মরিয়ম সুলতানা বিবিসি
মানুষের প্রায় সব দাঁত কৈশোরের মাঝেই উঠে যায়। তবে মুখের একেবারে পেছনের কয়েকটি দাঁত ওঠে সবার শেষে, সাধারণত যখন একজন মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে। বয়সের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি ও বিচারবোধ পরিণত হয়, এমন ধারণা থেকেই বাংলায় এই দাঁতের প্রচলিত নাম ‘আক্কেল দাঁত’। আক্কেল শব্দের অর্থ বুদ্ধি বা বিচারবোধ।
একই কারণে ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘উইজডম টুথ’। আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘থার্ড মোলার’ দাঁত বা তৃতীয় পেষণ দাঁত। দাঁতের সারিতে এটি তৃতীয় মোলার বলেই এমন নাম। যদিও এই আক্কেল দাঁত সবার ওঠে না। যাদের ওঠে, তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে কোনো সমস্যাই হয় না, আবার কারও জন্য এটি হয়ে ওঠে ব্যথা ও ভোগান্তির কারণ।
কিন্তু আক্কেল দাঁত এত দেরিতে ওঠে কেন? দাঁতটি ওঠার সময় ব্যথাই বা হয় কেন? কত বয়স পর্যন্ত এটি উঠতে পারে এবং ব্যথা হলে কি দাঁত তুলে ফেলাই একমাত্র সমাধান?
আক্কেল দাঁত ওঠার সঠিক বয়স
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত ৩২টি দাঁত থাকে। এর মধ্যে মুখের ওপরের ও নিচের চোয়ালের দুই পাশে একেবারে শেষে প্রতিটি কোণায় একটি করে মোট চারটি আক্কেল দাঁত থাকতে পারে। তবে সবার চারটি আক্কেল দাঁতই থাকে না। কারও একটি, দুটি বা তিনটি থাকতে পারে, আবার কারও একটিও না থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ১৭ থেকে ২১ বছর বয়সের মধ্যে আক্কেল দাঁত উঠতে শুরু করে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস বলছে, সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মাঝে এই দাঁত ওঠে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে গেলেই আর আক্কেল দাঁত উঠবে না। কারও ক্ষেত্রে আরও পরে আক্কেল দাঁত বের হতে পারে।
আমাদের আক্কেল দাঁত কেন থাকে?
আক্কেল দাঁত যদি মাড়ির সঠিক অবস্থানে উঠে, তাহলে তা মুখের পেছনের অংশে সমর্থন দিতে পারে এবং চোয়ালের হাড় সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে, আক্কেল দাঁতের আসলে খুব একটা প্রয়োজন নেই। বরং অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এগুলোকে অবশিষ্টাঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ, একসময় এগুলোর একটি নির্দিষ্ট কাজ ছিল, কিন্তু এখন আর তা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের আদিম খাদ্যতালিকায় প্রচুর কাঁচা উদ্ভিদ, শক্ত বাদাম এবং শক্ত ও আঁশযুক্ত মাংস ছিল। এসব খাবার চিবিয়ে হজমের উপযোগী করতে আক্কেল দাঁত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
বর্তমানে আধুনিক খাদ্য প্রস্তুতপ্রণালি এবং খাওয়ার বিভিন্ন উপকরণ আক্কেল দাঁতের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই দূর করে দিয়েছে। খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে আমাদের দেহেও কিছু ছোটখাটো বিবর্তনগত পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের চোয়াল আগের তুলনায় ছোট হয়ে গেছে। এ কারণেই অনেকের মুখে আক্কেল দাঁত ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।
সাধারণত মানুষের চারটি আক্কেল দাঁত থাকে, কিন্তু সবকটি সবসময় ওঠে না। প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় আট জনের ক্ষেত্রেই অন্তত একটি দাঁত ওঠে না। তবে কোনো আক্কেল দাঁত না ওঠা কিংবা চারটিই ওঠা—এ সবই স্বাভাবিক অবস্থার ভিন্ন ভিন্ন রূপ।
আক্কেল দাঁত উঠলে ব্যথা হয় কেন?
আক্কেল দাঁত অন্য দাঁতের মতো স্বাভাবিকভাবে এবং পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে উঠলে সাধারণত সমস্যা হয় না। তবে এই দাঁত ওঠার সময় সামান্য অস্বস্তিও হতে পারে। আক্কেল দাঁত মূল সমস্যা তৈরি করে মূলত জায়গার অভাবে।
এই দাঁত মাড়ির একেবারে শেষে ওঠে। সেখানে দাঁতটির স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে সেটি পাশের দাঁতের দিকে হেলে যেতে পারে অথবা মাড়ি কিংবা চোয়ালের হাড়ের মধ্যে আংশিক বা পুরোপুরি আটকে থাকতে পারে। এমন দাঁতকে বলা হয় ‘ইমপ্যাক্টেড উইজডম টুথ’ বা আটকে থাকা আক্কেল দাঁত।
আংশিক বের হওয়া দাঁতের ওপর মাড়ির একটি অংশ থেকে গেলে সেখানে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে। এতে দাঁতের চারপাশের মাড়িতে প্রদাহ বা সংক্রমণ হতে পারে, যাকে বলে ‘পেরিকোরোনাইটিস’। এমনকি এতে করে দাঁত ক্ষয়ও হতে পারে।
আংশিক বের হওয়া দাঁতের আশপাশ পরিষ্কার করা কঠিন হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্কেল দাঁতের চারপাশে তরল জমে সিস্ট কিংবা অ্যাবসেস বা পুঁজ জমে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিক বলছে, ইমপ্যাক্টেড দাঁত পাশের দাঁতের ক্ষতিও করতে পারে। এ অবস্থায় ব্যথার পাশাপাশি মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখ খুলতে বা চিবোতে অসুবিধা হয়। কিন্তু যদি আক্কেল দাঁত সঠিকভাবে ওঠে, তাহলে তা খাবার চিবোতে সাহায্য করে।
মানুষের প্রতি চেয়ালে সাধারণত তিনটি করে মোলার বা পেষণ দাঁত থাকে। সামনে থেকে পেছনের দিকে এগুলো হলো প্রথম মোলার, এরপর দ্বিতীয় মোলার এবং তৃতীয় মোলার। একেবারে শেষে থাকা তৃতীয় মোলারটিই হলো উইসডম টিথ বা আক্কেল দাঁত।
অনেকসময় বাইরে থেকে দাঁতটি দেখা না গেলেও এক্স-রেতে এর অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
ব্যথা হলে কী করবেন, দাঁত কি তুলতেই হবে?
আক্কেল দাঁতে ব্যথা হলেই সেটি তুলে ফেলতে হবে, এমন নয়। এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, আক্কেল দাঁত কোনো সমস্যা তৈরি না করলে সাধারণত সেটি তুলে ফেলা হয় না। বরং, নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের মাধ্যমে দাঁতটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তবে বারবার মাড়িতে সংক্রমণ, তীব্র ব্যথা, দাঁত ক্ষয়, পাশের দাঁতের ক্ষতি, সিস্ট বা অ্যাবসেসের মতো সমস্যা হলে চিকিৎসক দাঁতটি তুলে ফেলার পরামর্শ দিতে পারেন। সাধারণত দাঁত তোলার আগে মাড়িতে লোকাল অ্যানেসথেটিক ইনজেকশন দিয়ে জায়গাটি অবশ করে দেওয়া হয়, যাতে দাঁত তোলার সময় ব্যথা না লাগে।
রোগীকে স্বস্তিতে রাখতে সেডেশন দেওয়া হতে পারে। আবার দাঁত তোলা জটিল হলে বা রোগী খুব উদ্বিগ্ন থাকলে জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়, যাতে তিনি ঘুমিয়ে থাকেন।
আক্কেল দাঁত তোলার মূল ধাপগুলো হলো:
দাঁতটি মাড়ি দিয়ে ঢাকা থাকলে চিকিৎসক প্রথমে মাড়িতে ছোট করে কাটেন। এরপর দাঁতটি যে গর্তের মধ্যে রয়েছে, সেটি প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশস্ত করেন। দাঁতটি এক টুকরোয় বের করা হয়। প্রয়োজন হলে দুই বা তিন টুকরো করে বের করা হতে পারে।সবশেষে মাড়িতে এমন সেলাই দেওয়া হয়, যা পরে নিজে থেকেই মিশে যায়।
সাধারণত পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয় এবং এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, আক্কেল দাঁত তুলতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী একই দিনে বাড়ি ফিরতে পারেন। তবে জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হলে কখনও হাসপাতালে এক রাত থাকতে হতে পারে।
দাঁত তোলার পর সেরে উঠতে কতদিন লাগে
সাধারণত আক্কেল দাঁত তোলার পরদিন থেকেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফেরা যায়। তবে দাঁত তোলার প্রক্রিয়া জটিল হলে বা জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হলে এক থেকে তিন দিন কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, বলছে এনএইচএস।
এমনিতে দাঁত তোলার পর দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কিছু সমস্যা থাকতে পারে। যেমন– সাধারণত কিছুটা ব্যথা ও ফোলা থাকে, যা এক বা দুই দিন পর থেকে কমতে শুরু করে, গালে কালশিটে দাগ দেখা দিতে পারে, চোয়ালে ব্যথা ও শক্তভাব থাকতে পারে, খাবার চিবানো ও গিলতে অস্বস্তি হতে পারে।
সেলাই দেওয়া হয়ে থাকলে সাধারণত তা নিজে থেকেই মিশে যায়। আর দাঁত তোলার পর ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট হয়ে থাকে। এটি মূলত ক্ষতটি সেরে উঠতে সাহায্য করে। দাঁত তোলার পর প্রথম কয়েক দিন দ্রুত ও ভালোভাবে সেরে ওঠার জন্য কী করা উচিত, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছে এনএইচএস।
আক্কেল দাঁত তোলার পর যা করবেন–
ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবে চিবাতে স্বস্তি না আসা পর্যন্ত নরম বা তরল খাবার খাওয়া ভালো। মাউথওয়াশ বা কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে আলতোভাবে কুলি করে ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে। অন্য দাঁতগুলো সাবধানে পরিষ্কার করতে হবে, তবে ক্ষতস্থান এড়িয়ে চলতে হবে, যাতে সেলাই বা ক্ষতের ওপর তৈরি হওয়া ব্লাড ক্লট নষ্ট না হয়। রক্তপাত হলে পরিষ্কার কাপড় বা তুলা দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট জায়গাটি চেপে ধরতে হবে।
যা এড়িয়ে চলবেন–
জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা এবং সেডেটিভ ইনজেকশনের পর ২৪ ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে না। শক্ত বা মচমচে খাবার এবং বাদাম বা বীজের মতো ক্ষতস্থানে আটকে যেতে পারে এমন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ধূমপান করা উচিত নয়, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আক্কেল দাঁত তোলা সহজ প্রক্রিয়া হলেও কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন–
ড্রাই সকেট: দাঁত তোলার পর যে গর্ত বা সকেট তৈরি হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধার কথা। সেটি ঠিকভাবে তৈরি না হলে বা মাড়ির ক্ষত সেরে ওঠার আগেই জমাট রক্ত সরে গেলে তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে, যাকে ‘ড্রাই সকেট’ বলা হয়।
সংক্রমণ: ক্ষতস্থানে সংক্রমণ হতে পারে। এর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের লাগতে পারে।
স্নায়ুর ক্ষতি: দাঁতের কাছাকাছি থাকা স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে জিহ্বা, ঠোঁট বা থুতনিতে অসাড়তা কিংবা ঝিনঝিন অনুভূতি হতে পারে। সাধারণত এটি ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়, তবে কখনও কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।

