সরকার জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে : সিলেটে ডা. শফিকুর রহমান

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি অভিযোগ করেছেন, মাত্র সাত মাসের মধ্যেই সরকার জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাঁর দাবি, গণভোটের রায় বাতিলের মাধ্যমে সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেট সার্কিট হাউজে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিরোধীদলীয় নেতা।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সংসদের ভেতরে থেকেই সমাধান চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকারই বিরোধী দলকে রাজপথে ঠেলে দিয়েছে।” জনগণের যৌক্তিক দাবিতে তাঁদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, সরকার যদি বিরোধী দলের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে, তাহলে সরকারের কাছ থেকেও কি জাতি দায়িত্বশীল আচরণ আশা করতে পারে না? তাঁর মতে, জাতীয় সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না।
‘মন্ত্রীদের ভিন্ন বক্তব্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে’

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একক ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না। একেক মন্ত্রী একেক ধরনের বক্তব্য দেওয়ায় জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ-সহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়েও সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। তাঁর ভাষ্য, একদিকে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন বলা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনের দিনক্ষণ সরকার নির্ধারণ করছে—এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়ন নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমীর।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কেউ বলছেন ২০২৮ সালে, আবার কেউ বলছেন ২০২৯ সালে কাজ শেষ হবে। ঠিক কোনটি হবে, সেটা সরকারই বলতে পারবে।” এ বিষয়ে তাঁরা চাপ সৃষ্টি বা সুপারিশ করতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও এর প্রভাব দ্রব্যমূল্যে পড়বে না- বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক কি না, তা মানুষ নিজের চোখেই দেখতে পারছে।

তাঁর দাবি, ইতোমধ্যে যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে এবং দ্রব্যমূল্যও বাড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে না—এমন নিশ্চয়তা কী, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। এ কারণে মন্ত্রীদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে জামায়াতের একটি বিশেষজ্ঞ দল সরকারকে কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। লংমার্চে ব্যবহৃত যানবাহন প্রসঙ্গে সরকারের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব গাড়ি যথাযথ ভাড়া দিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শাহজালালের (র.) মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন জামায়াত আমীর।

এ ক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ও আয়-ব্যয়ের বিষয়ে সরকার, মাজারের খেদমতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে জেলা প্রশাসনের জন্য ৩৫ শতাংশ এবং মাজার কর্তৃপক্ষের জন্য ৬৫ শতাংশ বণ্টনের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ না করে সংলাপের মাধ্যমে এমন একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি, যাতে ধর্মীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে মাজারের আয় সমাজ ও দ্বীনের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যকরভাবে চালু করার দাবি জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অনেকটা নামেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও একাডেমিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া হাম আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়ে ভারত ও চীনের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও বলেন জামায়াত আমীর।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-ঊন-নূর, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ও আসন্ন সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহাজান আলী এবং জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *