আজ জুমআ বার (২৩ জানুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান উত্তরবঙ্গের ৮টি জেলা সফরের উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন। বিমানবন্দরের ডোমেস্টিক লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, গতকাল থেকে সারাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ কার্যত চোরাবালিতে নিমজ্জিত ছিল। দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং জাতির কাঁধে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, এটি তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুব সমাজ বেকারত্বে ভুগছে। কর্মক্ষেত্রে এখনও অনেক ক্ষেত্রে কর্মীবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে মা-বোনদের চলাচল ও কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এসব বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রথম বার্তা হলো- জাতির এই সংকটকালে সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, পরস্পরকে আঘাত না করে দেশ গঠনে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে যাওয়া উচিত। জনগণ যাদের মূল্যবান ভোটে নির্বাচিত করবেন, সকলের উচিত তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। নির্বাচনকে ভিন্ন কোনো কায়দায় প্রভাবিত করার সব ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য থেকে বিরত থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো পর্যায়ের কেউ এ ধরনের কাজে জড়িত হওয়া মোটেও সমীচীন নয়।
আমীরে জামায়াত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের ঘাম ঝরানো উপার্জন রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। অথচ তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আন্দোলন ও স্মারকলিপির মাধ্যমে আমরা তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছি। সরকার আমাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন- এজন্য আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। এবার প্রবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের ব্যালট পেপার বিভিন্ন দেশে পাঠানো শুরু হয়েছে। তবে এখনও কিছু স্থানে ব্যালট পেপার পৌঁছায়নি। এর মাঝে আজ শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এবং আগামী শনি ও রবিবার পশ্চিমা দেশগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি। সময় অত্যন্ত সীমিত। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ করছি, যেন ব্যালট পেপার সময়মতো প্রবাসী ভোটারদের হাতে পৌঁছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা দেশে ফেরত আসে। অন্যথায় এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে।
প্রবাসী ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা যাকে পছন্দ করেন, যে দল বা প্রার্থীকে ভালোবাসেন, নিঃসংকোচে তাকে ভোট দিন। একটি ভোটও কোনো আসনের জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। ভোটাধিকার প্রয়োগ শুধু অধিকার নয়, এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা গত ৫৪ বছরের পচে যাওয়া রাজনীতি চান না এবং রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চান, আমরা আশা করি তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করবেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা এককভাবে নির্বাচন করছি না। দেশপ্রেমিক ও ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও আমাদের এই প্রয়াস সামগ্রিক। আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করেছি- আমরা একা নই, সবাই মিলে বাংলাদেশ গড়ব। আমাদের স্লোগান ‘এসো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।’
তিনি আরও বলেন, আজকের এই সফরের মাধ্যমে ঢাকার বাইরে আমাদের কার্যক্রম শুরু হলো। জনগণের পালস বুঝে, তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা আশ্বস্ত করতে চাই যে, দেশবাসীর ভালোবাসা ও সমর্থনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে আমরা অলীক কল্পনা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নয়- যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার আলোকে ইনসাফভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।
যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তোমাদের রক্তের বিনিময়েই আজ ২০২৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়-এ জন্য তোমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
এক প্রশ্নের জবাবে আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সঠিক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলক ভিডিও তৈরি করে তা আমাদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হচ্ছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা জনগণকে কেনার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। যারা নিজেরাই এসব অপকর্মে জড়িত, তারা আমাদের ঘাড়ে দায় চাপানোর অপচেষ্টা করছে। কার্ডের লোভ, ভুয়া প্রতিশ্রুতি বা ১০ টাকা কেজি দরে চাল এবং ভুয়া ফ্ল্যাট দেওয়ার আশ্বাস-এসবই আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। আমরা এসব চোরা পথে জনগণের বৈধ অধিকার প্রভাবিত করাকে ঘৃণা করি-স্পষ্ট ভাষায় ঘৃণা করি।
সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি জনাব আবদুস সাত্তার সুমন-সহ বহু নেতাকর্মী বিমানবন্দরে আমীরে জামায়াতকে বিদায় জানান।

