অপপ্রচার অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ায় || আলী আহমাদ মাবরুর

প্রবন্ধ-কলাম সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আর তাহলো হঠাৎ করে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সমান্তরাল দু’ধরনের বর্ণনা তৈরি করা হচ্ছে। একদিকে রয়েছে মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবটি পরোক্ষভাবে হলেও স্বীকার করে নেয়া হয়। অন্যদিকে রয়েছে জনপরিসরে তৈরি করা একটি ইমপ্রেশন। অনেকাংশে পরিকল্পিত প্রচারণা, এবং পিক এন্ড চুজ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেই এ ইমপ্রেশন গড়ে তোলা হয়। এই দু’য়ের মধ্যে ফারাক রয়েই যাচ্ছে আর সে কারণেই পরিকল্পিতভাবে দু’ধারার বয়াণ তৈরির এ বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

মাঠের বাস্তবতা দিয়ে শুরু করা যাক। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, অনেক প্রার্থীই জামায়াতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে হালকাভাবে নেননি। বরং তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, নির্বাচনটি ছিল সময়সাপেক্ষ, শ্রমসাধ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কোথাও কোথাও এমন স্বীকারোক্তিও এসেছে যে, অতীতের তুলনায় এবার নির্বাচনী লড়াই অনেক বেশি কঠিন ছিল। এর অর্থ দাঁড়ায়-মাঠে একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয় ছিল, যা প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নাম ধরেই যদি বলি, পার্লামেন্টে কুমিল্লার প্রবীণ পার্লামেন্টিরিয়ান মনিরুল হক চৌধুরি তার ভাষণে সরলভাবে এটি স্বীকার করেছেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে নির্বাচনে তার কতটা কষ্ট করতে হয়েছে। মির্জা ফখরুল সাহেবের মতো সিনিয়র রাজনীতিবীদও ঠাকুরগাঁওতে ঘরোয়া একাধিক বৈঠকেও স্বীকার করেছেন যে, এবার তাকে যে পরিমাণ সময় মাঠে দিতে হয়েছে তার জীবনে এমনটা কখনো হয়নি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ না থাকলেও জামায়াতের প্রার্থীই তার নির্বাচনকে অনেক বেশি কঠিন করে দিয়েছিল। একইরকম কথা বলে ফেলেছেন আশরাফি পাপিয়া। তার ভাষায় জামায়াত হলো জঘন্য বিরোধী দল।

মুখ ফসকে বলুন কিংবা সরলভাবেই বলুন, জামায়াতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে তাদের যে শক্ত মনোভাব এর সত্যতা জনপরিসরে খুব কমই প্রতিফলিত হয়। বরং গণপরিসরে একটি ভিন্ন বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলমানÑযেখানে জামায়াতকে অনেকবেশি অযোগ্য, দুর্বল কিংবা অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলত এ কারণেই আমি জামায়াতকে নিয়ে “দুমুখী ক্যাম্পেইনের” কথা বলেছি। অর্থাৎ একদিকে যেমন সীমিত পরিসরে জামায়াতের বিষয়ে কঠোর কোনো বাস্তবতা স্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে বৃহত্তর জনগণের সামনে তৈরি করা হচ্ছে এ দল সম্পর্কে বিপরীত একটি ধারনার জন্ম দেয়া হচ্ছে।

পরিকল্পিত এই নেতিবাচক প্রচারণার প্রধান কৌশল হলো বাছাইকৃত সমালোচনা। রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। জামায়াতও কোনো ভুল করছে না তাও নয়। কিন্তু যখন দেখা যায়, মিডিয়ায়, সিভিল সোসাইটি লেভেলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ্যাক্টিভিজমে কেবলমাত্র জামায়াতেরই ছোট-বড় প্রতিটি ত্রুটি ধারাবাহিকভাবে সামনে আনা হচ্ছে, অথচ বিএনপির প্রায় একই ধরনের ভুলগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন এ সমালোচনা আর স্বাভাবিক সমালোচনা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর ফলে একটি অসম বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে জামায়াতকে সবসময় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং প্রকারান্তরে বিএনপিকে দায়মুক্তি দেয়া হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্ট” অর্থাৎ জনমনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এ ধরনের ইমপ্রেশন তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো, বাস্তব শক্তি বা প্রভাব যাই থাকুক না কেন, জনগণ যেন বিশ্বাস করে যে সংশ্লিষ্ট দলটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের যোগ্য নয়। জামায়াত এখন প্রধান বিরোধী দল। সংসদের ভেতরে ও বাইরে দু’জায়গাতেই তাদের ভূমিকা পালনের অবকাশ রয়েছে। এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো, সরকারের বয়স মাত্র দুমাস। আবার এ সময়ের মধ্যে একটি মাস ছিল পবিত্র রমাদান মাস। অন্যদিকে, সংসদে ঈদের আগে মাত্র দুদিন অধিবেসন বসেছে। অথচ এই দুদিনের বিচারে কোনো দলের ব্যাপারে বা তাদের ভূমিকার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তা বড়ো ধরনের অন্যায় হয়। এ সময়ের বিবেচনায় তাই কোনো দলকে যোগ্য বা অযোগ্য বানিয়ে দেয়াও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। কেননা ঈদের পর যখন সংসদ বসেছে, এরপর থেকে জামায়াতের সংসদ সদস্যদের পারফরমেন্স নিয়ে আহামরি সমালোচনা হয়নি। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, বিএনপির অমুকের বিরুদ্ধে জামায়াতের তরফ থেকে শক্ত জবাব দেয়া হচ্ছে না। তবে সার্বিক বিবেচনায়- বিএনপি এখন যা করছে তাহলো চতুরতা, আগের অবস্থান থেকে সরে এসে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিসের চেষ্টা। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো দল যদি এরকম কিছু করে তা মোকাবেলা করার সুযোগ কতটা থাকে তাও একটি প্রশ্ন।

আবার ফিরে আসা যাক উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা প্রসঙ্গে। মূলত জামায়াতের বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে যার প্রকৃত লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে একটি দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে দেওয়া যায়। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, জামায়াতকে মাঠে শক্তিশালী ও বিরোধী দল হিসেবে দুর্বল এ দুমুখী প্রচারণার মধ্যেওএকটি সূক্ষ্ম সংযোগ রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো ভিন্ন মনে হলেও, বাস্তবে উভয়ের লক্ষ্য একটিই আর তাহলো জামায়াতের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা অন্তত দুর্বল করে ফেলা।

আমার আশংকা যারা এ প্রচারণাগুলো করছেন তাদের চূড়ান্ত টার্গেট হলো, জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে জামায়াতের বিকল্প একটি বিরোধী দল তৈরি করা। এ প্রক্রিয়াটি আওয়ামী লীগের লোকদের নিয়ে সেকুলার কোনো শক্তির মাধ্যমেও হতে পারে আবার এনসিপির মতো দলকে দিয়েও হতে পারে। এনসিপির নেতানেত্রীরা এরই মধ্যে নিজেদের সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে এ কৌশলও নতুন নয়। মূলত যখন কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে সরাসরি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তার জায়গায় নতুন বা তুলনামূলকভাবে দুর্বল একটি শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। এতে করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং মূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক করে ফেলা সহজ হয়। অনেক সময় এই প্রক্রিয়া সরাসরি দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ এর আগেও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে এবং জাতি হিসেবে আমাদের ভোগান্তিও খুব কম নয়।

তবে এ মুহূর্তে এসে যেভাবে জামায়াত বা অন্যান্য দলকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বয়াণ তৈরি করছে সে প্রেক্ষাপটে বলাই যায় যে, বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে কে কী করছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কে কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মতামতপ্রবাহের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বয়াণ বারবার প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটিই ধীরে ধীরে “বাস্তবতা” হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে প্রকৃত মাঠের চিত্র আড়ালে পড়ে যায় এবং জনমত একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত হয়। এখানে প্রশ্ন আসে-এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া, নাকি সুপরিকল্পিত? সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন হলেও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, এতে একটি কৌশলগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। কারণ, একই ধরনের বয়াণ বা ন্যারেটিভ যদি বিভিন্ন উৎস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়, তাহলে তাকে নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডার আরেকটি পরোক্ষ কারণও আছে। মানুষের মনোযোগ একদিকে আবিষ্ট রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। যেমন ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ অনুমোদন বা বাতিল করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় গত ১০ এপ্রিল অর্থাৎ শুক্রবারেও সংসদ বসিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো অধ্যাদেশ সরকার সংসদে উত্থাপন করেছে; যেগুলো পাস হয়ে যাওয়ার কারণে এখন স্থায়ী আইন হিসেবে বিবেচিত হবে। নিছক আইন হলে তেমন সমস্যা ছিল না; কিন্তু এ অধ্যাদেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ কেননা এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আগামীতে কোনদিকে অগ্রসর হবে; কিংবা জুলাই পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের চিত্র কেমন হবে তা নির্ধারিত হয়ে গেছে।

একটি বিষয় এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, যেভাবে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল, গণভোটে যেভাবে তারা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিল; সরকার তার প্রতি সৎ থাকেনি বা থাকবে না। তারা তাদের দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সরকারের অবস্থান সংহত করার অভিপ্রায়কেই জনগণের রায়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিটি খাতকে, প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকার সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুক্রবার সংসদে ২৩টি বিল পাস হয়েছে। বিরোধী দলীয় সদস্যরা যেসব বিলের বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন এর একটিকেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে সরকারি দল কন্ঠভোটেই বিলগুলো পাস করিয়ে নিয়েছে। এর ফলে, সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো পূরণ হয়েছে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনগণ এবং সর্বোপরি দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও জিইয়ে রাখা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিলের কথাও বলা যায়। এটি রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত নয়। এতে সরকারী দলের আপত্তি থাকারও কারণ নেই। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এ জাদুঘরকেও কুক্ষিগত করার সুযোগ বাদ দেয়নি সরকার। শুক্রবার যে জুলাই অভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল পাস করা হয়েছে সেখানে সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে জাদুঘরের প্রধান করার বিধান রাখা হয়েছে এবং পরিষদের সদস্যদের অপসারণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এর আগে সংসদের বিশেষ কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ৯৮টি অধ্যাদেশÑযার মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর অধ্যাদেশও রয়েছেÑকোনো পরিবর্তন ছাড়াই অনুমোদন করা হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরও সংশোধনী আনা হলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এটিকে আস্থাভঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং “প্রতারণা ও স্পষ্ট ধোঁকাবাজি” বলে মন্তব্য করেন।

প্রস্তাবিত প্রধান সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী জাদুঘরের বোর্ডের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, যেখানে আগে বাইরের একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিধান ছিল। দ্বিতীয় সংশোধনীতে ধারা ৮-এর উপধারা ২-এর (ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। তৃতীয় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারপারসন সরকার বরাবর পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন এবং জনস্বার্থে সরকার যেকোনো সদস্যের মনোনয়ন বাতিল করতে পারবে। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা মাইক্রোফোন ছাড়াই আপত্তি জানান যে, এ সংশোধনী পাস হলে জুলাই জাদুঘরটি সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। দীর্ঘ সময় উত্তপ্ত বিতর্কের পর বিরোধী দল অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে।রাজনৈতিক বিতর্ক ফোরাম

এর বাইরে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াতেও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে নতুন আইনগত পদক্ষেপ। সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, যার ফলে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই বহাল থাকছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে পূর্বে জারি করা নিষেধাজ্ঞা আইনগত ভিত্তি পেল। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশটি বিল আকারে পাস করিয়ে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা কণ্টকময় করে তোলা হলো। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাসের জন্য সুপারিশ করে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি। বিশ্লেষকদের মতে, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে আইন আকারে পাস হলে এরপর আওয়ামী লীগের যে কোনো কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধই নয়, বরং দলটির সব নেতাকর্মীদেরও বিচারের আওতায় আনা যাবে। যদিও কিছু কিছু বিশ্লেষক এ আইনের ব্যাপারে ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ‘বিএনপির এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও একই কায়দায় দল বা দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল’।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট যে, সরকার এবং সরকারের সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো মিডিয়াগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মিডিয়াগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অবাধ বিস্তারের সুযোগ নিয়ে এ মাধ্যমকেও ব্যবহার করা হচ্ছে চতুরতার সাথে। বিরোধী শিবিরের মধ্যে হতাশা এবং জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরির প্রয়াসও চলছে। সরকার প্রধানকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা তো আছেই। এরকম পরিস্থিতি চলমান থাকলে দেশ প্রকারান্তরে এক দলকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হবে যার পরিণতি হয়তো কারো জন্যই ভালো হবে না।

* আলী আহমাদ মাবরুর সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *