সাঈদ চৌধুরী
লন্ডন বারা অব টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ৪র্থ বারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক লুৎফুর রহমান। অ্যাসপায়ার নেতা লুৎফুর ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারি দল লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলামকে হারিয়ে বিপুল ব্যবধানে বিজয় লাভ করেছেন। সিরাজ পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট।

লুৎফুর রহমান গত এক যুগে দেখিয়েছেন সুদৃঢ় নেতৃত্বের ফলে স্থানীয় কাউন্সিল কিভাবে রূপান্তরমূলক হতে পারে। যে নেতৃত্বের শৈলী অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং লক্ষ্য অর্জনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
ভিডিও নিউজ: https://www.facebook.com/reel/1008419998200814
লুৎফুর রহমানের রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব (Transformational Leadership) দূরদর্শী, অনুকরণীয়, এবং কর্মীদের ক্ষমতায়ন, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে কাজের মান ও আনুগত্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
এখন টাওয়ার হ্যামলেটসের বহু মানবিক ও নান্দনিক উদ্যোগ গ্রেট ব্রিটেনে অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারো লুৎফুর রহমান ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ফ্রি ট্রাভেল পাস, সুইমিং পুল, প্রেগন্যান্সি পেমেন্ট, পার্কিং সুবিধা সহ ১৪৮ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লুৎফুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (৭ মে ২০২৬) টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের জনগণ শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট প্রদান করেন। ৮ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও কনভেনশন সেন্টার এক্সসেল লন্ডনে ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। মেয়র লুতফুর রহমান নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৬ হাজার ২২৫ ভোট বেশী পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে গ্রিন পার্টি থেকে হিরা খান আডিওগুন ১৯ হাজার ২২৩, রিফর্ম ইউকের জন জেরাল্ড বুলার্ড ৭ হাজার ১৫৩, যুক্তরাজ্যের বর্তমান বিরোদী দল কনজারভেটিভ পার্টির ডোমিনিক আইডান নোলান ৩ হাজার ৮১৮ ভোট, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টস থেকে ব্যারিস্টার জামি আলি ৩ হাজার ১৫৬ ভোট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস থেকে মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ২ হাজার ৪২১ ভোট, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট কোয়ালিশন থেকে হুগো পিয়েরে ৬৩৮ ভোট ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রার্থী টারেন্স ম্যাকগ্রেনারা ৫২৪ ভোট পেয়েছেন।

অপেক্ষা ও উৎকন্ঠার প্রহর কাটিয়ে যখন বিজয়ের ঘোষণা আসে, তখন এক্সসেল লন্ডনের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আনন্দে মেতে ওঠেন উপস্থিত লুৎফুর সমর্থক অসংখ্য মানুষ। ‘জনতার মেয়র’ খ্যাত লুৎফুর রহমান পুনঃনির্বাচিত হওয়ায় উল্লসিত জনতা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে স্লোগান দিয়ে মহান স্রষ্টার শুকরিয়া আদায় করেন। তারা মেয়রকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের গর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করে তার সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
জনগণ তাদের প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসায় মূল্যবান ভোট প্রদানের জন্য মেয়র লুৎফুর রহমান কমিউনিটির সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জনতার কাতারে এসে লুৎফুর রহমান বলেন, কাউন্সিলের জনগণ আমার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন। তাদের কাছে আমার দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে গেল। যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং যারা ভোট দেননি, সবাকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও অঙ্গীকার করেন তিনি।

প্রায় এক যুগ আগে, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথম বাংলাদেশী নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন লুৎফুর রহমান। ২০১৪ ও ২০২২ সালে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর প্রাগমেটিক নেতৃত্বে (Pragmatic Leadership) কমিউনিটির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর যৌক্তিক এবং কার্যকর সমাধান প্রদানের মাধ্যমে গণ মানুষের মাঝে আস্থার জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
ফলে দীর্ঘ সময়ের নির্ভরযোগ্যতায় নির্বাহী মেয়র হিসেবে চতুর্থ বার বিজয়ী হয়ে নতুন রেকর্ড সৃস্টি করেছেন। তার দল, অ্যাসপায়ার পার্টি ২০২২ সালের নির্বাচনে তখনকার সরকারি দল কনজারভেটিভ ও বিরোধী দল লেবারকে হারিয়ে লন্ডনের একটি কাউন্সিলে বিজয়ী প্রথম দল হিসেবে ইতিহাস গড়ে। এবারও সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

৭ মে যুক্তরাজ্যের সর্বত্র স্থানীয় নির্বাচন হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচন। মূলত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ২০১০ সালের ২১ অক্টোবরের নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের বিজয়ের মধ্যদিয়ে বৃটিশ বাংলাদেশিরা বৃটেনে এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেন। ১ম বাংলাদেশি নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখান লুৎফুর রহমান। বৃটেনে ১৩ জন নির্বাচিত মেয়রের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র অশ্বেতাঙ্গ এবং প্রথম মুসলিম ও প্রথম বাংলাদেশি মেয়র। অন্য সকলেই শ্বেতাঙ্গ।
তখন বৃটেনের শীর্ষ পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফে সেরা ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন মেয়র লুতফুর রহমান। টানা ৩য় বারের মতো তিনি এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আগের বারের চেয়ে পরের বার তিনি ২৫ ধাপ এগিয়ে ৫৩ নম্বরে স্থান করে নেন। টপ হান্ড্রেডস মোস্ট ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তিদের মধ্যে লুৎফুর রহমান ২০১১ সালে ৭৮তম স্থান লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি ১০ জনকে টপকে যান। এভাবে দু বছরে ২৫ জনকে ছাড়িয়ে ৭৮ থেকে ৫৩তে স্থান করে নেন।
তবে এ ধরনের প্রভাব ও সাফল্য দেখে একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। ফলে মাঝখানে তাকে অনেক কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়েছে।

এদিকে, মেয়র লুৎফুর রহমানের ৪র্থবার বিজয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন টাওয়ার হ্যামলেটস সহ গ্রেট বৃটেন এমনকি ইউরোপে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, লুৎফুর রহমান বিগত সময়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছেন। এই বিজয় তারই প্রতিদান।
বৃটেন সরকার যখন সারাদেশে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি স্কুল মিল বন্ধ করে দেয় তখন লুৎফুর রহমান তা অব্যাহত রেখেছেন। এমনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট, বৃদ্ধদের জন্য ফ্রি হোম কেয়ার সুবিধা, পুরো বৃটেনে সর্বোচ্চ সংখ্যক সোস্যাল হাউজ নির্মাণসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডই তাকে এই সম্মান এনে দিয়েছে বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেন।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

