর ২০২১, রবিবার) পূর্ব লন্ডনের রিচ মিক্স সেন্টারে টিএস এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ড এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী মঞ্চস্থ হয়। https://laninfaeco.com/en/2021/11/18/saudhas-theatrical-production-the-rebel-and-the-waste-land-won-the-audience-of-east-london/.
বিশ শতকের দুটি কালজয়ী সাহিত্যকর্মের উপর ভিত্তি করে দ্য রেবেল এন্ড দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড নামক অনন্য নাট্য প্রযোজনা হাউসফুল দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল কর্তৃক FREEDOM AND INDEPENDENCE থিয়েটার উৎসবের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের একটি শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সাহিত্য ও সঙ্গীত প্ল্যাটফর্ম, সওধা সোসাইটি অফ পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিক কর্তৃক আয়োজিত ও মঞ্চস্থ হয়।
এশিয়া ও ইউরোপের শ্রোতাদের মিশ্রণে একাডেমিক এবং সাধারণ শিল্প-প্রেমীরা অংশ গ্রহন করেন। দর্শকদের মতে, এটা অবশ্যই স্মরণীয় এবং সমানভাবে শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা। কেম্যান আইল্যান্ডের প্রাক্তন গভর্নর শীর্ষ বৃটিশ কূটনীতিক আনোয়ার চৌধুরী বলেন, এই প্রযোজনা দুটি ভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে শান্তির দুটি বিস্ময়কর ব্যাখ্যা, যা আমার উপলব্ধিতে প্রশান্তি এনে দিয়েছে।
প্রযোজনা পরিচালক ও সওধার প্রতিষ্ঠাতা কবি আহমদ কায়সার বলেন, আমরা যেভাবে দুটি প্রধান কাজকে কাঠামোগত এবং দার্শনিকভাবে মিশ্রিত করেছি, তা দর্শকরা পছন্দ করেছেন। এটি এখন বাংলাদেশ, ভারত এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
লন্ডনে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন দ্য টেগোরিয়ান্স (THE TAGOREANS) কবি নজরুলকে নিয়ে চমৎকার তথ্যচিত্র করেছে ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। তারও আগে ১৯৯৯ সালে অত্যন্ত নান্দনিকতার সাথে নজরুলের জন্মশতবার্ষিকী পালন করেছে। তারা মূলত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন দর্শনে বিশ্বাসী এবং সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সৃজনশীলতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কাজ করে। ১৯৬৫ সালে প্রয়াত তপন গুপ্ত এই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। http://www.tagoreans.org/gallery.aspx
খ্যাতিমান লেখক শ্রীময়ী ভট্টাচার্য (SREEMOYEE BHATTACHARYA) কবিকে নিয়ে দুই ঘণ্টার একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়েছেন ২০১৪ সালে। ২০১৭ সালে এটির প্রথম প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই বছর তা কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
শ্রীময়ী ভট্টাচার্য বলেন, নজরুলের প্রতিটি দিককে স্পর্শ করবে এমন কোনও তথ্যচিত্র ছিল না। ১৯৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেলুলয়েড ‘নজরুল’ নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছিল, যা আর পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে কাজ করার পর নজরুলের মতো বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিত্বকে আরও ভালোভাবে জানার গুরুত্ব আমি উপলব্ধি করেছি।
তিনি বলেন, কবিতা, সঙ্গীত বা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অঙ্গনে নজরুলের অবদান অকল্পনীয়। কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে থাকি। আমার ডকুমেন্টারির মাধ্যমে আমি সঙ্গীতের দৃশ্যপটে তার অবদানকেও স্পর্শ করেছি। তিনি গান লিখতেন। থিয়েটার, চলচ্চিত্র এমনকি প্রশিক্ষিত শিল্পীদের জন্য সুর তৈরি করতেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ‘হারমনি’ অনুষ্ঠানের জন্য তিনি পুরনো রাগগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। https://www.getbengal.com/details/is-kazi-nazrul-islam-more-celebrated-in-bangladesh-than-kolkata
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ গুরুত্বের সাথে নজরুল চর্চা হয়। বাংলার বিদ্রোহী কবি : নজরুল ইসলাম (THE REBEL POET OF BENGAL: NAZRUL ISLAM) শীরোনামে অনেক তথ্যবহুল লেখা তাদের ওয়েবসাইটে রয়েছে।
স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS) এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের অধ্যয়নের জন্য বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে MULOSIGE – Multilingual Locals and Significant Geographies নামে ইউরোপীয় রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নকৃত গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যাপক ফ্রান্সেসকা ওরসিনি। MULOSIGE প্রকল্পে বিশ্ব সাহিত্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য অসংখ্য লেখা অন্বেষণ করে বহুভাষিক সমাজের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
কবি নজরুলের লেখা এতে বিশেষ ভাবে স্থান পেয়েছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশ্বসাহিত্যেরে উপাদান বিবেচনায় সুলেখক মরিয়ম ইরাজ নজরুল সম্পর্কে উর্দু সাহিত্যের অনেক মূল্যবান লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। http://mulosige.soas.ac.uk/the-rebel-poet-of-bengal-nazrul-islam/
বিশ্বের বিভিন্ন কবির কবিতা নিয়ে কাজ করে পয়েম হান্টার (POEM HUNTER)। কবি নজরুলের অনেক কবিতা তারা ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছে। POEMS FROM DIFFERENT POETS ALL AROUND THE WORLD. THOUSANDS OF POEMS, QUOTES AND POETS. HTTPS://WWW.POEMHUNTER.COM/KAZI-NAZRUL-ISLAM/BIOGRAPHY/#GOOGLE_VIGNETTE
সুইডেনে কবি নজরুলকে নিয়ে অনুষ্ঠান ও লেখালেখি চোখে পড়ার মত। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিচারণ (REMINISCENCES: BANGLADESH NATIONAL POET KAZI NAZRUL ISLAM) তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য। এশিয়ান ট্রিবিউন থেকে নিয়ে এইচটি ডিজিটাল কন্টেন্ট সার্ভিসেস এটা প্রকাশ করেছে। https://www.thefreelibrary.com/Reminiscences%3A+Bangladesh+National+Poet+Kazi+Nazrul+Islam-a0501878986
ইংরেজি সাহিত্যের কবি জর্জ গর্ডন লর্ড বায়রন ও আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে BYRON AND NAZRUL AS POET শীরোনামে ১৭ জুন ২০২১ তারিখে দৈনিক সান পত্রিকায় লেখাটি বেশ পাঠক প্রিয়তা লাভ করেছে। https://www.daily-sun.com/printversion/details/559092/Byron-and-Nazrul-as-Poet এই লেখা ইউরোপের কয়েকটি অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বৃটানিয়া ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি অধ্যাপক এম মতিউর রহমান লেখাটি সম্পর্কে বলেন, আমি যে শিরোনামে লিখেছি, তা দুই কবির মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণের একটি অংশ। সাধারণভাবে বলতে গেলে আমরা জানি, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি এবং জর্জ গর্ডন লর্ড বায়রন ইংরেজি সাহিত্যের কবি। নিখুঁত বিশ্লেষণের জন্য কবি হিসেবে তাদের মধ্যে মিল এবং অমিলগুলি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।
ইউরোপীয়ান আমেরিকান জার্ণালে (EUROPEAN – AMERICAN JOURNALS) কাজী নজরুল ইসলাম এবং তার বিদ্রোহী কবিতার উপর একটি গবেষণা রয়েছে। THE COMPULSIVE VOICE OF DECOLONIZATION: A STUDY ON KAZI NAZRUL ISLAM AND HIS REBELLIOUS POEMS শীরোনামে লেখাটি পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। https://www.eajournals.org/journals/international-journal-of-english-language-and-linguistics-research-ijellr/vol-8-issue-2-march-2020/the-compulsive-voice-of-decolonization-a-study-on-kazi-nazrul-islam-and-his-rebellious-poems/
লেখক তানজিন সুলতানার মতে, অন্য দেশ দ্বারা দখল ও নিয়ন্ত্রিত একটি দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা ও নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তোলা সহজ নয়। আফ্রিকা এবং এশিয়ার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিকে মুক্ত করার সংকল্প বিংশ শতাব্দীতে একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম বেশ প্রাসঙ্গিক। তার কবিতার সবচেয়ে অসামান্য দিক হল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তিনি জানেন ঔপনিবেশিকদের শোষণ বন্ধ করতে হলে সাম্রাজ্যবাদের শক্তিকে উৎখাত করতে হবে। নিপীড়িত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা উপনিবেশ থেকে নিজের ভূখণ্ড, সংস্কৃতি এবং মানুষের মন-স্বাধীন করতে চেয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের DISABILITY ARTS ONLINE নজরুল সম্পর্কে লেখা সমূহ গুরুত্বের সাথে প্রচার করে। https://disabilityartsonline.org.uk/kazi-nazrul-islam-debjani-chatterjee এই লিংকে সংযুক্ত লেখায় দেবযানী চ্যাটার্জি একজন কবি হিসেবে তার জীবন এবং কর্মজীবনে নজরুলের কবিতার প্রভাবের বিবরণ দিয়েছেন, যা দুটি মহাদেশের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। তার মতে, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন বাঙালি বহুভাষী লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ এবং বিপ্লবী। নজরুল নামে জনপ্রিয়, তার কবিতা ও সঙ্গীত ফ্যাসিবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ইন্দো-ইসলামিক নবজাগরণ এবং তীব্র আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ। নজরুল হলেন একজন মহান সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, গায়ক, অভিনেতা, সৈনিক এবং বিপ্লবী। তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গীতিকার-সুরকার। তার সবচেয়ে ফলপ্রসূ কিছু বছর অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ করেছেন। তিনি নারী, যুবক, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র এবং নির্যাতিত সকলের জন্য হিন্দু-মুসলিম সংহতি এবং সমতাকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন।
বৃটেনের জাতীয় কবি ডব্লিউ ওয়ার্ডসওয়ার্থ, পার্সি বি শেলি এবং কাজী নজরুল ইসলামের রোমান্টিক কবিতায় নৈতিকতা নিয়ে অধ্যাপক মোস্তফা মুনীর (PROFESSOR MUSTOFA MUNIR) চমৎকার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ETHICALITY IN ROMANTIC POETRY- W. WORDSWORTH, PERCY B SHELLEY AND KAZI NAZRUL ISLAM শীরোনামের লেখাটি ২৯ মে ২০২১ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। https://www.observerbd.com/news.php?id=314585 ইউরোপেও পাঠক নন্দিত এই লেখায় মোস্তফা মুনীর বলছেন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি এবং বিংশ শতাব্দীর কবি নজরুল তাদের স্বতন্ত্র প্রতিভা, দক্ষতা এবং রোমান্টিক কবিতা লেখার শৈলীর জন্য অত্যন্ত সম্মানিত। সাহিত্যে তাদের কাব্যিক অবদানের প্রভাব বিশাল ও গভীর। ক্লাসিক রোমান্টিক কবিতাগুলি তৈরি করার সময় নৈতিক মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিকতা এবং ভালবাসার সাথে প্রকৃতির মার্জিত পরিবেশের সাহায্যে তাদের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করেছেন।
কেমব্রিজে প্রকাশিত (CAMBRIDGE UNIVERSITY PRESS) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কবিতায় নজরুলের লেখা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। THE CAMBRIDGE COMPANION TO THE POETRY OF THE FIRST WORLD WAR শীরোনামে বিশ্বখ্যাত লেখকদের কবিতা সংকলিত হয়েছে। https://books.google.co.uk/books?id=aekfAgAAQBAJ&pg=PA273&lpg=PA273&dq=Poet+Nazrul+in+L qtvsiUQ&hl=bn&sa=X&ved=2ahUKEwie_8b4vqX0AhVIVsAKHc5JDfI4WhDoAXoECB8QAw#v=onepage&q=Poet%20Nazrul%20in%20London&f=false
বিশ্বের সেরা নিউজরিল সংরক্ষণাগার বৃটিশ পাথে কবি নজরুলকে দারুণ ভাবে মূল্যায়ন করেছে। কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সহ হাজার হাজার মানুষের অংশ গ্রহনের ডকুমেন্ট প্রকাশ করেছে। BANGLADESH: HUNDREDS OF THOUSANDS ATTEND HERO’S FUNERAL FOR BENGALI “REBEL” POET, NAZRUL ISLAM সংবাদ ও ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, শেষ বিদায়ে কবি লাখো জনতার দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত।
https://www.britishpathe.com/video/VLVA2SPQECSEMAX803JPA5BYDA5Z8-BANGLADESH-HUNDREDS-OF-THOUSANDS-ATTEND-HEROS-FUNERAL-FOR/query/Poet . প্রায় ৮৫ হাজার চলচ্চিত্রের ভান্ডারে সমৃদ্ধ বৃটিশ পাথ। বিনামূল্যে অনলাইনে দেখার জন্য কোম্পানির Facebook, Twitter, Instagram, Pinterest, Tumblr, WordPress এবং LinkedIn-এ তা রয়েছে। ১৮৯৬ থেকে বিশ্বজুড়ে প্রধান ইভেন্ট, বিখ্যাত ব্যক্তি ও সংস্কৃতির ফুটেজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাত্পর্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয়।
ইউরোপ সহ বিশ্বময় অত্যন্ত জনপ্রিয় বিশ্বকোষ নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়া (NEW WORLD ENCYCLOPEDIA) কবি নজরুল সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা দিয়েছে। https://www.newworldencyclopedia.org/entry/Kazi_Nazrul_Islam . বিশ্বদর্শন হিসেবে খ্যাত নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়া (NWE) মানুষের জ্ঞানকে সংগঠিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে সমগ্র বিশ্বের কাছে সহজে তথ্য পৌছতে পারে। এটি ১৭৬৮ সাল থেকে বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি দরকারী টুল এবং শিক্ষা ও গবেষণার জন্য আদর্শ সম্পদ।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে (THE UNIVERSITY OF SYDNEY) নজরুল চর্চার প্রয়াস প্রশংসার দাবি রাখে। সেখানে প্রকাশিত ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক গবেষণা KAZI NAZRUL ISLAM AND W.B. YEATS: THE VOICES OF SPIRITUAL FREEDOM, NATIONALISM AND INTERNATIONALISM একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ। (Authors: Jebun Geeti, International Entrepreneurship and Management Journal 4(1):93-107/, January 2016)। এতে কাজী নজরুল ইসলাম এবং ড. ইয়েটসকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের মানুষের আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জাজ মিউজিক গ্রুপের গ্র্যান্ড ইউনিয়ন অর্কেস্ট্রারে নেতৃস্থানীয় গায়িকা হিসেবে খ্যাত লুসি রহমান কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনার অন্বেষণের প্রয়াসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের অসংখ্য মঞ্চ, টেলিভিশন এবং রেডিও তে অনুষ্ঠান করেন। বিবিসি এবং চ্যানেল ৪ টেলিভিশনে একক অনুষ্ঠানও করেছেন। অনেক প্লেব্যাক গানের গায়িকা হিসেবেও গান গেয়েছেন। তিনি খ্যাতিমান শিল্পী আমিনা খৈয়ামের সাথে ২০১৫ সালের ২৪ এবং ২৫ মার্চ লন্ডনে একটি পারফরম্যান্স উপস্থাপন করেন। লুসি রহমান মনে করেন, তাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে নজরুলের কাজকে সামনে নিয়ে আসা যাতে আজকের বিশ্ব সমাজ তার প্রাসঙ্গিকতা অন্বেষণ করবে।
ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস কবি নজরুলকে নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। CELEBRATING KAZI NAZRUL ISLAM, REBEL POET OF BENGAL BY LIESL SCHWABE https://www.wordswithoutborders.org/dispatches/article/celebrating-kazi-nazrul-islam-rebel-poet-of-bengal-liesl-schwabe এতে বলা হয়েছে নজরুলের তাৎপর্য একাডেমিক ক্ষেত্রের বাইরেও বিস্তৃত। তিনি নিজেকে বিপ্লবী প্রমাণ করে বাংলা সাহিত্য এবং রাজনীতি উভয়ই প্রজ্বলিত করেছেন। ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারস আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অনুবাদ, প্রকাশনা এবং প্রচারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া প্রসারিত করে। তাদের প্রকাশনা এবং প্রোগ্রামগুলি সারা বিশ্বের ইংরেজি পাঠকদের জন্য বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি এবং অন্যান্য ভাষার লেখকদের দ্বারা প্রদত্ত বিশ্ব ঘটনাগুলিতে সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির দরজা খুলে দেয়।
বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী উপাচার্য এবং রাষ্ট্রবজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উইনস্টন ই ল্যাঙ্গলে ইংরেজি ভাষাভাষি মানুষের কাছে নজরুলকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জন্য KAZI NAZRUL ISLAM: THE VOICE OF POETRY AND THE STRUGGLE FOR HUMAN WHOLENESS শিরোনামে একটি বই রচনা করেন। ২০০৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়, দুই বছর পর বেরোয় দ্বিতীয় সংস্করণ। অনেকের মতো ল্যাঙ্গলেও বিশ্বাস করেন যে ইংরেজ কবি শেলীর দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলের লেখনীতে প্রকাশ পেয়েছে।
জাপানের ড. কুয়েকার নিউয়া (Dr. Kueker Neua) নজরুলকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই সাথে নেদারল্যান্ডের লেখক-সাংবাদিক ড. পিটার কাস্টার্স, চিনের ইয়াং উইং মিং প্রমুখের নাম উল্লেখ করতে হয়।
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে THE NAZRUL-BURNS CENTRE, The Centre for East-West Arts and Cultural Excellence, Scotland. এর মূল উদ্দেশ্য হলো বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংস্কৃতি চর্চা এগিয়ে নেয়া এবং বিশ্ব্যবাপী তার প্রচার। এজন্য তারা স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নস ও কাজী নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তাদের লেখনী নিয়ে গবেষণা করছেন। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী শিল্প, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বহুসংস্কৃতির বিকাশ সাধনের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ফরাসী ভাসায় কাজী নজরুল ইসলাম: পোয়েমস চয়েসিস Kazi Nazrul Islam: Poems Choisis (French), কাজী নজরুল ইসলাম: চ্যান্সন্স Kazi Nazrul Islam: Chansons” (French) এবং স্প্যানিশ ভাষায় কাজী নজরুল ইসলাম: পেওমাস এলিগিডোস Kazi Nazrul Islam: Peomas elegidos (Spanish)
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মবিজ্ঞান বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফিলিস কে হারমান নজরুলবিষয়ক গবেষকদের অন্যতম। নজরুলের কবিতার চিত্রিত চারুকল্পে বহুরৈখিক সংস্কৃতির্চচা, মানবতাবাদ, প্রেম, শত বছরের কবিতার বাঁকবদল, দ্রোহ, শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, উত্তরাধুনিকতা, বৈশ্বিক পরিবেশ চিন্তা, কৃষকের ভাতের অধিকার, নারীর অধিকার, তৃণমূল মানুষের মৌলিক অধিকার সর্বোপরি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’র অমোঘ দর্শনের যে উপাদান বিদেশী পণ্ডিতেরা পেয়েছেন তাতে বিদেশী তারা মোহিত এবং আকৃষ্ট হয়েছেন।
২০০২ সালে লসএঞ্জেলসে অনুষ্ঠিত অষ্টম নজরুল কনফারেন্সে প্রফেসর ল্যাংলি নজরুলকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। তিনি তার প্রবন্ধে নজরুলকে সমসাময়িক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নজরুল ফাউণ্ডেশন কানাডা’র উদ্যোগে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম নিয়ে সরব রয়েছেন নজরুল গবেষক কবি নুরুল ইসলাম।
কাজী নজরুল ইসলামকে মনে করা হয় আদর্শিক ধ্রুব তারার মতো। তার ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, নহে কিছু মহীয়ান…’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মানুষ নজরুল বড় হয়ে উঠেছেন।
নজরুল কবিতায় মানুষের মহত্ত্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। মাত্র ২৩ বছরে তিনি সাড়ে চার হাজার গান রচনা করে গেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউট কবির ১৮০০ গানের স্বরলিপি তৈরি করেছে। তিন হাজার ১৬টি গানের একটি সংকলন প্রকাশ করেছে। http://nazrulinstitute.gov.bd/
(ধারাবাহিক গবেষণা – ২০২১ সালে প্রথম প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে আরো তথ্য সংযোজিত হয়েছে)
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

