লন্ডন মেয়রের এফোর্ডেবল হাউজিংয়ের কোটা কমানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে টাওয়ার হ্যামলেটসসহ ৭ কাউন্সিলের আইনি চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি এবং লুইশাম কাউন্সিল একসাথে মেয়র অব লন্ডনের পরিকল্পিত সাশ্রয়ী আবাসনের (এফোর্ডেবল হাউজিং) কোটা কমানোর (৩৫% থেকে ২০%) সিদ্ধান্ত ঠেকাতে একটি আইনি চ্যালেঞ্জ শুরু করেছে। ল্যাম্বেথ, সাউদার্ক, ওয়ালথাম ফরেস্ট এবং হ্যারিঙ্গে কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইনি চ্যালেঞ্জের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সবমিলে মোট সাতটি কাউন্সিল এই আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন করছে।

হাইকোর্টে দাখিল করা এবং গ্রেটার লন্ডন অথরিটিকে প্রদান করা জুডিশিয়াল রিভিউ (বিচারিক পর্যালোচনা) আবেদনের সাথে সংযুক্ত প্রমাণাদিতে তুলে ধরা হয়েছে যে, লন্ডনের মেয়রের এই নীতির কারণে স্থানীয় কাউন্সিলসমূহ তাদের বাসিন্দাদের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রায় সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

লন্ডনের সাতটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে করা এই আইনি চ্যালেঞ্জটি মূলত মেয়র অব লন্ডনের সেই প্রচেষ্টাকে ঘিরে, যেখানে তিনি প্রস্তাবিত লন্ডন প্ল্যানে থাকা বর্তমান ৩৫% সাশ্রয়ী (এফোর্ডেবল) বাসস্থানের কোটা কমাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনের জন্য যে আইনি বা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার, তা তিনি ঠিকভাবে অনুসরণ করেননি- এই অভিযোগই এখানে তোলা হয়েছে।

এছাড়াও, নীতিগত এই পরিবর্তনের আগে সঠিক ও ন্যায্য পরামর্শ (কনসালটেশন) করা হয়নি বলেও অভিযোগ আছে। বিশেষ করে, কেন পুরো লন্ডনের সব বরোতে একসাথে সাশ্রয়ী বাসস্থানের হার ২০ শতাংশে (২০%) নামিয়ে আনা হলো, তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।

এই আইনি চ্যালেঞ্জে যৌথভাবে আবেদনকারী তিনটি কাউন্সিলের নেতৃত্বে রয়েছেন নির্বাহী মেয়রগণ, যারা তাঁদের নিজ নিজ বরোতে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।

২০১৬ সালে লন্ডনের মেয়র ঘোষণা করেছিলেন যে নতুন সব বাড়ির অর্ধেকের বেশি সাশ্রয়ী মূল্যের (এফোর্ডেবল হোম) হতে হবে। কিন্তু এখন সেই কোটা ৩৫% থেকে আরও কমিয়ে ২০% করার পরিকল্পনা লন্ডনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষসমূহ, এমপি এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফেডারেশন ও শেল্টারের মতো আবাসন সংস্থাগুলির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

লন্ডনে সামাজিক আবাসনের অপেক্ষমাণ তালিকা ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং দশ লাখের বেশি লন্ডনবাসী অতিভীড়পূর্ণ (ওভারক্রাউডিং) বা পোকামাকড়, স্যাঁতসেঁতে ও ছাঁচের মতো অনুপযুক্ত পরিবেশে বসবাস করছেন। লন্ডন কাউন্সিলের অনুমান অনুযায়ী, মোট ১,৮৩,০০০ লন্ডনবাসী (শহরের প্রতি ৫০ জন বাসিন্দার মধ্যে একজন) গৃহহীন।

৯০,০০০ শিশু গৃহহীন হয়ে অস্থায়ী আবাসনে বাস করছে, যা লন্ডনের প্রতি ২১ জন শিশুর মধ্যে ১ জন- অর্থাৎ লন্ডনের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে কমপক্ষে একজন গৃহহীন শিশু রয়েছে। আবাসন খরচ লন্ডনে শিশু দারিদ্র্যের মূল কারণ। লন্ডনে আবাসন খরচ বাদ দিলে দারিদ্রের হার ১৫% থাকলেও, খরচ অন্তর্ভুক্ত করলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশে।

ইতিমধ্যেই লন্ডন স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত সংকটের মুখোমুখি, কারণ পরিবারগুলি শহর ছেড়ে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমছে, ফলে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা পড়ে যাচ্ছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেছেন, “সত্যিকারের এফোর্ডেবল হোমস্ বা সাশ্রয়ী মূল্যের বাড়িঘরের প্রয়োজনীয়তা যখন আগের চেয়ে অনেক বেশি, তখন সেই আবাসনের কোটা কমানো একটি বড় ধরনের অন্যায়। আমাদের শহর দিন দিন সাধারণ লন্ডনবাসীর বসবাস, কাজ করা ও পরিবার গড়ার জায়গা হওয়ার বদলে অতি ধনী মানুষের বিনিয়োগের সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

“সিটি হল (লন্ডন মেয়রের কার্যালয়) দাবি করছে, এই নীতি নির্মাণ সংস্থাগুলোকে দ্রুত বাড়ি তৈরি করতে উৎসাহিত করবে। কিন্তু কার জন্য সেই বাড়ি? সাধারণ লন্ডনবাসী যদি তা কেনার বা ভাড়া নেয়ার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে সেসব বাড়ি খালি পড়ে থাকবে। বাস্তবে, বাড়ি নির্মাণের গতি বাড়ানোর বদলে এই নীতিই তা ধীর করে দিচ্ছে। কিছু ডেভেলপার ইতোমধ্যেই তাদের প্রকল্প পিছিয়ে দিচ্ছে, যতক্ষণ না সাশ্রয়ী আবাসনের কোটা ২০%-এ নামানো হচ্ছে।”

মেয়র লুৎফুর রহমান আরও বলেন, “লন্ডন ক্রমেই দুই ভাগে বিভক্ত একটি শহরে পরিণত হচ্ছে। একদিকে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনে খালি ফেলে রাখছে, আর অন্যদিকে পরিবারগুলো বছরের পর বছর হাউজিংয়ের অপেক্ষার তালিকায় (ওয়েটিং লিস্ট) পড়ে আছে।

“আমাদের শহরে প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন গৃহহীন, আর এক মিলিয়নেরও বেশি লন্ডনবাসী ওভারক্রাউডিং বা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে বসবাস করছে অথবা স্যাঁতসেঁতে, ছাঁচ ও পোকামাকড়ের মতো মানবিক আবাসনহীন পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “সাতটি কাউন্সিল এই আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে – এটাই প্রমাণ করে যে এই নীতি পুরো লন্ডনজুড়ে কত বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা লন্ডনের মেয়র এবং গ্রেটার লন্ডন অথরিটির সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার জন্য সর্বদা প্রস্তুত, কিন্তু হাজার হাজার লন্ডনবাসীকে তাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে উৎখাত করে দারিদ্র্য ও গৃহহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়ার এই পরিস্থিতিতে আমরা নীরব থাকতে পারি না।”

উল্লেখ্য, টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান মে মাসের শুরুতে লন্ডনের মেয়রকে চিঠি লিখে প্রস্তাবিত আইনি চ্যালেঞ্জের কথা জানান। পরে হ্যাকনির মেয়র ও লুইশামের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তারা যৌথভাবে লন্ডনের মেয়রের “সময়-সীমাবদ্ধ পথ” (টাইম লিমিটেড রুট – টিএলআর) নামক “জরুরি” ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিচারিক পর্যালোচনার (জুডিশিয়াল রিভিউ) আবেদন করেন।

এই ব্যবস্থার ফলে লন্ডনে নতুন নির্মাণ প্রকল্পে সাশ্রয়ী আবাসনের কোটা ৩৫% থেকে কমিয়ে ২০% করা হয়েছে। এখন এই মামলা হাইকোর্টে দায়ের করা হয়েছে এবং ল্যাম্বেথ, সাউথওয়ার্ক, ওয়ালথাম ফরেস্ট ও হ্যারিঙ্গি কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই চ্যালেঞ্জকে সমর্থন জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।

হ্যাকনি’র নির্বাহী মেয়র জো গারবেট বলেন, “হ্যাকনির মেয়র হিসেবে আমার লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট- এমন একটি হ্যাকনি গড়ে তোলা, যেখানে আমাদের কমিউনিটির লোকজন বসবাস করার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু যখন ৪০% বাসিন্দা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে এবং স্থানীয় পরিবারগুলো সোশ্যাল হাউজিং পাওয়ার জন্য সবচেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছে, তখন আমাদের জরুরি ভিত্তিতে আরও এফোর্ডেবল সোশ্যাল হোমস অর্থাৎ সামর্থাধীন সামাজিক আবাসন দরকার।

“এটা নিশ্চিত করতে হলে ডেভেলপারদের অবশ্যই সত্যিকারের সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ করতে হবে, এবং যারা তা করবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এর বদলে আমরা দেখছি মেয়র অব লন্ডন ঠিক উল্টো কাজ করছেন- টার্গেট বা লক্ষ্য কমিয়ে দিচ্ছেন, হ্যাকনি বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছেন, এবং ডেভেলপারদের দায়মুক্তি দিচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “লন্ডন মেয়রের চারপাশে এখন আর এমন কোন কাউন্সিল নেই যারা যেকোনো ডেভেলপার-প্রভাবিত সিদ্ধান্তে সায় দেবে। হ্যাকনিতে এখন এমন একজন মেয়র আছেন, যিনি সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য দৃঢ়ভাবে লড়বেন।”

লুইশামের নির্বাহী মেয়র লিয়াম শ্রীভাস্তভ বলেন, “লন্ডন এখন আবাসন সংকটের এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, এবং বেসরকারি ডেভেলপারদেরও এই শহরকে সহায়তা করার দায়িত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষ যখন কাউন্সিলের হাউজিং অপেক্ষার তালিকায় রয়েছে, তখন তাদের (ডেভেলপারদের) মুনাফা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে দেওয়া একেবারেই ভুল হবে।

তিনি বলেন, “ডেভেলপারদের যতটা বেশি সম্ভব এফোর্ডেবল হোমস (সাশ্রয়ী ঘর) নির্মাণ করা উচিত; তাদের কম নির্মাণের সুযোগ দিলে পুরো শহর জুড়ে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ লন্ডনবাসীদের বাইরে ঠেলে দেবে।

“আমরা বুঝি যে মেয়র অব লন্ডন একটি স্থবির হাউজিং মার্কেট এবং ভঙ্গুর ডেভেলপার-নির্ভর মডেলের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, কিন্তু তিনি এই পরিবর্তনগুলোর পক্ষে কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেননি, যা নিঃসন্দেহে লন্ডনে নির্মিত সাশ্রয়ী ঘরের সংখ্যা কমিয়ে দেবে।

তিনি আরও বলেন, “লুইশামে আমরা উন্নয়নের বিরুদ্ধে নই, বরং আমরা দায়িত্বশীল ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করতে চাই, যারা আমাদের কমিউনিটির প্রতি সম্মান দেখায় এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এটি করতে হলে আমাদের পরিকল্পনা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এটি আমাদের কমিউনিটির জন্য প্রয়োজনীয় আরও বেশি সাশ্রয়ী আবাসন কম নয়, বরং আরও বেশি করে সরবরাহে সহায়তা করে।” সুত্র: টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *