চব্বিশ.
সূর্য কিছুটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। নৌকা তার পিঠ ঠেকাল ঘাটে। ভৈরব পুলের শেষ পিলারের কাছাকাছি। সেখান থেকে একটু হাঁটলেই আশুগঞ্জ রেলস্টেশন। আমরা যখন স্টেশন এসে পৌঁছলাম তখন ঘন্টা বাজছে। আব্বা বললেন গাড়ি আসছে বলে। একটু বাদেই গাড়ির মাথা বেরিয়ে এলো পুলের ফাঁক গড়িয়ে। বাঁশি বাজছে বারবার। ঝিকঝিক আওয়াজ। মাথা ফুড়ে উড়ছে ধুয়া, কখনো কালো কখনো ফিকে।
আমরা সব তৈরি হয়ে থাকলাম। জায়গা মতো এসে দাঁড়িয়ে গেলো গাড়ি। সেই আগের মতো ইঞ্জিনের তলায় জ্বলছে আগুন। উপরে ফোস ফোস আওয়াজ। সাথে ধুয়া ভাসছে বাতাসে। এরি মধ্যে গাড়িতে উঠে বসলাম আমরা। বাক্স পোটলা সব উঠানো হলো আব্বা ও মামার কামরায়। নানা-নানিরা চাল, বাদাম, মাসকলাই সহ নানান কিসিমের পিঠা আরো কি কি যেন দিয়েছেন।
আমি আর আম্মা অন্য কামরায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ি শব্দ করে আওয়াজ করলো। তারপর ঝিক ঝিক শব্দ করে চলতে শুরু করলো। নজরের বাইরে চলে যাচ্ছে আশুগঞ্জ, ভৈরবের পুল, মেঘনা নদী। আগানগর তো আগেই দৃষ্টির আড়ালে আবডালে। আগানগরের নাম মনে আসতেই মোচর দিয়ে উঠল বুক। দুঃখের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল চোখে মুখে। আম্মারও একই দশা। গাড়ির আওয়াজের তলায় চাপা পড়ে গেলো আমাদের দুঃখ বেদনা। গাড়ি দৌড়াচ্ছে দ্রুত। পেছনে যাচ্ছে গাছপালা বাড়িঘর। জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি এসব দৃশ্য। আম্মার চেহারায়ও সূর্য উঠছে।
দ্রুত থেকে দ্রুত হচ্ছে গাড়ির দৌড়াদৌড়ি। দুলুনি বাড়ছে, সাথে ঝিকঝিক আওয়াজও। আমার চোখের পাতাও উঠছে নামছে। প্রজাপতির ডানার মতো। আম্মা বুঝলেন ঘুমপরীদের পাল্লায় পড়েছি আমি। ঝাপসা হয়ে আসছে চোখ। আম্মা তার পাশেই শুইয়ে দিলেন আমাকে।
আমাদের কামড়ায় তেমন কোনো যাত্রী ছিল না। প্রায় খালি খালি। জনা চারেক মহিলা, কাচ্চাবাচ্চা আাছে সাথে, আমার বয়সি দুজন। ওরা দৌড়ঝাপ করছে। অন্যগুলো শুধু কান্নাকাটিতে ব্যস্ত। আমার বিরক্ত লাগছিল। আম্মা বললেন ছোটরা অমনি করে। এরিমধ্যে চোখের পাতাগুলো ভারি ভারি হয়ে উঠলো। কারা যেনো চাপ দিচ্ছে। ঘুমপরীদের উমের ডানা আমার দৃষ্টিকে আড়াল করে দিলো। গাড়ির ঝিকঝিক শব্দে আম্মার চেহারা, বাইরের গাছ গ্রাম সব যেন কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে। কত সময় ঘুমে ছিলাম কে জানে।

গাড়ির বিকট চিৎকারে চোখের কপাট আলগা হয়ে গেল। আম্মা বললেন ওঠো আমরা আখাউড়ায় এসে গেছি। দেখলাম গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি আরো কয়েকটি গাড়ি থেমে আছে। ওগুলোও কি কুমিল্লা যাচ্ছে! জিজ্ঞেস করলাম আম্মাকে। আম্মা হু হা করলেন। কিন্তু বলতে পারলেন না, গাড়িগুলো যাবে কোথায়।
বাইরে কোলাহল। চা, কলা, চানাচুর, বাদাম আরো কতকি নিয়ে দৌড়াচ্ছে ফেরিওয়ালা। ততক্ষণে বড়মামা এসে হাজির। আমাদের খবরাখবর নিতে এসেছেন তিনি। মামাকে দেখে আমি হৈ হৈ করে উঠলাম। জানালার শিক তাই মাথা, শরীর কোনোটাই গাড়ির বাইরে গেল না। তাই মামা দরজা বরাবার এসে আমাকে সাবধানে গাড়ি থেকে নামালেন।
আম্মা শুধু বললেন গাড়ি যদি চলতে শুরু করে? মামা বললেন এটি জংশন। গাড়ি আরো কিছু সময় অপেক্ষা করবে। আম্মার অস্থিরতা কাটল। মাামা স্টেশনের দোকান থেকে দুটি বিস্কুটের প্যাকেট কিনলেন। তারপর আম্মার কামড়ায় আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।
এরিমধ্যে গাড়ি দুবার বাঁশি বাজাল। মাামা জানালেন গাড়ি ছাড়লো বুঝি! তোমরা সাবধানে থেকো। কিস্কুটের প্যাকেট দুটি আমার হাতে। একটি আমার জন্য অন্যটি আম্মার। গাড়ি ছুটছে মহিষের মতো। ফোস ফোস আওয়াজে বাতাস ফুটো করে।
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

