ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘বোমা মারতে পারেন’- এমন মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি। তাঁর কোর্সগুলোও অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একটি মাস্টার্স ক্লাসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করা হয় এবং তাঁকে পেছনে গিয়ে বসতে বলা হয়। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে সামনে বসে থাকতে দেখে শিক্ষক ‘অস্বস্তি’ ও ‘নিরাপত্তাহীনতা’ বোধ করছেন বলে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। পরে তিনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার দাবি, নিকাব ও হিজাব নিয়ে এর আগেও ওই শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং নিকাব খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মল্লিকার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে নিকাব পরার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে তিনি শিক্ষককে পরিচয়পত্র দেখাতেও প্রস্তুত ছিলেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সহপাঠী রাইসা মণি সুমি অভিযোগ করেন, পোশাক ও ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে আলোচনা একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর দাবি, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং ‘বোমা মারতে পারেন’- এমন মন্তব্যও করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ওই শিক্ষকের বাকবিতণ্ডা হলে কয়েকজন ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান এবং পরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করেন বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জানান। বৃহস্পতিবার তাঁদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তাসনিম সিরাজ মাহবুবের কোর্সগুলো পুনর্বণ্টন করে অন্য শিক্ষকদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা বৃহস্পতিবার প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

ঘটনাটি নিয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বোরকা-নিকাবের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে অপমান, হেয় করা বা তাঁর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো আচরণ ক্যাম্পাসে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি দাড়ি, টুপি, নিকাব ও পর্দার মতো ধর্মীয় অনুশীলনের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষের বিরোধিতা করেছেন।
সাদিক কায়েমের বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভিন্নমত ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান, মানবিক মর্যাদা ও একাডেমিক সমতার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনায় ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে। একই সঙ্গে নিকাব, হিজাবসহ ধর্মীয় পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

