ষোল.
পূজাটুজা শেষ। হৈ হাংগামাও নাই মাঠে। স্কুলও বন্ধ। রোজা-পূজা মিলেঝিলে বেশ লম্বা ছুটি। সময় আর হাঁটতে চায় না। খেলাধুলায় কতো আর ডুবে থাকি। স্কুল নাই, পড়ালেখায়ও মন বসিবসি করে উঠে যায়। আব্বা-আম্মাও কি নিয়ে যেনো ফিসফাস করেন ইদানিং। তাদের ফিসফাস আমাকে ভাবনায় ফেলে। আবার কি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে কে জানে। ঢাকা ছেড়ে আসার আগেও এমন ছবি হাওয়ায় ভাসতো। একদিন ধপাস করে মাটিতে পড়লো ছবি। জানা গেলো ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লা যাচ্ছি আমরা। এমনিতে মগজে কিলবিল করছে অস্বস্তির পোকা। স্কুলে ভর্তি হতে না হতেই এতো লম্বা ছুটি। বন্ধের বদলে খোলাতেই আনন্দ বেশি। ক্লাশ করার সাথে দৌড়ঝাপ। সময়টা কাটে মজার। ছুটির দুচার দিন পর কেমন যেনো অস্থির অস্থির লাগে। কপালে হাত রেখে বসে থাকে সময়। আব্বা আম্মার হাঁটা-চলায়ও উদাস উদাস ভাব। যেমনটা ঢাকায় দেখে ছিলাম। তাই মনের ভিতর একটা মোচড় দিলো অজানা শংকায়। শংকার পাখা গজাল, এক সময় উড়ালও দিলো। রাতের খাবার খেতে খেতে আব্বা বললেন তোমার তো এখন লম্বা ছুটি। কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়। আমি তো লাফিয়ে উঠলাম এমন প্রস্তাবে। আম্মাও আব্বার পাশে এসেই দাঁড়ালেন। তারপর অনেক যোগ-বিয়োগের পর সাব্যস্ত হলো আমরা নানাবাড়ি যাব। যাবার দিন তারিখও ঠিক হলো। কিন্তু গোল বাঁধলো অন্য খানে, অন্য জায়গায়। কে হবেন আমাদের সঙ্গী। যিনি পৌঁছে দেবেন নানাবাড়ি পর্যন্ত। আব্বার ছুটিছাটা নাই। চাকরি-বাকরি করেন। তাও আবার সরকারি চাকুরি ডাক-বিভাগে। অগতির গতি বড়মামা। তাকেই পাঠানো হলো খবর। পত্রপাঠ, তিনি চলেও এলেন এক সন্ধ্যায়।
ঘরে বাইরে খুশির প্রজাপতি। বড়মামার গলায় ঝুলে থাকলাম কতক সময়। বড়মামাও খুশির নদীতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। দু’জনার এই হৈ-রৈ কান্ড দেখে আম্মা হাসলেন। একটা নরম ধমক দিলেন আমাকে। মামাকে আর কত জ¦ালাতন করবে। একটু বিশ্রামের সময়তো দাও, কতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন, ক্লান্তি ঝুলে আছে সারা শরীরে। কার কথা কে শুনে। স্কুলে যে ভর্তি হয়েছি সে খবর জানালাম। বইপত্র এনে হাজির করলাম বড়মামার সামনে। আমার এমন খলবল অবস্থা দেখে বড়মামা মাথা পিঠে হাত রাখলেন। এরই মধ্যে আব্বা এসে যোগ দিলেন, জিজ্ঞেস করলেন ভালো-মন্দ। তারপর জানালেন আমরা আগামীকালই রওয়ানা দেব সকালের ট্রেইনে। আমিতো আটখানা নয় একেবারে দশখানা খুশিতে। যদিও আব্বা যাচ্ছেন না। মাল সামান কিছুটা গোছগাছ করলেন আম্মা, অপেক্ষার প্রভাত নাকি দেরিতেই আসে। মোহাম্মদ আলী ভাই একদিন আমাকে বলেছিলেন। এখন দেখছি তার কথাটিই যেন সঠিক। সময় দাঁড়িয়ে থাকলো ঠাঁয়। জামরুল গাছের পাতার ফাঁকে ঝুলেছে চাঁদ। কাঠবিড়ালীরাও যেনো কোথায় চলে গেছে। হয়তো ঘুমিয়ে আছে। জোনাকি আর বাদুড়ের ওড়াউড়িতে একটা ভয় ভয় সময় পার করছি। সে রাতে আর ঘুমের প্রজাপতিরা এলো না। ধারাপাত গুনে গুনেই কাবার করলাম রাত।
সেই পুরানো কহিনী গাড়ির এক কামড়ায় আমি আর আম্মা। পাশের কামড়ায় বড়মামা। চলছে রেলগাড়ি ঝিকঝিক। কালো রংয়ের ইঞ্জিনের মাথা ফুড়ে বের হয়ে আসছে ধুঁয়া। আর তলায় জ্বলছে আগুন। মাঝে মধ্যে কান ঝাঁঝালো বাঁশীর চিৎকার। চিৎকার করতে করতে গাড়ি এসে থামল আশুগঞ্জ স্টেশনে। একটি নদীবন্দর আশুগঞ্জ। এখানে ধান পাটের ব্যবসা হয়। বড় বড় পাটের গুদাম আছে গঞ্জে। মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষেই এই বন্দরটি। পানিশ্বরের আমার এক ফুফা জানিয়ে ছিলেন এ তল্লাটের জামিদার আশু বাবুর নামেই নাকি নামকরণ হয়েছে আশুগঞ্জ। আগে এলাকাটি সুরতপুর নামে পরিচিত ছিল। এখনকার স্টেশন থেকে একটু তফাতে ছিল সেই রেলস্টেশন। অনেক দিন পর্যন্ত টিকে ছিল একটি ভাংগা টিনের ঘর সেখানে। এলাকার জনগণকে মনে করিয়ে দিত সুরতপুর রেলস্টেশনের ইতিহাস-কাহিনী। এই ভাংগা ঘর। নামতে না নামতেই চলতে শুরু করলো রেলগাড়ি ভৈরবের দিকে। মেঘনা ব্রিজ পার হলেই ভৈরব বাজার । ভৈরবও একটি বড়সড় বাজার। ধানপাট আরো কতো কি পাওয়া যায় এই বাজারে। বড়মামাই জানালেন পুরান কালে নাকি মানুষজন ডাকতো উলুকন্দির চর নামে। এখন ভৈরব। ছল ছল করে বইছে মেঘনা। উজান ভাটি করছে নৌকার সারি। কোনোটি পাল তোলা কোনোটি পালহীন।
ভৈরব পুলের ঢাল বেয়ে নেমে গেলেই পাওয়া যায়, মেঘনার ঘাট। সেখানে অনেক নৌকার ভিড়। এসব নৌকা এপার-ওপার করে সকাল সন্ধ্যা । কিছু ভৈরব বাজার, কিছু লন্ডন ঘাট। বড়মামাকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম এখানে আবার লন্ডন কোত্থেকে এলো। এটিতো ভৈরব বাজারের লাগুয়া এলাকা। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। তবে লন্ডন ঘাট বলার একটি কাহিনী আছে। অনেক দিন আগে ােসই ইংরেজ আমলে এখানে একটি পাটের অফিস ছিল। পাটের গুদামও বলতে পারো। এই তল্লাট থেকে পাট কিনে সে পাট লন্ডন পাঠানো হতো। অফিসটির নামও হয়তো লন্ডন জুট ছিল। এঘাটেই বড় বড় জাহাজ ভিড়তো। পাট বোঝাই করে সে সব জাহাজ লন্ডনের দিকে রওয়ানা দিতো। লন্ডন ঘাটের গল্পটা এরকমই হবে হয়তো। এই পাট-অফিসটা উঠে গেছে সেই কবে। আশি নব্বই বছর তো হবেই। কিন্তু লন্ডন ঘাট নামটি ঝুলে আছে আজ অবধি।

সতের.
আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নানাদের পাঠানো নৌকা। ভৈরবপুলের ধারঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল সেটি। তফাতে আরো অনেক নৌকা মেঘনা ঘাটে। স্থানীয় লোকেরা বলে গোদারা ঘাট। এসব নৌকা যাত্রী এপার ওপার করে। কোনোটি ছৈ-ওয়ালা, কোনোটি ছৈহীন। আমাদের নৌকাটি আবার অন্য ধরনের, ভিন্ন চেহারার। নৌকার ছৈটি বেশ পরিপাটি করে তৈরি। কাঠামোটি নিখুঁত এবং সুন্দর। ছৈ এর মুখ বরাবর নকশা করা দরজা। লাল নীল এবং হলুদ রংগে ছোপানো। নৌকাটি যে বিশেষ যতœ করে তৈরি, প্রথম নজরেই বোঝা যায়। নৌকাজুড়েই যেন একটা আভিজাত্যের ছাপ।
নানা-নানি বা বাড়ির অন্য কোনো সদস্য কোথাও বেড়াতে গেলে এ নৌকাটি ব্যবহার করেন। মাঝিও আছে আলাদা নৌকার। আরো কয়েকটি নৌকা আছে নানাদের। যে গুলো ধান-পাট, মালপত্র আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার হতো। জুতাটুতা বাইরে রেখে ছৈয়ের ভিতরে ঢুকলাম আমরা। পরিপাটি করে বিছানা পাতা। তোশকের ওপর রংগিন চাদর, সাথে দুটি বালিশ। সে বিছানা থেকে যেনো সরাফতির একটা গন্ধ উঠে আসছিল। আমরা ভিতরে বসলাম। বড় মামা ভিতরবাহির করলেন সারাটা সময়।
আল্লাহ’র নাম নিয়ে নৌকা ভাসাল মাঝিরা। তিনজন মাঝি। একজন পিছনে ধরল হালের বৈঠা। দুজন থাকলো নৌকার আগায়। ছোট ছোট ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে নৌকার তলায়। ফুরফুরে বাতাস। তামাম মেঘনা জুড়ে উত্তর দক্ষিণ করছে। কিছুটা পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে সূর্য। হলুদ হলুদ রং মেখে। আমি ছৈয়ের বাইরে যেতে চাইলাম। আম্মা আটকে দিলেন। উড়িয়ে দিলেন ভয়ের অনেকগুলো ধূসর পাতা। নদী দেখবো, নৌকা দেখবো মাঝি দেখবো, ভৈরবের পুল দেখবো। কিন্তু আম্মার বারণ আমাকে টেনে ধরলো। ছৈয়ের এক মাথায় কাঠের নকশা করা দরজা। অন্যদিকে একটি চাদর টানানো। শহরের রিকশাগুলোতে যেমন ঝুলে। মাঝেমধ্যেই বাতাসে উড়ছে চাদর। এই ফাঁক-ফোকর দিয়ে যতটুকু দেখা মিলে। এই দেখাতে কি মন ভরে? আম্মাকে কে বোঝাবে। আমি মন ভার করে বসে থাকলাম ছৈয়ের ভিতরে। মামার কাছে যেতে মন আকুপাকু করছে। কিন্তু সরাফতির পর্দা আমার নজরের মাঝবরাবর ঝুলে থাকলো।
বড়মামা এরি মধ্যে পাঠ করে ফেলেছেন আমার মনের পাতাগুলো। ছৈয়ের ভিতর ঢুকলেন পর্দা ঠেলে। এতো সময় মামাকে ডাকতে সাহস পাচ্ছিলাম না। আম্মার বকাঝকা শুরু হবে এজন্যে। মামার চেহারা দেখে সাহস লাফিয়ে উঠলো। ছৈয়ের বাইরে যাবার আবদার রাখলাম। আম্মার চোখে চোখ রাখলাম ভয়ে ভয়ে। শাসনের বেত তুলতে গিয়েও নামিয়ে নিলেন আম্মা। এই সুযোগে মামাকে জড়িয়ে ধরে বলালাম বাইরে দেখবো, নৌকার ভিতর আর কত সময় বসে থাকা যায়। আম্মা নরম গলায় আপত্তির নিশান উড়াতে চাইলেন। ভয় লাগে কখন কি হয়ে যায়। এতো বড় মেঘনা। বড় তাতে কি হয়েছে ওতো আমার সাথেই থাকবে। ভয় টয়ের চিন্তা পানিতে ফেলো, বড়মামা উঁচু গলায় শব্দগুলো বাতাসে ছুড়ে দিলেন। আমার চারপাশে তখন আনন্দের রঙিন ঝালর।
আশুগঞ্জ বাজারে মাঝ বরাবর গিয়ে নৌকা মুখ ঘুরালো দক্ষিণে। মামা বললেন আমরা এখন মেঘনা পাড়ি দেবো। ছোট বড় ঢেউ। আগে বাড়ছে হামাগুড়ি দেয়ে। আকাশে উড়ছে পাখি, সাদা সাদা। কিছু সময় পরপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে পানিতে। ঠোঁটে ছোট ছোট মাছ নিয়ে উড়াল দিচ্ছে আবার। এ এক মজার খেলা। আমাদের নৌকার পেছন পেছনও আসছিল একদল সাদা পাখি। নৌকার পাশ দিয়েই ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানার একটি দঙ্গল। এই দঙ্গলে বসে আছে বেশ কয়েকটি ধলবগ। কি চমৎকার দৃশ্য। মামা ইশারা করে দেখালেন আমাকে। আমিতো অবাক! এমন সুন্দর ছবি দেখে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলছে কচুরিপানা। বকগুলো দেখছে ইতিউতি। পানার সাথে দুলছে ওরাও। কোথায় যাচ্ছে কে জানে। দূরে দূরে গ্রাম। ভাসছে মনে হলো পানিতে। সারি সারি নৌকা মেঘনায়। যাচ্ছে আসছে সাঁতার কেটে কেটে। ছৈয়ের ভিতরে আম্মা দোয়া-কালাম পড়ছেন। হয়তো আমার জন্য। আমি পাটাতনে বসে বসে বাতাস খাচ্ছি। আর দেখছি মেঘনার থৈ থৈ পানি। অন্যদিকে আম্মার ভাবনা কি জানি কি হয় আমার।
আমাদের নৌকা নদীর মাঝখানটায় এসে পড়েছে। বড়মামা আঙ্গুল ইশারায় বল্লেন অই যে দেখছ গ্রাম, এ গ্রামের বাঁক ঘুরলেই দেখা দেবে আগানগর। আগানগর নানাদের গ্রামের নাম। সে গ্রামও নাকি পানিতে ডুবুডুবু। এমন দৃশ্য অবশ্য প্রতি বর্ষার।
এ এলাকার মানুষগুলোর যেনো পানিতেই বসবাস। প্রায় বাড়ির ঘাট বরাবর নৌকা। ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলছে। মামা জানালেন অই যে দেখছো নৌকা, এ নৌকাই ওদের যাতায়াতের বাহন। তবে এ চেহারাটা শুধু বরষাকালে। বরষা যখন পালিয়ে যায় এ তল্লাট থেকে তখন আশপাশে আর পানি থাকে না। হাঁটা-চলা করা যায়। খেলাধুলার মাঠও ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে ফসলের মাঠ। তখন হু হু করে বয়ে যায় আনন্দের বাতাস। ফসলের মৌ মৌ গন্ধ মেখে। আমার চোখে কেবল ভাসছে আগানগর গ্রাম। নানাবাড়িতে কখন পৌঁছবো। পানি আর নৌকার ছবি এখন ঝাপসা ঝাপসা লাগছে।
ভিতর থেকে আম্মা জানতে চাইলেন কতদূর এলাম আমরা। বড়মামা জানালেন, অই তো শ্যামপুর দেখা যাচ্ছে। আর বেশি সময় লাগবে না বাড়ি পৌঁছতে। অনেক সময় ধরেই আম্মা একা একা। তাই পর্দা ঠেলে কাছে গেলাম। বড়মামাও এলেন পেছন পেছন। আম্মার চেহারায় ভয় আর আতঙ্ক জড়াজড়ি করে বসে আছে। ভাবনায় কেবল আমি, হয়তোবা।

আঠার.
তীর ছুঁই ছুঁই করছে নৌকা। পেছনে পড়ে যাবে মূল মেঘনা। মাঝিরা এমনটাই বলাবলি করছে। তাই ওদের চেহারায় একটা ফুরফুরে ভাব। যদিও তারা হররোজই মেঘনার পানি উথাল পাথাল করে। এপার ওপার করে নদী। সাহসের মুঠোতে আটকে রাখে ঝড় তুফানের লাল চোখ। নৌকার তলায় পিষে মারে ঢেউয়ের উরন্ত ফণা। সেই মাঝিরা এখন কিছুটা শান্ত। গ্রামগুলোর আগায় বসি বসি করছে সূর্য। যেনো একটা লাল বল। নৌকার গতি ধীর থেকে ধীর হচ্ছে।
শ্যামপুর অনেকটা কাছে চলে এসেছে। বেশ কয়েকখানা লম্বা নৌকা ঘুরাঘুরি করছে। বড় মামা জানালেন এগুলো জেলে নৌকা। বিশেষভাবে তৈরি করা। জেলেরা মাছ ধরার মাল-সামান নিয়ে নদীতে ভাসে। জাল ফেলে আর মাছ ধরে। কেউ ধরে বড় মাছ কেউ ধরে ছোট মাছ। বড় মাছ যারা শিকার করে তারা মেঘনার প্রায় মাঝ বরাবর যায়। আর ছোট মাছ ধরতে অবশ্য বেশি দূর যেতে হয় না। গ্রামের আশপাশে জাল ফেললেই হয়। অনেক মাছ জালে উঠে আসে। এ জেলেরা থাকে কোথায়, মামাকে জিজ্ঞেস করলাম। কেন? অই শ্যামপুর গ্রামে। শ্যামপুরকে বলা হয় কৈবর্ত পাড়া।
যারা মাছ ধরে তাদেরকে জেলেও বলা হয়। আবার কৈবর্তও ডাকা হয়। বলতে পারো মাছ আর পানির সাথেই ওদের বসবাস। অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে আমাদের নৌকা। একটু পরেই ঘুরবে শ্যামপুরের বাঁক। ভৈরবের পুল পড়ে যাবে আড়ালে। আশুগঞ্জের কতকটা অংশও নজরের থাকবে বাইরে। দূর থেকে চমৎকার লাগছিল পুলটি। ভাবছিলাম এতবড় মেঘনায় কারা এমন পুল তৈরি করল। চারদিকে থৈ থৈ পানি। সাহসের তারিফ করতে হয় সেসব মানুষজনদের। আমি এক নজরে তাকিয়ে থাকলাম পুলটির দিকে। বড় মামা লক্ষ্য করলেন আমার হাবভাব। যতই আগে বাড়ছে, নৌকার আড়ালে যাচ্ছে মেঘনার বিশাল পুল। ধুসর হচ্ছে রং। এই পুলের ওপর উঠবো কবে কে জানে। এ কথা মনে হতেই কাঁটা দিয়ে উঠলো গা, শরীর, ভয়ে। পুলের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মেঘনা। পানিতে মাখামাখি ঢেউ। সে ঢেউ আছড়ে পড়ছে পুলের খাম্বাগুলোতে। তারপর ভেঙে খানখান।
মামাও দেখছিলেন পানির শোভা। পুলের কারুকাজ। এই পুলটি নাকি তৈরি হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। তখন ইংরেজ আমলের প্রায় শেষ সময়। মিট মিট করে জ্বলছে বাতি। সে সময় সিংহাসনে রাজা ৬ষ্ঠ জর্জ। তাই এই পুলের নাম রাখা হয় রাজা ষষ্ঠ জর্জ সেতু। এলাকার লোকেরা বলে ভৈরব সেতু, আবার কেউ বলে মেঘনা সেতু। এই পুলের উপর দিয়ে প্রথম গাড়ি চলে ১৯৩৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর। সে গাড়িটি ছিলো মালবাহী গাড়ি। আর এই মালগাড়িটির যিনি সাহসী চালক ছিলেন তার নাম নওয়াজ আলী। তিনি ছিলেন একজন বাঙালী। পুলটি উদ্বোধন করেছিলেন বাঙলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তাকে দেশের মানুষ ডাকতো বাংলার বাঘ। বুকের ভিতর দাপাদাপি করতো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। চোখের মণিতে নাচতো সাহসের রক্তজবা। থর থর কাঁপতো ইংরেজরা, তার নাম শুনলে। তিনি ছিলেন বরিশাল অঞ্চলের। একই বছরের ৬ই সেপ্টেম্বর যাত্রীবাহী গাড়ি উঠে পুলে। আশুগঞ্জ থেকে আসে ভৈরব। তখন থেকেই ভৈরব জংশন। এত সব গল্প শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। মামা বুঝলেন বিষয়টি। জংশন নামটির কাছে গিয়েই টক্কর খাচ্ছিলাম। জংশন ডাকা হয় সে সব স্টেশনকে, যেখানে অনেক গাড়ি এসে জমা হয়। এই যেমন ধরো ভৈরব, এখানে গাড়ি আসে ঢাকা থেকে, মোমেনশাহী থেকে। উলটা দিকে সিলেট-চট্টগ্রাম, কুমিল্লার গাড়ি। ব্যাপরটা খোলাসা করে মামা আমার দিকে হাসি হাসি দৃষ্টিতে দেখলেন। এরি মধ্যে আমাদের নৌকা দুই গ্রামের মাঝখানে ঢুকে পড়েছে। ডানে শ্যামপুর বামে অমরনাথপুর। বরাবর দেখা যাচ্ছে আগানগর। নানাদের গ্রাম।
এরিমধ্যে টানানো চাদরটি খুলে ফেলেছেন আম্মা। এখন নৌকার ভিতর বাহির একাকার। সামনের কপাটটিও মেলে দিলেন। ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ঢুকলো ছৈয়ের ভিতর। গুমোট ভাবখানা পালিয়ে গেলো বাইরে। ততক্ষণে হাপ ছেড়ে বাঁচলেন আম্মা। ধীরে ধীরে চলছে নৌকা। শব্দ উঠে আসছে ছলাৎ ছলাৎ। একটু বাদেই ভিড়বে নৌকা ঘাটে। অপেক্ষার কাল যেনো কাটতে চাইছে না আর । হয়তো আম্মারও।
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

