তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী বিজেপি

এশিয়া সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাত পৌনে ১০টা নাগাদ বেসরকারি ফলাফলে বিজেপি ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হয়েছে ৫৯টি আসনে।

যে ৬১টি আসনে ফলাফল ঘোষণা এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিজেপি ৪১টি আর তৃণমূল কংগ্রেস ২০টি এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেস আর সিপিআই (এম) বিজয়ী হয়েছে দুইটি করে আসনে। অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছে একটি আসনে।

মমতা ব্যানার্জীর ‘ঘরে’ হারালেন শুভেন্দু অধিকারী

শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারলেন মমতা ব্যানার্জী। যে কেন্দ্র মমতা ব্যানার্জীর ‘ঘর’ বলে পরিচিত ছিল, সেই কেন্দ্রেই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে হারালেন বিজেপি নেতা ও একদা মমতা ব্যানার্জীর সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী। ১৫ হাজারের বেশি ভোটে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করলেন শুভেন্দু অধিকারী।

ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরে কলকাতার শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্র থেকে সার্টিফিকেট হাতে বেরিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বললেন, “হিন্দুত্বের জন্য প্রাণ দেওয়া কর্মীদের এই জয় উৎসর্গ করলাম, মমতা ব্যানার্জীকে হারানো খুব দরকার ছিল।”
এর আগের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জীর কাছেই অল্প ব্যবধানে হেরেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।

বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন লুট করেছে, এই জয় অনৈতিক: মমতা ব্যানার্জি

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন চুরি করেছে। বিজেপি জালিয়াতি করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপি কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমরা বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনেনি।”

মমতা ব্যানার্জি বলেন, “বিজেপির এই জয় অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন যা করেছে তা পুরোপুরি অনৈতিক। তারা জোরপূর্বক এসআইআর পরিচালনা করেছে। তারা অত্যাচার চালিয়েছে। তারা কাউন্টিং এজেন্টদের গ্রেপ্তার করেছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”

পশ্চিমবঙ্গে রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বিজেপি ১৩৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে এবং আরো ৭২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে এবং ৩০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পাঁচটি কারণ – বিবিসির বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকার করেননি – কিন্তু রাজ্যে যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছে সেই ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট।

পনেরো বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ কী হতে পারে? এ পর্যন্ত যে ফলাফল ও ট্রেন্ড পাওয়া গেছে, তা বিশ্লেষণ করে বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ এর পেছনে মূল পাঁচটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন।

এক. পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের (যা ৫০ শতাংশেরও বেশি) বেশিটাই যে এতকাল মমতা ব্যানার্জীর দল পেয়ে এসেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী বা ‘সবুজ সাথী’র (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো প্রকল্প তৃণমূল সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

কিন্তু এবারে সেই ভোটব্যাঙ্কে অবধারিত ফাটল ধরেছে – যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা। দু’বছর আগেকার আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে – যার একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমুলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকর নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।

দুই. এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে যে ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই তালিকায় লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক – কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

তিন. পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজে’র বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ। এবারেও এসআইআরের কারণে রাজ্য জুড়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী, তার জন্য কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি – কিন্তু দেখা গলে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে সেটা যথেষ্ঠ হল না।

চার. রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা ব্যানার্জীর একটানা নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হল রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার মোটামুটি ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম – আর এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবারে সেই প্রক্রিয়ার পাল্টা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে – যার সুফল বিজেপি পেয়েছে, যে কারণে তারা মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেতে চলেছে।

পাঁচ. পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েই থাকে – যেটা এবারে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি বলেলই চলে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের তারা বদলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ভোটের বেশ ক’দিন আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী – যে সংখ্যা ছিল অভূতপূর্ব। অনেকেই বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ এতো নিশ্চিন্তে ও নিরুপদ্রবে ভোট দিতে পেরেছেন।

অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে। এই নির্বাচনে এর মধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ পাওয়া তথ্যে, বিজেপি বিজয়ী হয়েছে ১৯০টি আসনে, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৬৪টি আসন। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ১৪৮টি আসন। বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *