আমরা আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেব না, নতুন করে কাউকে ফ্যাসিবাদী হতেও দেব না : এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) লন্ডনে গণমাধ্যমের সাথে এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, আমরা আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেব না, নতুন করে কাউকে ফ্যাসিবাদী হতেও দেব না।

সাংবিধানিক সংকট তৈরির জন্য বিএনপিকে দায়ী করে জামায়াত নেতা বলেন, বিএনপি সংবিধান পুরোপুরি সংস্কার না করে নিজেদের মতো করে সংশোধনের চেষ্টা করছে, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।

ইস্ট লন্ডনের বারাকা ইটারিতে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে কমপক্ষে ১৪ শত মানুষ শহীদ হয়েছেন। বিশ হাজারের বেশি আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। যার মধ্যে ১৩৭ জন হচ্ছেন শিশু এবং অনেক নারিও আছেন। সাড়ে পাঁচশ’র অধিক মানুষ হাত বা চোখ হারিয়েছেন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে এতো বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে চব্বিশের ৫ আগস্ট একটা নতুন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের তীব্র আকাংকা ছিল ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেন আর ফিরে না আসে। বরং রাষ্ট্রে একক কোনো ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত না রেখে রাষ্ট্রপিতর সাথে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভারসাম্য সৃষ্টি করা, জনগণের ভোটের অধিকার এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত করা, গুম, হত্যা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে জড়িত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের পথ পরিক্রমা উল্লখ করে জামায়াত নেতা জুবায়ের বলেন, জনমানুষের মধ্যে একটি নতুন স্বপ্ন জাগ্রত হয়েছে জুলাই গণজাগরণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ তখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে ছিল একতাবদ্ধ। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে ৩৩টি রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপে অংশ নেয়। সেখানে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সংস্কার বিষেয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো একত্রিত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ নামক ঐতিহাসিক সংস্কার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আর এটি যাতে সারা দুনিয়ার মানুষ জানতে পারে সেজন্য তা সরাসরি মিডিয়াতে প্রচার করা হয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান বলেন, রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য ও কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় ধাপে শপথ নেন জামায়াতের নেতারা। কিন্তু বিএনিপি সেটি করেনি। এতে সংকট তৈরী হয়েছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কেউ যাতে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ না পায়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং দুর্নীতি চিরতরে দূর করা ও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়, সে লক্ষ্যে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে ও বাইরের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছ।

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ছয় দফা দাবিতে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার আবারো ফিরে না আসার ব্যাপারে বিরোধী দলের গভীর উদ্বেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, আমরা আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেব না এবং নতুন করে কাউকে ফ্যাসিবাদী হতেও দেব না।

জাতীয় সংকটে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রবাসীদের বহুমাত্রিক অবদান উল্লেখ করে জামায়াত নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন সফল করতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম।

দেশের বাইরে বসবাসকারী প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবিতে জামায়াতের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে এডভোকেট জুবায়ের বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের দাবি প্রথম জামায়াতের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয় এবং তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে তারা কাজ করেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের বক্তব্যে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার যৌক্তিক দাবি ও প্রতিশ্রুতিগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়।

জামায়াতের পক্ষ থেকে জুলাই গণ আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদান, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাদের জীবনী ও স্মৃতি নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ইত্যাদি কার্যক্রম তুলে ধরে জামায়াত নেতা বলেন, যারা স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাদের জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, গুরুতর আহত ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সম্মাননা প্রদান এবং বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া অপিরহার্য।

গণমাধ্যমের সাথে এ মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইউকে ও ইউরোপের প্রধান মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা। এসময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের ইউকে ও ইউরোপের অন্যতম মুখপাত্র ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ও ডক্টর শামসুল আলম গোলাপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *