আমার জীবনের সূচনা যেন হয়েছিল এক আশ্রয়ময় আলোর বৃত্তে। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে আসার পর থেকেই আব্বার অপার স্নেহ, মমতা আর সুরক্ষার আবরণে আমি বড় হয়েছি। তাঁর ভালোবাসা ছিল নিঃশর্ত, গভীর ও নির্ভরতার প্রতীক।
তবে বয়স যখন পড়ালেখার পথে এগোতে শুরু করল, তখন সেই স্নেহের সঙ্গে যুক্ত হলো শাসনের দৃঢ়তা—যা আমাকে গড়ে তুলেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষ হিসেবে। আমরা তাঁকে `আব্বা` বলেই ডাকতাম, আর এই শব্দটির মধ্যেই ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর নিরাপত্তার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
আমার শিক্ষাজীবন ছিল দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। মাদরাসায় হাদিস শাস্ত্রে তাকমিল ডিগ্রি অর্জনের পর আমি আবার সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করি। নতুন করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্রে যুক্ত হওয়া ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অনার্সের প্রথম বর্ষে থাকতেই আব্বার ইচ্ছায় আমার বিয়ে হয়— যা আমার জীবনে এক নতুন দায়িত্ব ও বাস্তবতার সূচনা করে। তবুও তিনি কখনো আমার পথচলাকে ভারী হতে দেননি; বরং পাশে থেকে শক্তি জুগিয়েছেন।
১৯৮৩ সালে এমএ সম্পন্ন করার পর যখন এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হই, তখনও আব্বা ছিলেন আমার অবলম্বন। আমার সমগ্র ছাত্রজীবনের খরচ তিনি নিজ হাতে বহন করেছেন। শুধু তাই নয়, আমার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্বও তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়েছিলেন। কখনো কোনো দাবি করেননি, কখনো বলেননি— “কিছু দাও।” তাঁর এই নির্ভেজাল দয়া, আদর আর ভালোবাসা আজও আমাকে বিস্মিত করে, আবেগে ভাসিয়ে দেয়।
আমাদের বাড়ি ছিল যেন এক উন্মুক্ত আতিথেয়তার কেন্দ্র। আত্মীয়-স্বজন, মেহমান— সব সময়ই মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত আমাদের আঙিনা। খেত-খামার ও ফলের বাগানে কাজ করা অসংখ্য মানুষের জন্যও তিনি নিজ হাতে খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কারো প্রতি কখনো বিরক্তি বা অনীহার ছাপ দেখিনি। তাঁর এই উদারতা ছিল স্বভাবজাত, হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত— যা আজকের দিনে সত্যিই বিরল।
আমার দুনিয়াবি, ইলমি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য আব্বা সব সময় আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। তাঁর সেই দোয়া যে কবুল হয়েছে, তা আমার জীবনই তার সাক্ষ্য। আমি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পেরেছি, মাদরাসায় হাদিসের উস্তাদ হওয়ার তাওফিক পেয়েছি—এই সবকিছুই তাঁর দোয়ার বরকত।
তিনি জীবিত থাকতেই এসব অর্জন দেখে গেছেন— এটাই আমার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। তবে তাঁর ইন্তেকালের চার বছর পর যখন আমি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন মনে হয়েছে— আহা, যদি তিনি বেঁচে থাকতেন! কতটাই না খুশি হতেন!
আব্বার নিজের জীবনও ছিল সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিশোর বয়সেই একই দিনে তিনি তাঁর মা-বাবাকে হারান। সেই শোককে বুকে নিয়েই তিনি জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আল্লামা ফযলুল্লাহ (রহ.), মৌলভী বদিউর রহমান (রহ.) ও মাওলানা কারী আমির হামযাহ (রহ.)-এর স্নেহছায়ায় তিনি বড় হন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল— কামিলসহ প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এই অধ্যবসায়ই তাঁকে জীবনে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে।
আজকাল প্রায়ই আব্বার কথা বেশি করে মনে পড়ে। তাঁর অনুপস্থিতি যেন প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি। জীবনের প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি সুখের মুহূর্তে তাঁর অভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তাঁকে আমি সব সময় মিস করি— একজন অভিভাবক হিসেবে নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক, একজন প্রেরণার উৎস হিসেবে।
আব্বার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আজ আমাদের পরিবারে ছড়িয়ে আছে নানা সাফল্যের রূপে। তাঁর সন্তানদের ঘরে জন্ম নিয়েছে আলিম, হাফেজ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, ওয়ায়েয, লেখক ও ব্যবসায়ী। এই বহুমাত্রিক সফলতার পেছনে রয়েছে তাঁর ত্যাগ, দোয়া আর সঠিক দিকনির্দেশনার অবদান। তাঁর জীবন যেন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দিশারি—যার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়।
আব্বার জীবনের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল আমাদের— সন্তানদের সুশিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। তিনি কখনোই শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং প্রতিটি ছেলে-মেয়েকে উপযুক্ত, মানসম্মত ও জীবনমুখী শিক্ষা দেওয়ার জন্য আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছেন। আমাদের কারো পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি অবহেলা করেননি— প্রত্যেককে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস ছিল তাঁর।
শুধু শিক্ষাই নয়, জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়— বিবাহ নিয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও দায়িত্বশীল। জীবদ্দশায় তিনি আমাদের প্রত্যেকের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন সৎ, সম্মানিত ও ভালো পরিবারে। তাঁর দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতার পরিচয় মেলে এখানেও। তিনি এমন পরিবারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যারা সমাজে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মর্যাদার জন্য সুপরিচিত।
বিশেষ করে খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.), মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ (রহ.), প্রিন্সিপিাল রেজাউল করিম চৌধুরী (রহ.),মাওলানা মাহমুদুল হাসান আনসারী (রহ.), গারাঙ্গিয়ার পীর সাহেব হযরত শাহ সূফি মাওলানা আবদুর রশিদ (রহ.) ও জিরি জামিয়া ইসলামিয়ার মুহতামিম মাওলানা শাহ তৈয়ব (রহ.)-এর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তিনি শুধু পারিবারিক বন্ধনই গড়ে তোলেননি, বরং আমাদের জন্য এক সম্মানজনক সামাজিক অবস্থানও নিশ্চিত করেছেন।
আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি— আব্বার সেইসব সিদ্ধান্ত কতটা দূরদর্শী ছিল। তাঁর হাতে গড়া এই সম্পর্কগুলো আজও আমাদের জীবনে সৌন্দর্য, স্থিতি ও গর্বের অনুভূতি এনে দেয়। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল এক অভিভাবকের গভীর মমতা আর প্রজ্ঞার ছাপ, যা আজ স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।
শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও হৃদয়টা এক অদ্ভুত আবেগে ভরে ওঠে। তখন আমার বয়স মাত্র আট-দশ বছর। জীবনের অর্থ বা ভবিষ্যতের কোনো গভীরতা বুঝে ওঠার বয়স ছিল না। তবুও আব্বা যেন দূরদর্শী এক অভিভাবকের মতো আমার ভবিষ্যৎকে ঘিরে ভাবতেন, পরিকল্পনা করতেন, আর নীরবে পথ প্রস্তুত করতেন।
একদিন তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন হাটহাজারীর মেখলে— এক মহামানবের সান্নিধ্যে। তিনি হলেন আল্লামা মুফতি ফয়যুল্লাহ (রহ.)। উদ্দেশ্য একটাই— আমার জন্য তাঁর দোয়া নেওয়া। শিশুমন তখন এসবের গভীরতা বুঝতে পারেনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি, সেই সফর ছিল আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
হযরত আমাকে কাছে টেনে নিলেন। তাঁর স্নেহময় স্পর্শ, মমতামাখা দৃষ্টি— সবকিছু আজও যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারি। তিনি আমাকে ধরে দীর্ঘক্ষণ দোয়া করলেন। সেই দোয়ার শব্দগুলো হয়তো আজ আর মনে নেই, কিন্তু তার প্রশান্তি ও আশীর্বাদের ছায়া যেন আজও আমার জীবনে বিরাজমান।
অনেক বছর পর একদিন আব্বা গভীর মমতায় আমাকে বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, তোমার জীবনে মুফতিয়ে আযম সাহেবের দোয়ার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।” তাঁর সেই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। তখন মনে হয়েছিল— একজন পিতার বিশ্বাস, আরেকজন আল্লাহওয়ালার দোয়া— এই দুইয়ের সমন্বয়েই হয়তো আমার জীবনের পথ এত সুন্দরভাবে প্রসারিত হয়েছে।
আজ যখন জীবনের অর্জনগুলো ফিরে দেখি, তখন মনে হয়— সেই শৈশবের দোয়া, সেই স্নেহময় স্পর্শ, আর আব্বার অগাধ বিশ্বাস— সব মিলিয়েই আমার জীবনের ভিত গড়ে উঠেছিল। সেই স্মৃতি তাই শুধু অতীত নয়, আমার বর্তমানেরও এক উজ্জ্বল প্রেরণা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলো ছিল আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়— শিক্ষা, সংগ্রাম আর আব্বার স্নেহমাখা ছায়ায় গড়ে ওঠা এক স্মরণীয় সময়। প্রতি বৃহস্পতিবার আমি বাড়িতে চলে আসতাম, যেন সপ্তাহের ক্লান্তি মুছে নিতে পারি আপনজনের সান্নিধ্যে। আবার শনিবার হলে ফিরে যেতাম নতুন উদ্যমে। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই আব্বার সঙ্গে ছোট ছোট কিছু মুহূর্ত জমে উঠেছিল, যা আজ স্মৃতির পাতায় অমূল্য হয়ে আছে।
গ্রাম থেকে এসে সাতকানিয়ায় আব্বার চেম্বারে বিদায় নিতে গেলে তিনি নিয়ম করে জিজ্ঞেস করতেন, কত খরচ লাগবে? তখনকার দিনে জিনিসপত্রের দামও ছিল কম, চাহিদাও সীমিত। আমি লাজুকভাবে বলতাম—পাঁচশো টাকা। কিন্তু আব্বা কখনোই সে হিসাব মানতেন না। তিনি হাতে তুলে দিতেন সাতশো টাকা। তাঁর সরল যুক্তি ছিল—“যেকোনো সময় টাকার প্রয়োজন হতে পারে, কিছু অতিরিক্ত টাকা কাছে রাখা ভালো।” এই অতিরিক্তটুকুই যেন ছিল তাঁর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
একটা কথা না বললে এই স্মৃতিচারণ যেন অপূর্ণই থেকে যাবে। আমাদের জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে, প্রতিটি স্বপ্নের বাস্তবায়নে নীরবে, নিঃশব্দে যে মানুষটি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন—তিনি আমাদের মমতাময়ী মা নুরুন্নাহার বেগম।
আমাদের লালন-পালন থেকে শুরু করে শিক্ষা-দীক্ষা, এমনকি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের প্রস্তুতি—সবকিছুতেই তাঁর ছিল অক্লান্ত সহযোগিতা। গৃহস্থালির অন্তহীন কাজ, সংসার গোছানো, বাড়ির ছাদ দেওয়া, পুকুরের ঘাট নির্মাণ, সারা বছরের ধান, মরিচ, আলু সংগ্রহ করে সযত্নে সংরক্ষণ প্রতিটি কাজে তিনি ছিলেন আব্বার নির্ভরতার সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি। আব্বার স্বপ্নগুলো বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাতে মায়ের অবদান ছিল একান্ত, কিন্তু নিরাভরণ।
আমাদের গ্রামের বাড়িটি ছিল একসময় মাটির তৈরি—কাঠের ছাদ, তার ওপর টিনের আচ্ছাদন। সময়ের প্রয়োজনে আব্বা যখন ঘরটি পাকা করার উদ্যোগ নেন। নিচতলা নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তখনই ভিটা সংক্রান্ত জটিল মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয় তাঁকে। বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে অবশেষে রায় আমাদের পক্ষেই আসে। কিন্তু ততদিনে জীবনের নির্মম নিয়মে আব্বা-আম্মা দুজনেই পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে।
তাঁদের রেখে যাওয়া সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আমরা চার ভাই মিলে আজ একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করেছি। এখনও অনেক কাজ বাকি । যেন প্রতিটি ইট, প্রতিটি স্তম্ভে লুকিয়ে আছে তাঁদের ঘাম, শ্রম আর স্বপ্নের অনুরণন।
গ্রামের বাড়ির গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ঈদ-পার্বণ কিংবা যেকোনো সামাজিক আয়োজনে যখন আমরা ভাই-বোন, ভাগিনা-ভাগিনীরা একসাথে মিলিত হতাম, তখন জায়গার অপ্রতুলতা সত্ত্বেও আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না। এখন সময় বদলেছে—আমাদের মেয়েরাও সংসারী হয়েছে, নতুন প্রজন্ম যুক্ত হয়েছে পরিবারে। তাঁদের আগমনে বাড়ি আবারও প্রাণ ফিরে পায়। তবে এখন আর আবাসনের সংকট নেই—আছে শুধু স্মৃতির অফুরান ভাণ্ডার।
আজ বাড়িটি অনেক সুন্দর, পরিপাটি। কিন্তু ঘরে পা রাখলেই হৃদয়ের কোথাও এক শূন্যতা কেঁপে ওঠে। মনে পড়ে যায় তাঁদের কথা—আব্বার দৃঢ়তা, মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা। অজান্তেই চোখ ভিজে আসে, মন হয়ে ওঠে স্মৃতিকাতর।
ফুলের ভেতরে যেমন মাটির অদৃশ্য মমতারস লুকিয়ে থাকে, তেমনি আমাদের পরিবারের উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে মায়ের অবদান ছিল নীরব, গভীর এবং অপরিসীম। তিনি সামনে এসে কিছু দাবি করেননি, কিন্তু তাঁর ত্যাগেই আমাদের পথ সহজ হয়েছে। মা-বাবা সারাজীবন আমাদের গড়ে তুলেন সেবা দেন ও স্নেহ বিতরণ করেন; আমরা যখন তাঁদের সেবার উপযুক্ত হয়েছি তাঁরা পৃথিবী থেকে অনন্তের পথে যাত্রা করেন।
আজ থেকে বাইশ বছর আগে তাঁরা আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু সত্যি বলতে কী—মা-বাবা কখনো চলে যান না। তাঁরা থাকেন আমাদের প্রতিটি সাফল্যে, প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে…।
আব্বার জীবনের শুরুর অধ্যায় ছিল সংগ্রামময়, কিন্তু সেই সংগ্রামের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অনন্য সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা। সংসার জীবনের প্রারম্ভে তিনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন না। কখনো শিক্ষকতা, কখনো ঠিকাদারি, কখনো বা ছোটখাটো ব্যবসা—এভাবেই তিনি জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন। কিন্তু একটি জায়গায় তিনি কখনো আপস করেননি—তা হলো হালাল-হারামের প্রশ্নে। কষ্ট যতই থাকুক, অভাব যতই পীড়া দিক, অবৈধ আয়ের পথে তিনি এক পা-ও বাড়াননি। তাঁর এই দৃঢ় নৈতিকতা আমাদের জীবনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমরা শিখেছি—সমৃদ্ধি শুধু অর্থে নয়, সততায়; সফলতা শুধু প্রাপ্তিতে নয়, নীতিতে।
সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে তাঁর জীবনে স্বচ্ছলতা এসেছে। কিন্তু সেই স্বচ্ছলতার পেছনে ছিল কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য আর আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা। জীবনের প্রথমদিকে তাঁকে আমরা দেখেছি একটি সাইকেলের ওপর নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে। সেই সাইকেলের পেছনে বসে আমরা ভাই-বোনেরা গ্রামের বাড়ি থেকে সাতকানিয়া যেতাম—একটি সরল, কিন্তু অমলিন স্মৃতি। বাতাসে ভেসে আসা গ্রামের গন্ধ, আব্বার পিঠে ভর করে পথ চলা—এসব আজও মনে এক মধুর আবেশ জাগায়। আজ সময় বদলেছে—আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব গাড়ি হয়েছে, জীবন অনেক সহজ হয়েছে। তবুও সেই সাইকেলের দিনগুলোই যেন সবচেয়ে বেশি আপন, সবচেয়ে বেশি হৃদয়ের কাছাকাছি।
আব্বার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে যখন তিনি আল্লামা মুফতি ফয়যুল্লাহ (রহ.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। সেই মুহূর্ত থেকে তাঁর জীবনে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন শুরু হয়। তিনি হয়ে ওঠেন সুন্নতের একনিষ্ঠ অনুসারী। তাহাজ্জুদের নীরব রাত্রি, নফল রোজার আত্মসংযম, আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায়ের দৃঢ়তা—এসব ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাঁকে আমরা দেখেছি রাতের নিস্তব্ধতায় আল্লাহর দরবারে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, আবার দিনের ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মের এক চুলও ব্যত্যয় না ঘটাতে। তাঁর এই আধ্যাত্মিক জীবন আমাদের শিখিয়েছে—মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুধু দুনিয়াবি সাফল্যে নয়, বরং আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।
আব্বার জীবনের আরেকটি অনন্য দিক ছিল তাঁর পরোপকারিতা ও গভীর মানবিকতা—যা শুধু কথায় নয়, কাজে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পেত। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের পরিবার ছাড়িয়ে অন্যের দুঃখকেও নিজের মনে ধারণ করতেন। বিশেষ করে আমাদের আশপাশের অনেক পরিবারে যখন কোনো শিশু বা তরুণ অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে যেত, তখন আব্বা নীরবে তাদের পাশে দাঁড়াতেন—একজন অভিভাবকের মতো, একজন আশ্রয়দাতার মতো।
আমি নিজ চোখে দেখেছি, কী অসীম মমতায় তিনি সেই পরিবারগুলোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, পরনের কাপড় জুগিয়েছেন, এমনকি শিক্ষার পুরো ব্যয়ভারও বহন করেছেন। কখনো কোনো প্রচার, কোনো স্বীকৃতি বা কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশা করেননি। যেন এটি তাঁর কর্তব্য—একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের দায়বদ্ধতা।
সেই শিশুদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত—কেউ শিক্ষিত, কেউ স্বাবলম্বী, কেউ সমাজে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের সাফল্যের পেছনে যে এক নীরব হাত ছিল, এক অদৃশ্য ছায়া ছিল—সেটি হলো আমার আব্বা। কিন্তু তিনি কখনো তাদের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেননি; বরং নিভৃতে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন।
আজ যখন এই স্মৃতিগুলো মনে ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়—আব্বা শুধু আমাদের পিতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বহু মানুষের জীবনের আলোকবর্তিকা। তাঁর এই দানশীলতা, এই নিঃস্বার্থ মানবসেবা নিঃসন্দেহে দুনিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। এর প্রকৃত প্রতিদান তিনি অবশ্যই পরকালে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে লাভ করবেন—এটাই আমাদের অটল বিশ্বাস।
তাঁর জীবন যেন আমাদের শিখিয়ে যায়—মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদে নয়, বরং অন্যের জীবনে সে কতটা আলো জ্বালাতে পেরেছে, তার মধ্যেই নিহিত।
আব্বার জীবন যেন ছিল বহুমাত্রিক এক আলোকবর্তিকা—জ্ঞান, সেবা ও মানবকল্যাণের এক অপূর্ব সমন্বয়। মূলত তিনি ছিলেন শিক্ষক ও চিকিৎসক—দুই ভূমিকাতেই সমান দক্ষ, সমান নিবেদিত। সারাজীবন তিনি কওমি মাদরাসার মুহতামিম এবং ফাযিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে পাঠ, তাঁর তত্ত্বাবধানে শিক্ষা—অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করেছে। তিনি শুধু পাঠদান করতেন না; তিনি গড়ে তুলতেন মানুষ, চরিত্র আর চিন্তার ভিত।
শিক্ষা বিস্তারের এই প্রয়াসকে আরও প্রসারিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “হাবিবিয়া লাইব্রেরি”—একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে বহু পাঠ্যবই প্রকাশিত হয়েছে, যা ছাত্রদের হাতে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিয়েছে। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর; তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি ভালো বই একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে।
শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসা ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল সমান খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা। তিনি ছিলেন সরকার স্বীকৃত বাংলাদেশ হোমিও বোর্ডের নিবন্ধিত চিকিৎসক। নতুন কিংবা জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর চিকিৎসা ছিল আস্থার নাম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত “হাবিবিয়া হোমিও ফার্মেসী” ছিল মানুষের ভরসার ঠিকানা। প্রতিদিন সেখানে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লেগেই থাকত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত তাঁর কাছে—শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, বরং তাঁর আন্তরিকতা ও স্নেহমাখা ব্যবহারের জন্যও।
আমরাও ভাই-বোনেরা তাঁর অনুপ্রেরণায় চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। অনেকেই কলেজ থেকে ডিএইচএমএস ডিগ্রি অর্জন করি। যদিও পরবর্তীতে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ায় সেই পথে এগোনো হয়নি, তবুও সেই শিক্ষার ভিত আমাদের জীবনে মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে। আজও “হাবিবিয়া হোমিও ফার্মেসী” তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ভাই মাওলানা ফারুক হোসাইন ও আবদুল্লাহ সেই উত্তরাধিকার ধরে রেখেছেন। তিনি নিয়মিত রোগী দেখেন, আর আব্বার পথ অনুসরণ করে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।
ছাত্রজীবনে অবসর সময় পেলেই আমরা ভাইয়েরা আব্বার পাশে বসতাম—কখনো ওষুধ তৈরি করতে সাহায্য করতাম, কখনো রোগীর খোঁজখবর নিতাম। সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আজ মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। দায়িত্ববোধ, মানুষের প্রতি দরদ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা—সবকিছুই যেন আমরা শিখেছিলাম তাঁর সেই চেম্বারের পরিবেশে বসেই। আজও যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—আব্বা শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আদর্শ।
আজ যখন অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন মনে হয়—আব্বার জীবন ছিল যেন এক জীবন্ত শিক্ষা। সংগ্রাম থেকে স্বচ্ছলতা, দুনিয়া থেকে আখিরাত—সবকিছুর মাঝেই তিনি রেখে গেছেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর সেই পথচলার গল্পই আজ আমাদের জীবনের প্রেরণা, আমাদের অন্তরের আলো। আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমতের শীতল ছায়ায় আপনার বারযখী জীবন মহিমান্বিত হোক। নসীব হোক জান্নাতুল ফিরদাউসের চির সূখময় আনন্দের আবাসন। এটাই আমাদের প্রার্থনা।
* ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন লেখক ও গবেষক, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

