এগার.
অপেক্ষার রাত ফুরাতে চায় না। সকাল হলো অবশেষে। অন্যান্য দিনের মতো অফিসে রওয়ানা দিলেন আব্বা। আর ত্বর সইছে না। কখন বাইরে যাবো কখন নতুন বলটি বন্ধুদের দেখাবো সেই চিন্তা মাথায় কিলবিল করছিল। আম্মার অনুমতি নিয়ে বাসার বাইরে এলাম। তবে ওয়াদা করতে হলো মাঠের সীমা যেন অতিক্রম না করি। সামনের জানালাটা খুলে রাখলেন। এ জানালায় দাঁড়ালে সবটা মাঠ চোখের আওতায় চলে আসে। এ সময়টাতে মাঠ ফাঁকা ফাঁকাই থাকে। স্কুল-পাঠশালায় যারা যায় তারা তো আর আসতে পারে না। লুকিয়ে ছাপিয়ে দুএকজন মাঠে পা রাখলেও আম্মাদের ডাকাডাকিতে ঘরে ফিরতে হয়। তৈরি হতে হয় পাঠশালার জন্যে। আম্মার কাছে একদিন আবদার করলাম আমিও পাঠশালায় যাবো। পাঠশালাটা যে কি রকম তখনো সেটা বুঝে উঠতে পারিনি। পাশের বাড়ির ইউসুফ বলেছিল ওখানে একসাথে মিলে অনেক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। স্যার আসেন ক্লাসে। হাতে থাকে ইয়া বড় বেত। জিজ্ঞেস করেছিলাম বেত কেন? যারা পড়া পারে না দুষ্টুমি করে তাদেরকে সেই বেত বা লাঠি দিয়ে মারপিট করে। এমন সংবাদে চোখে জবা ফুল ফুটতে থাকে। একসময় পাঠশালার কথা ভুলে যাই। শুধু বেত হাতে স্যারদের চেহারা ভাসে। ভয়রা ধুপধাপ হাঁটে চারপাশটায়। আম্মাকে যখন জানালাম পাঠশালার কাহিনি তখন আব্বা-আম্মা দুজনেই হাসলেন। তবে কি ইউসুফ মিথ্যে বলেছে! আব্বা জানালেন যারা ভালো পড়াশোনা জানে, দুষ্টুমি করে না, স্যাররা তাদেরকে আদর করেন, ¯েœহ করেন! তুমি তো ভালো ছেলে, পড়ালেখাও ভালো পারো, তোমার কোনো ভয় নাই। আমি তোমাকে পাঠশালায় ভর্তি করে দিব। আর কটা দিন যাক।
তখনো দু’চারজন ঘুরাফেরা করছিল মাঠে। আমরা মতো ওদেরও পাঠশালা নাই হয়তো। নতুন বলটি হাতে। ডানহাত বাম হাত করছি বারবার। মনে একটা অন্যরকম আনন্দ দৌড়াচ্ছে। আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো ওরা। তাদের চোখেও খুশির নাচন। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে বলটি। এতদিন ছিলেঅ জাম্বুরার বল, এবার আসল বলে খেলা হবে। আনন্দ যেন আর সীমায় থাকতে চাচ্ছে না। সবাই আমাকে খাতির করছে। বল হিরো বানিয়ে দিলো আমাকে। এরিমধ্যে বন্ধুদের কাছে ছড়িয়ে গেল নতুন বলের খবর। তাই সময়ের আগেই খেলা। অন্যরকম আনন্দ নিয়েই যেন সেদিনের ফুটবল জমে উঠলো।
লাল সূর্যটা দ্রæত নামছে নিচে। গাছে গাছে পাখির কিচির মিচির। মাগরিবের আজানের শব্দ দড়জা জানালা গলিয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরে ঘরে। কাঁসার ঘন্টা হুলুধ্বনি আর ধুপধুনার গন্ধও ভাসছে বাতাসে। ঠাকুর পাড়ায় হুলুধ্বনি আর ঘন্টার বাজনা আজানের ধ্বনিকেও যেন ছাপিয়ে ওঠে, তেমনটাই মেন হয় আমার কাছে। প্রতিদিনের সন্ধ্যা নামে এভাবে ঠাকুর পাড়ায়। আম্মা-আব্বা দুজনেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। আমি ঘরে ফিরি। তাঁরা তখন নামাজের জন্যে তৈরি হন। ঢাকার মতো আশপাশের বাড়ি-ঘর থেকেও সুরা কালামের শব্দ ভেসে আসে। ধুপধুনার গন্ধও মাঝে মধ্যে হালকা আবার কখনো তিব্র হুলুধ্বনি, ঘন্টিও বাজে, উড়ে। তারপর আঁধার নামে, ঘন কালো। ঠাকুরপাড়ার প্রতি বাড়িতেই ফুলবাগান। নানান কিসিমের ফুল। সকাল বিকাল গন্ধে ভুরভুর বাতাস। সুবাসমাখা বাতাসের গলিপথে হাঁটি। অন্যরকম এক পুলক হৃদয়, মনকে ঝাঁকুনি দেয়। জড়িয়ে ধরে।

বারো.
ঢাকার মতো এখানেও বাড়িতে বাড়িতে কলটল ছিলো না। তাই খাবার পানি জোগাড় করতে হতো বাইরে থেকে। তবে ঠাকুর পাড়ায় কোনো ভিসতিওয়ালার দেখা পেলাম না। বাঁশের লাঠির দুমাথায় দু’টি টিন ভর্তি পানি বাসায় বাসায় পৌঁছে দিতো। কিছু লোক এজন্য টাকা নিতো মাসে মাসে। অনেকটা ভিসতিওয়ালাদের মতোই ছিলো ওরা। আশপাশের বাড়ি-ঘরগুলোতেও এদের আনাগোনা ছিলো। এসব পানি যতœ করে কলসিতে ঢেলে রাখতেন আম্মা। ঢাকায় ভিসতিওয়ালারা কোথা থেকে খাবার পানি যোগাড় করতো সে খবর আব্বা আর মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের জানা থাকলেও আমি ছিলাম বেখবর। তবে ঠাকুরপাড়ারটি একেবারেই আলাদা। আমরা যে বাড়িটিতে থাকি সে বাড়ির খানিকটা দূরেই একটি টিপকল। কলটি ছিলো সদর রাস্তার অন্যপাড়ে। এই কলে সকাল বিকাল পানি পাওয়া যায়। তবে ঘন্টা ধরে পানি। সকালে ঘন্টাখানেক আবার বিকালে ঘন্টাখানেক। এই ছিলো রোজকার নিয়ম। সময় হলেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা, কোনো কোনো দিন বয়ষ্ক পুরুষ মহিলারাও কলতলায় এসে জড়ো হতো। এমন কল নাকি পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। এই সব কলই ছিলো পানি ফেরিওয়ালাদের ঠিকানা। এখান থেকেই ওরা পানি সংগ্রহ করে বাসায় বাসায় পৌঁছে দেয়। প্রায় প্রতিদিনই ওরা আসতো বাসায়। আসতে আসতে ছলকে ছলকে পড়তো পানি। এই পানি পড়ার দৃশ্যটি বেশ ভালো লাগত। আমি তখন আম্মার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম পানির নাচন।
আমার বয়সি অনেক ছেলেমেয়েই জড়ো হতো কলতলায়। কারো হাতে কলসী, কারো হাতে বালতি জাতিয় কিছু। সময় অল্প। তাই পানি সংগ্রহে ব্যস্ত হয় সবায়। কোথা থেকে এই পানি আসে কারাই বা এমন পানির স্রোত কলের মুখ দিয়ে পাঠায় তা নিয়ে অনেক ভেবেছি। এ ব্যাপারে কাউকেই জিজ্ঞেস করিনি, যদি কেউ বোকা ভাবে। তাই মনের ভাবনা মনের খুপরিতেই লুকিয়ে রাখি। কলতলায় অন্যরকম মজায় মেতে উঠতাম, বিশেষ করে সকালের দিকটায়। তখন অন্য কোনো খেলার চাপ থাকতো না। সময়টা হালকা হালকা লাগতো। এই হালকা সময়েই পাখা মেলতাম মনের। পাড়ার অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানোর সাধ জাগলেও সাধ্যের কপাট বরাবরই থাকতো বন্ধ। কারণ আম্মা আব্বার শাসন, বারণ। কারণও ছিলো। যদি পথ হারাই। নতুন জায়গা এখনো ভালোভাবে চেনা জানা হয়ে উঠেনি ঠাকুরপাড়া। তাই ভাবনা এসে ভিড় করতো। যে জন্যে কলতলা পর্যন্তই চলাফেরার সীমা। আমিও এ পর্যন্ত এসেই ডাইনে বায়ে তাকাই। কিন্তু পা আর বাড়তে চায় না। ভয়রা নড়েচড়ে উঠে। আম্মার বারণ আব্বার বারণ কানের ভিতর বাজতে থাকে। শোঁ শোঁ।
কলতলার কতকটা তফাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি আর ইউসুফ। আমার বয়সি একটি মেয়ে পানি ধরছিল কলসিতে। পাশে অপেক্ষায় আরো দু’তিনজন। এমন দৃশ্য প্রায় প্রতি দিনকার। পানিতে কলসটি ভরভর অবস্থা। অন্যরা তৈরী হচ্ছে যার যার কলস-বালতি নিয়ে। ঠিক সে সময় ইউসুফ বেশ নিচুস্বরে বলল ত্ইু ঐ কলটি ছুঁতে পারবি! কেনো! না পারার কি আছে? এতে তো আর ওর পানি নষ্ট হবে না। থেমেও যাবে না পানির স্রোত। ইউসুফ বলল ধরনা দেখি। আমিও ভাবনা-চিন্তা না করেই ভিড় ঠেলে কলের মাঝখানটায় মুঠু করে ধরলাম। আর যায় কোথায়। ওরা সবায় তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো। আমি তো অবাক। মেয়েটি তার ভরা কলসি কলতলায় ঢেলে দিলো, আর গালাগাল দিতে থাকলো। জবাবে আমি শুধু বললাম আমি কি তোমার পানিতে হাত দিয়েছি? কে শোনে কার কথা। ওরা আমাকে কলতলা থেকে সরিয়ে দিলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই মেয়েগুলো এমনটা করল কেন ভাবছিলাম। ইউসুফকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল ওরা নাকি এমনটাই করে। তবে শ্যামলরা যদি কল বা কলসি স্পর্শ করে তখন কিন্তু হৈ চৈ করে না। আমার খুব জিদ চাপল। আরো দুতিন কল ছুঁয়ে দিলাম, কলস ছুঁয়ে দিলাম। ইউসুফ আমাকে বারণ করেছিল। আমি তার কথা আমলে নিইনি। মনে মনে ভাবলাম এটি কি ধরনের অসভ্যতা। মন এতোটা নিচু হবে কেন? আমাদের কল বা পানির পাত্রে শ্যামল, মালতীরা কত ধরেছে কই আমি বা ইউসুফ তো এমন আজব কান্ড ঘটাইনি।

তেরো.
কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন মোহাম্মদ আলী ভাই। আমার কাছে তেমনটাই মনে হতো। ভাবনার গলিপথে হাঁটতো এ রকমেরই ছায়া ছায়া একটি কায়া। সে কায়া মায়া হয়ে লটকে থাকে চোখে, বুকের ভিতরে। তাই ঠাকুরপাড়ার দুপুরটা কাটে অনেকটা একা একা। ঢাকায় থাকতো মোহাম্মদ আলী ভাই। থাকতো বানরের দৌড়ঝাপ। কিন্তু ঠাকুরপাড়ায় আমি একা। কোনো কোনো দিন থাকে ইউসুফ। কলতলায় জটলাহীন। সুনশান। কলের মুখ ভিজবে সেই বিকাল, আসি আসি সময়। ঘড়ির কাটা তিন কি চারের মাথা ছুৃঁই ছুঁই করে। তাই লোকজনের ভিড়ভাড়ও কম। নাই বললেই চলে। বেশির ভাগ সময় আমাদের বারান্দায়ই জমে আড্ডা। এখানে বসলেই ঠাকুরপাড়ার অনেকটা এলাকাই ধরা পড়ে চোখে। তাছাড়া আম্মার আদেশও তেমনটাই। যে কারণে কলতলা আর বাসা, এই পর্যন্তই ঘুরাঘুরির সীমা। যদিও একটু আধটু সীমা পার হলেও তেমন চোখ রাঙ্গানি আসে না। এরি মধ্যে ঠাকুরপাড়ার অলি-গলিতে পায়ের ছাপ পড়ে গেছে। দোস্ত-বন্ধুর সংখ্যাও আঙ্গুলে গোনা যায় এমনটা আর নাই। আম্মা স্বস্তিতে থাকেন। সময় অসময়ে ডাক পড়ে না। কলতলার বিষয়টা হরহামেশাই বিরক্তির ঘরে ঢুকে পড়ে। মেজাজটা তখন উলটপালট হয়ে যায়। এ নিয়ে আব্বার সাথেও কথা বলেছি, আম্মার সাথেও। তারা দুজনেই বললেন ওরা এমনটাই করে। যখন বিষয়টা ভালোভাবে নেয় না, কি দরকার এসব ঝুটঝামেলায় যাবার? ওরা চেঁচামিচি করলেও তুমি করবে না। বুঝিয়ে বলবে এমন করা সভ্য মানুষের কাজ নয়। আব্বা-আম্মার নসিহতে আমার জেদের আগুনটা কিন্তু একেবারে নিভে যায়নি। তুষের আগুনের মতোই ঘুষঘুষে জ¦লতেই থাকলেঅ। মূর্খ আর কাকে বলে। ছোঁয়া লাগলেই ‘জাতের’ সর্বনাশ! মোহাম্মদ আলী ভাই উপস্থিত থাকলে কি করতেন কে জানে।
এরি মধ্যে ইউসুফ পাঠশালায় যাওয়া আসা শুরু করে দিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পাঠশালার গল্প শোনায়। স্যারদের গল্প। পাঠশালার বন্ধুদের গল্প আরো কত কি। ভিতরে ভিতরে আমি জেগে উঠি। পাঠশালায় যাবার আবদার জানাই আব্বা-আম্মার কাছে। আমি যে অনেক বড় হয়ে গেছি সে খবরটি জানাতেও ভুল করি না। আব্বা-আম্মার চেহারায় ফুর্তির টগর ঝুর ঝুর তখন। আমার বুকের খাঁচায়ও পাঠশালা নামের আনন্দের হাওয়া। ডানা ঝাপটা-ঝাপটি করছে। সময় অসময়ের বালাই নাই। আর তর সইছিলো না। পাঠশালাটা দেখেও এলাম চুপিচুপি। সাথে ছিলো ইউসুফ। এরি নামই-কি পাঠশালা! দেখে মন ভরলো না। একদম। লম্বা মতো একটি টিনের ঘর। চারদিকটায় বাঁশের বেড়া। দূর থেকে দেখালো ইউসুফ। পাঠশালার চেহারা সুরতে পুলকের পাপড়িগুলো আলতোভাবে পড়তে থাকলো মাটিতে। যেনো সকালের শিউলি ফুল। মনের কষ্ট মনের ঘরেই আটকে রাখলাম।

চৌদ্দ.
প্রতি রোববার আব্বা অফিস কামাই করেন। বাইরে কোনো কাজ না থাকলে ঘরেই সময় কাটান। সাপ্তাহের এই দিনটিতে অফিস-আদালত বন্ধ থাকে। দোকানপাটও বন্ধ, কোনো কোনো এলাকায়। অর্থাৎ রবিবার হলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আব্বারা ঘরে থাকেন। তাই ভয়ের বাতাস এলোমেলো। ভারি ভারি। যখন তখন ঘরের বাইরে যাওয়া হয়ে ওঠে না। অসময় দাঁড়িয়ে থাকে সময়ের অপেক্ষায়। মাঠ-রাস্তা অনেকটা ফাঁকা ফাঁকা। খেলাধুলা তো সেই আসরের পর। সাপ্তাহের এই একদিনই গোসলে যান জোহরের আগে আব্বা। সে দিন আমিও থাকি সাথে। পুকুরটি একেবারেই কাছে। অবশ্য একে পুকুর না বলে দিঘী বললেই সঠিক হবে। কারণ আয়তনে বিশাল। এমন বিশাল বিশাল দিঘী আছে আরো অনেক, আব্বার কাছে শুনেছি। এজন্যেই নাকি কুমিল্লাকে বলা হয় দিঘীর শহর। এরি মধ্যে শানবাঁধানো ঘাটলার আড্ডাটা বেশ জমে ওঠে। সে আড্ডায় আব্বাও যোগ দেন তার পরিচিতজনদের সাথে। বিকালের দিকটায়তো প্রতিদিনই জম্পেশ আড্ডা, ঘাটলায়। তবে ছোটদের আসতে মানা। সব আব্বা-আম্মারা এ বিষয়টা নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকেন। তাই এ ব্যাপারে কড়া নজর। কিছুদিন আগেও নাকি উত্তরপাড়ে এক বালককে গিলে খেয়েছে এই দিঘী। এমনটা প্রায় ঘটছে আজকাল। যে জন্যে এত সাবধানতা, শতর্কতা।
এ দিঘীতেই সাঁতারের মশক করি। আব্বা আমার বুকের তলায় হাত রাখতেন। আমি আব্বার হাতের তালুতে ভর রেখে পানিতে হাত-পা ঝাপটাতাম। কোনো কোনো দিন ঘাটলার সিঁড়িতে হাত দিয়ে পানিতে শরীর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। এভাবে চলল কিছু দিন। ভয় কেটে গেলো। সহজ হয়ে গেলো সাঁতারের কলা-কৌশল। এ জন্যে আব্বারও খুব আনন্দ। আনন্দের খবর বাসায় ফিরে আম্মাকেও শোনান। আম্মার কিন্তু ভয় কাটে না। আব্বাকে সাবধান করেন বারবার। আব্বা একদিন আমার বুকের তলা থেকে তার হাতটি সরিয়ে নিলেন আচমকা। আমাকে তখন অনেকগুলো ভয় চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। নাকে মুখে পানি ঢুকলো। এই যখন অবস্থা আব্বা আমাকে আবার পানির উপর তুলে ধরলেন। এরকম ডুবসাঁতার চললো কয়েক দিন। আমি তো অবাক। আব্বার সাহায্য ছাড়াই শরীর ভাসিয়ে রাখতে পারি। এখান থেকে ওখানে যেতেও পারি। তখন আব্বার চোখে ঝরছে হিজল ফুল, টপ টপ পানিতে। ঠাকুরপাড়ার দিঘীতে প্রথম সাঁতার শেখা, পানির সাথে দোস্তি। একটা ফখর ভাব চোখেমুখে। আনন্দের আকাশে প্রজাপতির ঝাঁক। তারপরও আম্মার সাবধান বাণী, দিঘীর ধারকাছেও ঘেষঁবে না একা একা। আব্বাও আম্মার পাশাপশিই হাঁটলেন। কেনো! আমিতো এখন সাঁতার পারি। আব্বা বললেন সাঁতার জানলেও ছোটদের পুকুর ঘাটে একা যেতে মানা। অই যে তোমার আম্মার ভূত-জিনের ভয়। ওরাও তো বেেস থাকতে পারে ঘাপটি মেরে। বলেই আব্বা হাসলেন আম্মার দিকে তাকিয়ে।
পনের.
পাঠশালা শব্দটি বুকের জেবে লুকিয়ে রাখলাম। আগ্রহে ভাটার টান। বইপত্রের দিকেও তেমন নজর নাই। কেবল খেলার মাঠ আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা। সূর্য উঠছে পুবে, ডুবছে পশ্চিমে। সময়ের দোলনায় বাতাসের ঘুমপারানি গান। এই গান শুনতে শুনতেই হাঁটছি অনেকটা, শব্দহীন। আমার এই বদলে যাওয়া আম্মার চোখে আটকে গেলো। আব্বারও বিষয়টি নজর এড়ায়নি। আব্বা হয়েতো ভেবেছিলেন পাঠশালায় ভর্তির ব্যাপারে দেরি হচ্ছে, তাই রাগরাগ ভাবটা এভাবে প্রকাশ করছি আমি। আসলে তো তেমন কিছুই না। পাঠশালার চেহারা সুরতই পছন্দ হয়নি আমার। দুঃখটা ছিলো সে জায়গায়। আব্বা-আম্মা কিছুই বুঝতে দিলেন না আমাকে। আচমকা একদিন বলে বসলেন আমরা কিন্তু আগামীকাল পাঠশালায় যাচ্ছি। তুমি ভর্তি হবে। আমার আনন্দ বা উচ্ছাস কোনটাই মেঝেতে লাফিয়ে পড়লো না। বিশাল নিরবতা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকলো। এতে করে আব্বা-আম্মা দুজনেই অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন, পলকহীন। আমি অনেকটা চুপচাপ। আমার এরকম হালত দেখে দুজনেই হতভম্ব। যে পাঠশালা শব্দটি আমার ঠোঁটে লাফাত সকাল সন্ধ্যা, সেখানে ব্যারাম-ব্যাধি। নড়াচড়া নাই। এরি মধ্যে আব্বা-আম্মার নানান ধরনের প্রশ্নের তীর আমার চোখ-শরীর ঝাজরা করে দিলো। মাথানিচু করে বললাম এ পাঠশালা পছন্দ হয়নি। পছন্দ হয়নি কেন? আব্বা জানতে চাইলেন। এটা কোনো পাঠশালা হলো নাকি! একটা লম্বা টিনের ঘর। তাও আবার বাঁশের দেয়াল। কিছুটা হতাশা মাখা স্বরেই জানালাম। ও এই বুঝি কান্ড! প্রাইমারী পাঠশালাগুলো এরকমেরই হয়। তাছাড়া কদিন পরেই দেখবে এই পাঠশালাটাই তোমার কাছে কতো আপন হয়ে গেছে। আব্বার এ কথাগুলো আমাকে আবার উৎসাহী করে তুললো। চোখে আনন্দের ঝিলিক।
পাঠশালাটা ছিল বাসার অতি কাছে। নাম যে কি ছিল ভুলে গেছি। ঠাকুরপাড়া পাঠশালা হবে হয়তো। ভর্তি হয়ে গেলাম। এখন আমি স্কুলছাত্র। পাঠশালার পাঠক। একটা আলাদা গরিমা চারপাশে ঘুরঘুর করে। স্কুলে যাওয়া আসা চলছে। দু’একদিন যেতে আসতেই বন্ধু-বান্ধব জুটে গেলো। আমি ইউসুফ অমর, উদয়ন আর একটি মেয়েও ছিল মীনা নামের। আমরা সবাই কাছাকাছি বাসায় থাকি। তাই দলবেঁধে আসি দলবেঁধে যাই। এই আসা যাওয়াতে আনন্দের ঘুংঘুর বাজে। লেপটে থাকে কামিনি ফুল। সারা স্কুল জুড়েই ছাত্র-ছাত্রীর হৈ-হুল্লুড়। বেড়া বা দেয়াল নাই কোথাও। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী সব একসাথে ক্লাশ হয়। মাঝখানে লম্বা ব্যাঞ্চ দিয়ে শ্রেণীগুলো আলাদা করা। স্যাররা যখন পাড়ানো শুরু করতেন তখন আওয়াজ আছড়ে পড়তো ঘরময়। এই হৈ-চৈয়ের মধ্যেই আমরা ক্লাশ করতাম। মোটামুটি অন্য পাঠশালাগুলোর চেহারাও ছিল কতকটা একই ধরনের। ক্লাশের আগে এবং পরে স্যাররা বসতেন ঘরের কোনা মতো জায়গায়। মাঝবরাবরও বসতেন অনেক স্কুলে। তাই নজরের বাইরে যেত না ছাত্রদের উঠ-বস। কোনো প্রকার বাঁদরামি নজরে আসলেই শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। লকলকে বেত লাফাতো পিঠে বা হাতের তালুতে। বেতের ভয়ে ক্লাশে পাকা বাঁদরও হরিণ শাবক হয়ে থাকতো। যত দুষ্টামী ক্লাশের বাইরে। এরপরও স্যারদের ভয় তাড়া করতো।
সূর্যটা মাথার তালুতে আসতে না আসতেই ক্লাশ ভাংতো। ঘন্টি বাজার শব্দ কানে পড়ার আগেই আমরা লাফিয়ে পড়তাম দরজার বাইরে। একটা হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড বেঁধে যেতো। এমনি করে স্কুলজীবন হাঁটছে আগে। বাংলা ইংরেজি আর ধারাপাত বই এখন সঙ্গী। কি বাসা কি স্কুলে। এখন বেশীর ভাগ সময় কাটে বই-খাতা আর স্কুলের বেঞ্চির সাথে। বাসার লাগুয়া মাঠের জাম্বুরা ফুটবল তো আছেই। এভাবেই যাচ্ছে রাত, আসছে প্রভাত। বাসা থেকে একটু তফাতে ছিল আর একটি মাঠ। এ মাঠটি থেকে কিছুৃটা বড়। ঘুম থেকে জেগেই দেখতাম মাঠের মাঝ বরাবর দুটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য কিছুটা উপরে উঠতেই বাস দুটি কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যেতো। একদিন দেখি সেখানে বাসটাস কিছু নাই। বাসের বদলে মানুষজনের জটলা। দু-একদিনের মধ্যে সেখানে একটা বড়সর ঘর তৈরি হয়ে গেলো। তবে সে ঘরের চারপাশটাই খোলা। বেড়াটেরা নাই। ইউসুফকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে কি হবে রে! সে জানাল পূজা হবে। প্রতি বছরেই এ সময়টায় এ মাঠে পূজা হয়। অমররা বলে দূর্গা পূজা। দেখিস খুব মজা হবে, পূজার দিন। সেই ঘরে মাটি দিয়ে পুরুষ মহিলা বাঘসহ আরো কি কি যেন তৈরি করল কয়েক জনে মিলে। প্রতিদিন দেখতে যাই সেখানে। স্কুল শেষে ইউসুফ আমাকে ডেকে নিয়ে যেতো। এক অন্য রকম খুশি আমাকে পেয়ে বসলো। রাত জেগে এরা মাটির পুতুলগুলো তৈরি করে। ইউসুফ জানালো এগুল নাকি মূর্তি। আর উদয়ন অমররা বলে প্রতিমা।
সপ্তাখানেকের মধ্যে তৈরি শেষ। রং-কাপড় দিয়ে সাজানো হলো। বেশ সুন্দর। এই সুন্দর দেখতে প্রতিদিন যাই সেখানে। সাথে থাকে ইউসুফ। আর একটা আকর্ষণ ছিল মিঠাই-মন্ডা। গান-বাদ্য তো আছেই। বলতে গেলে রোজ মিঠাই-মন্ডা খাই। উদয়নরা থাকলে বেশি বেশি পাওয়া যায়। একদিন কিছু মিঠাই আর বাতাসা বাসায় নিয়ে এলাম। আম্মাকে দিলাম। আম্মা জানতে চাইলেন এগুলো কোথায় পেয়েছি। রাখঢাক না করে সোজাসাপটা বলে দিলাম কেন? অই যে পূজা হচ্ছে ওখানে গেলেই ওরা মিষ্টি খেতে দেয়। আমি আর ইউসুফ তো রোজ খাই। এ কথা শুনে আম্মার চোখে কারা যেন আলতার শিশি ঢেলে দিয়েছে মনে হলো। চেহারাটাও বদলে গেলো আচানক। বললাম কেন। ওরাতো খুব ভালো মিষ্টি দেয়, খুব মজার। কতো মানুষে খায়। যত মানুষে খায় খাক কিন্তু তুমি খাবে না বলেই আমার আনা মিষ্টিগুলো বাইরে ফেলে দিলেন। পূজা দেখতে যাও তবে সেখানকার কিছু খাবে না। কেন খাওয়া যাবে না এ প্রশ্নের জবাব আরো কিছুদিন পর জানতে পারবে। তুমি যখন বড় হবে। অনেক বইপত্র পড়বে। বড় ক্লাশে উঠবে। এই বলে আমাকে আদর করে বললেন তোমার আব্বাকে আজই বলব মিষ্টি আনতে। আমরা রাতেই দৈ খাব, মিষ্টি খাবো।..
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

