*সমঝোতার রাজনীতিই হোক আগামীর পথ : ডা. শফিকুর রহমান *সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিলেটের সমস্যার সমাধান করা হবে : আরিফুল হক চৌধুরী
সিলেট প্রেসক্লাব আয়োজিত ইফতার মাহফিলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে মিডিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেন, সকলক্ষেত্রে মিডিয়া ন্যায্য রুল প্লে করলে দেশ অনেকাংশেই এগিয়ে যাবে। তারা এও বলেন, মিডিয়া তোষামোদী করলে দেশ পথ হারাতে বাধ্য। বক্তারা অতীতে সিলেটের অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধানে সিলেট প্রেসক্লাবের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, সামাজিক অঙ্গণে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে আগামীতেও এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এবারও শতবছরের সাংবাদিকতার স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিলকে ঘিরে শুক্রবার সকল শ্রেণী পেশার নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মিলন মেলায় রূপ নিয়েছিলো সিলেট প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ। সকল রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাহফিলে অংশ নেন। সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠনের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত হন ঐতিহ্যবাহী এ ইফতার মাহফিলে।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূরের সভাপতিত্বে ইফতার মাহফিলপূর্ব আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন- সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসান, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, রাষ্ট্রপতির সাবেক উপদেষ্টা ও ওকাব-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি পারভিন এফ চৌধুরী, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের মহাপরিচালক মো: আব্দুর রকিব, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিলেটে নিযুক্ত সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ রায়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
ভিডিও নিউজ : https://www.facebook.com/reel/1469195251510312
অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সংঘাত পরিহার করে সমঝোতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশা অনেক ছিল, কিন্তু ফলাফল কাঙ্খিত হয়নি। তা সত্ত্বেও আমরা অতীতের মতো ঢালাওভাবে প্রত্যাখ্যান বা সংঘাতের পথে হাঁটিনি। আমরা চাই দেশে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা তৈরি হোক। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে কোনো সমাধান আসবে না। বিরোধী দলকে ইতিবাচক রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তিনি আরও যোগ করেন, সংসদের ভেতরে বা বাইরে কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, আবার সবক্ষেত্রে দমন নীতিও নয়; এই দুইয়ের মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ আমরা দেখতে চাই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের সমাজের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একটি সুন্দর সমাজ গঠনে রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের ভূমিকার তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সমাজকে চারটি ডাইমেনশন থেকে দেখতে হয়। রাজনীতিকরা যদি একচোখা হন, তবে সাধারণ মানুষ লাভবান হয় না। একইভাবে সাংবাদিকরা যদি সব দিক বিবেচনা না করে খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেন, তবে সমাজে বিভাজন ও সংঘাত তৈরি হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রের চেয়ে ‘মিডিয়া ওয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধ বেশি শক্তিশালী, যা প্রতিপক্ষকে দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, মিডিয়া কেবল সরকারের গুণগান গাইবে না। সরকার কোথাও ভুল করলে বা ‘স্লিপ’ কাটলে তা ধরিয়ে দিতে হবে। যেদিন সাংবাদিকরা সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবেন, সেদিনই তারা সরকারের প্রকৃত শুভাকাঙ্খী ও বন্ধু হিসেবে গণ্য হবেন। তিনি আরও বলেন, কেবল তোষামোদ করলে সরকার পথ হারিয়ে ফেলে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর।
সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনে বলেন, “নিউজ (সংবাদ) এবং ভিউস (মতামত) এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। সংবাদের ক্ষেত্রে কোনো কাটছাঁট করবেন না, সত্য যা তাই তুলে ধরুন। তবে আপনাদের নিজস্ব মতামত বা মোটিভেশন আপনারা ভিউস অংশে দিতে পারেন।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে জামায়াত আমীর বলেন, সত্য প্রকাশে আপোষহীন থাকতে হবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সাহস অর্জন করতে হবে। কোনো পক্ষ বা শক্তির ভয় না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনই হবে পেশাদারিত্বের পরিচয়।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি সিলেটের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি সিলেটের সাংবাদিকদের অতীত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সিলেটের সংবাদ জগত আগামীতে সারা দেশের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে দাঁড়াবে। তিনি পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্ব উল্লেখ করে দেশবাসীর ওপর আল্লাহর রহমত কামনা করেন এবং একটি ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
অন্যদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসকের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পদের প্রভাবে যেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না হয়। তিনি বলেন, প্রশাসক নয়, বরং জনগণের বন্ধু ও সেবক হয়ে কাজ করতে হবে। রাজনীতিকদের কাজ হলো জনগণের ভাষা বোঝা এবং তাদের প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। তিনি বলেন, সিলেটের আমার পরিচয় বিরোধী দলীয় নেতা নয়, এখানে আমার পরিচয় হলো ডা. শফিকুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি সিলেট-ম্যানচেষ্টার ফ্লাইট বন্ধ হবে না মর্মে তার বক্তব্য পুনরুল্লেখ করেন। সিলেটের বেশ কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সেই সমস্যাগুলো সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাধানের পথে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ শুরুর পথে যে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা ছিল, জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান হয়েছে।
ভিডিও নিউজ : https://www.facebook.com/reel/1654369615702360
শিগগিরই এই প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়া সিলেটে বিমানের ফ্লাইট সংক্রান্ত সমস্যা ও দ্রুত দূরীকরণের আশ্বাস দেন তিনি।
সিলেট সিটি কর্পোশেনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সমাজ প্রগতিতে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট প্রেসক্লাবের সাথে নিজের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে আলোকপাত করেন তিনি। সিসিকের প্রশাসকের দায়িত্ব নেয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকসহ সব মহলের সহযোগিতা চাই। সবার প্রচেষ্টায় আমরা ক্লিন সিটি, গ্রিণ সিটি গড়তে চাই।
ভিডিও নিউজ : https://www.facebook.com/reel/1430293715512103
সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, আমরা চাই সিলেট-ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন হবে। আমরা চাই বিমানের ভাড়া যতটুকু পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায় সেভাবে আনা হোক। ম্যানচেস্টার ফ্লাইট অবশ্যই বন্ধ হবে না বরং আমরা চাই সিলেট-বার্মিংহামের ফ্লাইটটি চালু করা হোক। সিলেটের উন্নয়নের জন্য মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং মন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির সঠিক পদক্ষেপ নেবেন। আমরা তথা সিলেটবাসী আপনাদের সঙ্গে থাকবে।

ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, সিলেটের পুলিশ সুপার কাজী আখতারুল আলম, সেন্টার ফর এনআরবি’র চেয়ারপার্সন এমএস সেকিল চৌধুরী, জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর জামায়াতের আমীর ফখরুল ইসলাম, মহানগর বিএনপির সাধারণ ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বারের সাবেক সভাপতি ও প্রেসক্লাবের আইন উপদেষ্টা এমাদ উল্যাহ শহিদুল ইসলাম, শাবিপ্রবি’র অধ্যাপক ড. সৈয়দ আশরাফুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদ্মাসন সিংহ, ডিজিএফআইর ডেপুটি পরিচালক আবু সাদাত মো. সায়েম, সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ, যমুনা অয়েল কোম্পানীর পরিচালক সালেহ আহমদ খসরু, সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক ফরিদ আহমদ, ভারতীয় হাই কমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারী রাজেশ ভাটিয়া, আটাব-এর সাবেক সভাপতি রেজওয়ান আহমদ, এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমদ, বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার পুলিন রায়, জেলা বিএনপি নেতা আজমল বক্ত সাদেক, শেখ ফারুক আহমদ, জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী কলেজের অধ্যক্ষ মফিজুর রহমান প্রমুখ।
ভিডিও নিউজ : https://www.facebook.com/reel/1251844156385961
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ইকবাল সিদ্দিকী, আহমেদ নূর ও ইকরামুল কবির, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. বশির উদ্দিন ও সমরেন্দ্র বিশ্বাস সমর, জীবন সদস্য আফতাব চৌধুরী ও শেখ ফারুক আহমদ, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সহ-সভাপতি ফয়ছল আলম, সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ, কোষাধ্যক্ষ ফয়সাল আমীন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক শেখ আশরাফুল আলম নাসির, পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুহিবুর রহমান, কার্যনির্বাহী সদস্য মুহাম্মদ আমজাদ হোসাইন, আনাস হাবিব কলিন্স, জেরজিস ফাতেমাসহ ক্লাব সদস্যবৃন্দ।
সভাপতির বক্তব্যে প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সিলেটের যে অতীত ঐতিহ্য রয়েছে আমরা সেই ধারা বজায় রাখতে চাই। সকল ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই পেশাদারিত্বকে। এগিয়ে নিতে চাই ইতিবাচক সাংবাদিকতাকে। এ সকল ধারা বজায় রাখতে আমরা সবার সহযোগিতা চাই। জালালাবাদ

