‘তারা বলতেন, আপনাকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’ দীর্ঘ আট বছরের রুদ্ধশ্বাস বন্দিজীবনের স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে অপহরণকারীদের এমন রহস্যময় বার্তার কথাই জানালেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখে আয়নাঘরের এসব দুঃসহ স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি।
আযমী জানান, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর বড় মগবাজারের বাসা থেকে অপহরণের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তাকে গোপনে আটক রাখা হয়। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলের (জেআইসি) একটি সঙ্কীর্ণ কক্ষে দীর্ঘ সাত বছর এসিবিহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাকে। দমবন্ধ পরিবেশে ২০২৩ সালের ৬ জুন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে কক্ষে এসি স্থাপন করা হয়, কারণ তাকে যেকোনো মূল্যে জীবিত রাখার নির্দেশ ছিল বলে জানান তিনি।
জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে আযমী বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে এমন নির্যাতনের শিকার হলেও এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে রিটটি পরবর্তীতে খারিজ হয়ে যায়। বরখাস্তের আদেশে সেনাপ্রধানের ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি স্বাক্ষর করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গুম থেকে মুক্তির পর ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে জবানবন্দী দিয়েছেন বলেও জানান আযমী। তবে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা তার জানা নেই। চাকরি জীবনের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টের ৩০৯ পদাতিক ব্রিগেড এবং রংপুরের বীরউত্তম শহীদ মাহবুব সেনানিবাসে ১৬ পদাতিক ব্রিগেড- এ দু’টি ব্রিগেডে তিনি কমান্ড করেছেন।
জেরার সময় তিনি আরো বলেন, অপহরণের দিন তিনি নিজ বাসার অষ্টম তলার ফ্ল্যাটে না থেকে ষষ্ঠ তলার একটি খালি ফ্ল্যাটে ছিলেন। সেখান থেকে নিচতলা সরাসরি দেখা না গেলেও বারান্দা থেকে কিছুটা দেখা যেত।
শুনানিতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক- মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকীকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে মামলার মূল অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১০ জন এখনো পলাতক রয়েছেন।
এ মামলায় তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে আযমীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং গত ২ ফেব্রুয়ারি তার মূল জবানবন্দী সম্পন্ন হয়। বর্তমানে তার জেরা চলমান রয়েছে। জেরা অসমাপ্ত থাকায় আসামিপক্ষ আরো সময় চাইলে আদালত পরে শুনানির জন্য ২১ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার পলাতক আসামিদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক একাধিক মহাপরিচালক রয়েছেন। তাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হকও পলাতক তালিকায় রয়েছেন। – নয়া দিগন্ত

