শাকসুতেও ইতিহাস গড়ার হাতছানি শিবিরের

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

তামিম মজিদ সিলেট

ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু ও জকসুর পর আগামী ২০ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনেও ইতিহাস সৃষ্টি করতে চায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দেশের ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর এবার শিবিরের চোখ শাকসুতে। এখানে শিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেল জয়লাভ করলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ডাবল হ্যাটট্রিক’ করবে ইসলামী ছাত্রশিবির। ফলে বিরল ইতিহাস গড়ার হাতছানি সংগঠনটির সামনে।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বুর্জোয়া ও টর্চারের রাজনীতি অবসান করতেই শিবিরের দিকে ঝুঁকছে জেন-জি জেনারেশনের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদল পুরোনো ধ্যান ধারণা ও রাজনৈতিক কালচারে পড়ে থাকায় শিক্ষার্থীদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠতে পারছে না। এছাড়া ক্যাম্পাসে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মাদকে আসক্ত থাকার কারণে তাদেরকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখান করছে বলে মনে করেন এসব শিক্ষার্থী।

তারা বলছেন, প্রত্যাশার জায়গায় ছাত্রশিবির ইউনিক। শিক্ষার্থীদের পালস বুঝে বন্ধুসুলভ আচরণ এবং আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে শিবির। ফলে ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে শিবিরকেই বেছে নিয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। সেই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনেও শিবিরের প্যানেলকে বেছে নেবে বলে তারা আশাবাদী।

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, শীতকালীন ছুটি শেষে নতুন বছরের ৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। শীতের ছুটিতে প্রার্থীরা অনলাইনের তাদের প্রচার চালু রাখলেও পুরোদমে মাঠ পর্যায়ে প্রচার শুরু করেছে ছুটির পর। নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে ব্যাপক উৎসাহ বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ছুটির পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্তর, ফুডকোর্ট, গিফারি চত্বর, অর্জুনতলা, বিওই বিল্ডিংয়ের টংয়ের এলাকা-সহ ক্যাম্পাসজুড়ে বিভিন্ন প্যানেলের উপস্থিতি ‘বেড়েছে’। প্রার্থীরা নতুন উদ্যমে প্রচারপত্র বিলি করছেন, শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন ব্যালট নম্বর ও পরিচিতি। এছাড়া বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনেও ক্লাস শেষের বিরতিতে বা ক্যাম্পাসে আড্ডার ফাঁকে প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন। শেয়ার করছেন নিজেদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। ছুটির দিনেও শুক্রবার আবাসিক হল ও মেসে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন প্রার্থীরা।

শাকসুর নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (শাকসু) ২৩টি পদ রয়েছে। শাকসু নির্বাচনে এবার মোট ভোটার ৯ হাজার ১২৪ জন। শাহপরান হলে ২ হাজার ২২০, বিজয়-২৪ হলে ২ হাজার ১৫৬, সৈয়দ মুজতবা আলী হলে ১ হাজার ৪২২ জন ভোটার আছেন। ছাত্রীদের আয়েশা সিদ্দীকা হলে ১ হাজার ৩৪৪, বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী হলে ১ হাজার ৩০৬ এবং ফাতিমা তুজ জাহরা হলে ৬৭৬ ভোটার আছেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ২০ জানুয়ারি শাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

জানা গেছে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’, ছাত্রদল সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ ও বাম সমর্থিত ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ এই তিনটি প্যানেলে লড়াই হবে। এর বাইরেও বেশ কয়েকটি পদে স্বতন্ত্র লড়বেন কিছু শিক্ষার্থী।

শাকসুর ২৩টি পদেই পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে লড়ছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আলোচিত সমন্বয়ক দেলোয়ার হোসেন শিশির, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শাবিপ্রবি শিবিরের অফিস সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে শাখা ছাত্রশিবিরের এইচআরডি সম্পাদক মোহাম্মদ শাকিল। এছাড়া ক্রীড়া সম্পাদক মাহবুব হাসান অনু, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক আহমেদ বিন কেফায়েত, সাহিত্য ও বার্ষিকী সম্পাদক তামিম রিজওয়ান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জাবের বিন আব্দুল খালেক, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ইব্রাহিম বিন ইসলাম, ধর্ম ও সম্প্রতি বিষয়ক সম্পাদক আসিফ ভূইয়া, সমাজসেবা সম্পাদক আজাদ শিকদার, ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক আমিনা বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আলী আব্বাস শাহীন, শিক্ষা গবেষণা ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক শামছুল শায়ান, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক আব্দুস সামাদ শান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান শিবলু। পরিবহণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইব্রাহিম সৌরভ, ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিন সম্পাদক আসিফুর রহমান, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, কার্যবরী সদস্য সুমাইয়া নাভা, আদিবা সালেহা, শুয়াইব চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান ও জামিলুর রেজা সৈকত।

অপরদিকে ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ নামে ২২টি পদে প্যানেল দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এই প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মুস্তাকিম বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শাবিপ্রবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারুফ বিল্লাহ ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জহির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক জিল্লুর রহমান জিলন, সাহিত্য ও বার্ষিকী সম্পাদক আসাদুল হক, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অমিত মালাকার, ধর্ম ও সম্প্রীতি সম্পাদক তাজুল ইসলাম, সমাজসেবা সম্পাদক রুবেল মিয়া রাব্বি, ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক মাহমুদা রিয়া, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক মোস্তফা আহমেদ, শিক্ষা গবেষণা ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মুনতাসির মামুন শুভ, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক তারেক রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আশিক, পরিবহন সম্পাদক নাসিমুল হুদা, ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিন সম্পাদক সোহানুর রহমান এবং আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে খালিদ সাইফুল্লাহ, কার্যনির্বাহী সদস্য পদে হৃদয় মিয়া, হৃদয় আহসান, আফফান, অন্তু গোপ ও মারুফ সাকলাইন লড়ছেন।

এদিকে ১৩টি পদে আংশিক প্যানেল দিয়েছে বাম সমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলো। ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ নামে প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মুহয়ী শারদ, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিফাত, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজএস) পদে হাফিজুর ইসলাম হাফিজ নির্বাচনে লড়ছেন। এছাড়া সহ-ক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. মাসুদ শাহরিয়ার, সমাজসেবা সম্পাদক পদে তাকভীর আহাম্মদ, ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক পদে সুইটি আক্তার, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে মো. হানিফ হাসান নিশান, শিক্ষা-গবেষণা ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সম্পাদক পদে মো. রবিউল ইসলাম, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ফাহমিদ হাসান তুহিন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে মো. আরমান হোসেন ইমন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে তাছমিমা মাহফুজ জেরিন, পরিবহন সম্পাদক পদে মো. জুবায়ের হোসেন সায়েম, কার্যকরী সদস্য পদে রাকিব হাসান, আকাশ দাস নাজমুস সাকিব, তাহমিদুর রহমান তুহিন ও মো. এহসানুল হক মিলন নির্বাচন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া ফেরদৌস বলেন, নতুন বাংলাদেশে গণরুম কালচারের ঠাই নেই। কিন্তু এখনও একটি সংগঠন পুরোনো ধ্যান ধারণায় পড়ে আছে। সেই ক্ষেত্রে তাদেরকে পছন্দ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যে প্যানেল ক্যাম্পাসে পড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি রোধ করতে পারব- সেই প্যানেলকে ভোট দেবো। সে ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় আমি ছাত্রশিবিরকে নিয়ে ভাবছি।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন আহমদ বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না। যাদের প্রাণের বিনিময়ে নতুন একটা ক্যাম্পাস পেয়েছি। সেই জুলাই যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখছি।

ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসান শিশির বলেন, সন্ত্রাসমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ার স্বপ্ন নিয়েই কাজ শুরু করেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশ সাড়া পাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের থেকে প্রায় ৯০টির বেশি পরামর্শ পেয়েছি। তিনি বলেন, আমরা এখনো ইশতেহার ঘোষণা করিনি। আমরা শিক্ষার্থীদের থেকে বাস্তবিক সমস্যা সমাধান নিয়ে দাবি-দাওয়া শুনছি ও নোট করছি। শিক্ষার্থীদের সেই পরামর্শ নোট আকারে আছে, যেগুলো ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের বেশি সমস্যা, সেগুলো ইশতেহারে যুক্ত করবো।

ছাত্রদল সর্মথিত প্যানেল ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মুস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, আমরা একটু ইউনিক সিস্টেমে এগোচ্ছি। আমরা প্রাথমিকভাবে ব্যালট নিয়ে ভোট চাচ্ছি না, শিক্ষার্থীদের চাওয়া ও দাবি শুনছি। এরপর সেগুলো বিচার বিবেচনায় করে, আমরা যদি সেগুলো নিয়ে কাজ করতে পারি, তখন আমরা ভোট চাইব। এভাবেই সিকুয়েন্স অনুযায়ী এগোচ্ছি।

‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী হাফিজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। আমরা শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে আমাদের ইশতেহার পৌঁছে দিচ্ছি, একই সাথে মনোযোগ দিয়ে শুনছি, ক্যাম্পাসজীবনের নানান সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা। তিনি বলেন, শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ আমাদের ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে আরও বেগবান করবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতামত ও বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করবে, এমন বিশ্বাস আমাদের দৃঢ়।

স্বতন্ত্র সাস্টিয়ান জোটের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ফয়সাল হোসেন বলেন, আমি এখনো আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা করেনি। শিক্ষার্থীদের থেকে দাবি শুনে শিগগিরই ইশতেহার ঘোষণা করব। তবে পুরোদমে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছি।

শাকসুর নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই। নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। আমরা সে মোতাবেক আগাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *