যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিরোধ : আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান

ধর্ম ও দর্শন বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের লড়াই হবে সকল অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। নতুন, পুরাতন ফ্যাসিবাদ বুঝি না, যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিরোধ, সেখানেই প্রতিবাদ করা হবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।

শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) রাজধানীর আল ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আমীরে জামায়াত বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ একই দিনে দুটি ভোট দিলেও একটি ভোটের মূল্যায়ন করা হলো। আরেকটি ফেলে দেয়া হলো। অথচ কোনোটিই অগুরুত্বপূর্ণ নয়।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শাসনের যে ধারা অতীতে শাসকদের ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল জনগণ চেয়েছিল সেই ধারার পরিবর্তন হোক। এই পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক সংস্কার অপরিহার্য। দীর্ঘদিন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে মাসের পর মাস সংলাপের পর জুলাই সনদ তৈরি করল। তার ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আফসোস! বর্তমান সরকারি দল প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করল। ফলে কোনো পরিবর্তন আসল না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই সকল মৌলিক বিষয়কে অগ্রাহ্য করেছে। তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, স্বাধীন গুম কমিশন ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চাচ্ছেন না। ফলে যে জায়গাগুলোর কারণে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল- সেসব আগের জায়গায় থেকে গেল!

তিনি আরও বলেন, জনগণ আজ শুধু হতাশ নয়, ক্ষুব্ধও। তাদের ভোটের মূল্যায়ন কেন করা হলো না? নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দল বলেছে- আমরা গণভোট মানি আপনার গণভোটে হ্যাঁ বলুন। যারা এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, তাদের প্রায় ৭০ ভাগ ভোট অগ্রাহ্য হবে কেন? প্রশ্ন রাখেন আমীরে জামায়াত।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনারা অনেক ত্যাগ ও কুরবানি স্বীকার করেছেন। হয়তো আরও ত্যাগ কুরবানির জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। কেউ যদি আমাদের ন্যায্য অধিকার না দেয়, আমরা চুপ করে বসে থাকব না। সেই অধিকার আদায়ে আমাদের লড়াই চলবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ন্যায় ও কল্যাণের উপরে দেশের স্বার্থে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে আমাদের ভূমিকা থাকবে, দেশবাসী ততদিন আমাদের দোয়া ও সহযোগিতা করবেন এবং পাশে থাকবেন। প্রয়োজনে সমালোচনা ও প্রতিবাদও করবেন, আমরা স্বাগত জানাবো।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের সীমান্তে কিছু সমস্যা আছে। আমাদের দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ, বিজিবির পাশে আমাদের গোটা দেশবাসী আছেন। আমরা সকল ধরনের আধিপত্যবাদকে রুখে দিতে পারব। শুধু প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। জাতীয় স্বার্থের জায়গায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আয়তনে একটি ছোট্ট ভূখণ্ড। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের বসবাস। আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারিনি। কারণ সুশিক্ষার অভাব। আমাদের সমাজে যাদের উচ্চ শিক্ষিত দেখতে পাই; কার্যত তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ আমানতের খেয়ানত করে চলেছে। তারা অবৈধ পথে মানুষের সম্পদ ও ইজ্জত গ্রাস করে ফেলছে। সমাজ এমনি এমনি চলে না, কাঠামো লাগে। কাঠামোর মূল দায়িত্ব যারা পালন করেন বা যারা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন- তাদের মনস্তত্ত্ব ও আচরণের উপর নির্ভর করে সমাজ কতটুকু ভালো থাকবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ দুইবার স্বাধীন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে একবার ১৯৭১ সালে আরেকবার। বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল- তাদের ব্যর্থতার কারণে আজও কোনো সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আমীরে জামায়াত বলেন, বহু ত্যাগ তিতিক্ষা, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ বড় আশাবাদী হয়েছিলেন। অনেকগুলো জীবনের বিনিময়ে আমরা একটি পরিবর্তন পেয়েছি। বাংলাদেশ আগামীতে সঠিক পথে পরিচালিত হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের দেয়া রায় সরকারি দল অগ্রাহ্য করলেও আমরা বিরোধী দল অগ্রাহ্য করব না। এজন্য বিষয়টি নিয়ে জনগণের কাছে এসেছি। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ দাবি কোনো দলের জন্য নয়, জনগণের জন্য। এ রায় দিয়েছে জনগণ, জনগণের স্বার্থেই এ রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মৌলিক সংস্কারগুলো করতে হবে। ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে হবে যাতে কেউ দুর্দান্ত ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে। জনগণের সম্পদ, ইজ্জত নিয়ে যাতে কেউ খেলতে না পারে- তার ওয়ারেন্টির জন্যই এ পরিবর্তন বা সংস্কার অপরিহার্য।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, নিজের অধিকার আদায়ে অনড় থাকুন। আমরা আপনাদের সাথে আছি। আপনারাও আমাদের সাথে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।

আমীরে জামায়াত বলেন, সমাজ ভালো নেই। ৫-৭ বছরের মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। গতকালও মা-মেয়েসহ চারজনকে খুন করা হয়েছে। গত ২১ জুন গাইবান্ধার সাঘাটায় স্কুলের কমিটি গঠন করার লালসা পূরণ করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্থানীয় ইউনিয়ন দায়িত্বশীল সাইফুল্লাহ বারীকে দিনের বেলায় আপসের কথা বলে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়েছে। তার সঙ্গী সালাউদ্দিনকে কুপিয়ে স্পাইনাল কড কেটে দেয়া হয়েছে। সে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে না। তার বেঁচে থাকাই দুঃসহ যন্ত্রণার বিষয়। মানুষ অল্প স্বার্থের জন্য কতটা নির্মম ও বেপরোয়া হতে পারে- এটি তার সর্বশেষ উদাহরণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়েছে, তাদের অধীনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আছেন। তারপরও অহরহ এগুলো ঘটে যাচ্ছে। সাড়ে ১৫ বছরের কষ্ট ও এতোগুলো জীবন ত্যাগের পরে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে মানুষ ভিন্ন কিছু আশা করে।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা জাতিকে কথা দিচ্ছি- জাতির স্বার্থে সংসদের ভিতরে আমাদের ভূমিকা পরিচালিত হবে। সরকার ভালো উদ্যোগ নিলে সহযোগিতা করব, গণবিরোধী যাই গ্রহণ করবে তার প্রতিবাদ করব, সামর্থ থাকলে আমরা প্রতিহত করব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই প্রয়াস সংসদের ভিতরে ও বাইরে সমানতালে চলবে।

তিনি বলেন, আমরা একটি মানবিক সমাজ চাই। মানুষের বসবাসযোগ্য একটি বাংলাদেশ চাই। আমার শিশুর নিরাপত্তা চাই, সন্তানের নিরাপত্তা চাই, মা-বোন-মেয়ের ইজ্জতের নিরাপত্তা চাই। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত করতে চাই না। মাথা সোজা করা জাতি হিসেবে আমরা দাঁড়াতে চাই। এজন্য আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

মজলিসে শূরার অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সাবেক এমপি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলবৃন্দ ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যবৃন্দ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যবৃন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *