ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান ও মাদুরোকে ‘জোরপূর্বক আটকের’ ঘটনায় চীন-রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ

আমেরিকা সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সামরিক অভিযান চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘জোরপূর্বক আটক’ করেছে, তাতে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছে চীন।

এ ঘটনার নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। রোববার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এমন আহ্বান জানানো হয়।

একইভাবে, রাশিয়াও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও স্ত্রীসহ মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান ‘পুনর্বিবেচনা’ করার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। সেইসঙ্গে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এটাও বলা হয়েছে যে, সমস্যা সমাধানে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘সংলাপ’ হওয়া দরকার।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ অভিহিত করে তার ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া।

ভেনেজুয়েলায় হামলা নিয়ে যুক্তরাজ্য, জাপান ও মালয়েশিয়া যা বলছে

নিকোলাস মাদুরোর পতন নিয়ে যুক্তরাজ্য “চোখের জল ফেলবে না” বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার। তবে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি-না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, জি-সেভেন গ্রুপের দেশ হিসেবে জাপান তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার’ বিষয়ে তারা সমর্থন দিচ্ছেন।

তবে কড়া ভাষায় ভেনেজুয়েলায় হামলার বিরোধিতা করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, তারা ‘অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সকল ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি হুমকি বা বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে’।

ভেনেজুয়েলার যেসব স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করার আগে দেশটির রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় মার্কিন সেনারা। হামলার ঘটনার পর বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ার ছবি ও ভিডিও দেখে অন্তত পাঁচটি স্থাপনা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বিবিসি ফেরিফাই।

সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

* জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো ডি মিরান্ডা বিমান ঘাঁটি, যা লা কার্লোতা নামে পরিচিত।

*ফুয়ের্তে তিউনা নামে কারাকাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা।

* ক্যারিবীয় সাগরের সঙ্গে কারাকাসের প্রধান সংযোগ বন্দর পোর্ত লা গুয়েরা, যা মিরান্ডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত।
কারাকাসের ঠিক পূর্বে অবস্থিত হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর।

* মিরান্ডা রাজ্যের সেরো এল ভলকানের একটি সুউচ্চ টেলিকম টাওয়ার, যা অ্যান্টেনাস এল ভলকান নামে পরিচিত।

স্যাটেলাইটের ছবিতে ভেনেজুয়েলার সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি

স্যাটেলাইটের ছবিতে ভেনেজুয়েলার ফুয়ের্তে তিউনা নামের গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ভ্যান্টরের ধারণকৃত ছবিতে সামরিক স্থাপনাটির কমপক্ষে ছয়টি কাঠামোতে গুরুতর ক্ষতির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। ছবিগুলে বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি ভেরিফাই। একটি ছবিতে লাল ছাদযুক্ত একটি বড় অবকাঠামো থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। সেটার দক্ষিণে তিনটি ছোট ভবন প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।

আটকের পর মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে নিউ ইয়র্কে নেওয়া হয় যেভাবে

ভেনেজুয়েলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করার পর তাদেরকে নিউ ইয়র্কে নেওয়া হয়েছে। সেখানে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি (ডিইএ) কার্যালয়ে নেওয়ার পর মাদুরোকে ব্রুকলিনের বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।

এর আগে, মার্কিন অভিযানে বন্দি হওয়ার পর শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশটির রাজধানী কারাকাস থেকে হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে নেওয়া হয়। তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যারিবীয় সাগরের অজ্ঞাত একটি স্থানে অবস্থানরত মার্কিন নৌ জাহাজে, যার নাম ‘ইউএসএস আইডাব্লিউও জিমা’।

সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কিউবার গুয়ানতানামো বে-তে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর অন্য একটি উড়োজাহাজে করে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্যের অরেঞ্জ কাউন্টির স্টুয়ার্ট বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিমান ঘাঁটি থেকে আরেকটি হেলিকপ্টারে করে মাদুরোকে নিউ ইয়র্ক শহরে নেওয়া হয়।

ভেনেজুয়েলার এই নেতা বন্দি হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণ করা পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে প্রায় ২,১০০ মাইল (৩,৩০০ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

মাদুরোর মুক্তির দাবিতে তার সমর্থকদের বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মুক্তির দাবিতে দেশটির রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন তার সরকারের সমর্থকরা। কারাকাসের মেয়র কারমেন মেলান্দেজ, যিনি মাদুরো সরকারের অনুগত বলে পরিচিত, তিনিও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তাদের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্র “অপহরণ” করে নিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ

মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশটির আদালত এই নির্দেশনা দিয়েছে বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে। বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *