সময় প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ক্ষমতাসীন সরকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাশকতার তথ্য সংগ্রহ এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু সেই গোয়েন্দা তথ্য যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন দেখা দেয়- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে এবং সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথাও উল্লেখ করেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পক্ষে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের নথি কিংবা আদালতে উপস্থাপনযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়েছে কি না এবং তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার উপায়টা কি?
কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেই সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। জামায়াতের নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকারের ব্যর্থতা ও অনিয়মের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো হচ্ছে। দলটির নেতারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন তৎপরতা চলার অভিযোগ থাকলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকে সেসব শনাক্ত করতে পারছে কি না।
অন্যদিকে, বিএনপি নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সমন্বয়ের বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য থাকতে পারে। তাঁদের মতে, যদি অর্থায়ন কিংবা নাশকতার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা উচিত। এখানে দুই পক্ষের বক্তব্যই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেওয়া। কোন অভিযোগ কতটা সত্য, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের প্রকাশ্য যাচাই।
বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে বিরোধী দল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারের গোয়েন্দা তথ্য প্রয়োজন। তবে সেই তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অপরিহার্য।
প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) ভূমিকার প্রসঙ্গও এসেছে। একজন সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, এনএসআইয়ের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকলেও বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারপ্রধান যখন জনসমক্ষে গোয়েন্দা তথ্যের উৎস প্রকাশ করেন, তখন ভবিষ্যতে গোয়েন্দা সংস্থার কাজের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার একটি সংবেদনশীল বিষয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখা প্রয়োজন হতে পারে। আবার সরকারের কোনো দাবি যদি নাগরিকের অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিংবা বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে, তাহলে সেই দাবির জবাবদিহিও জরুরি। এখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তি কী? কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের যোগাযোগ বা অর্থায়নের অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য কি নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, অভিযোগের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? অপরাধের প্রমাণ থাকলে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে অভিযোগ তুলে বিষয়টি শেষ করে দেওয়া হলে জনমনে সন্দেহ থেকেই যায়।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান কাজ তথ্য সংগ্রহ, নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা। রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে জনমত তৈরি করা কিংবা বিরোধী দলের বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা তাদের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত নয়।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বা সমঝোতা থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ প্রমাণ করে না। কোনো যোগাযোগের সঙ্গে নাশকতা, অবৈধ অর্থায়ন বা অন্য কোনো অপরাধের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাই গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে- গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য কি কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি তা রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠছে?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি নেই। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সেই তথ্যের ব্যবহার, নিরপেক্ষতা এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যে তার প্রয়োগ।
তবে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের সত্যতা কিংবা বর্তমান সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না- এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। গণতন্ত্রের স্বার্থে গোয়েন্দা সংস্থা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার না হয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
(বিবিসি বাংলার মুকিমুল আহসানের প্রতিবেদন এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা, রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, নজরদারির সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা)

