জাপানের নাগোয়া শহরে প্রবাসীদের ভালোবাসায় সিক্ত ডা. শফিকুর রহমান

আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

জাপানের বৃহত্তর নাগোয়া শহরে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপিকে মঙ্গলবার (৫মে ২০২৬) প্রবাসীদের পক্ষ থেকে বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পাওয়া আবেগপূর্ণ সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত ডা. শফিকুর রহমানের অনুভূতি প্রকাশও ছিল উষ্ণতায় পরিপূর্ণ। “প্রবাসীরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। আর প্রবাসীরা কষ্টে থাকলে দেশও ঝুঁকিতে পড়বে”- এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তিনি।

নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধান অতিথি ও সংবর্ধিত ব্যক্তিত্ব ডা. শফিকুর রহমান এমপির প্রজ্ঞাদীপ্ত বক্তব্য মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। দেশীয় সংস্কৃতির আমেজে অনুষ্ঠানটি প্রবাসীদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করেছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি ও বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি।

বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে ইসলামিক মিশন জাপান নাগোয়া শাখার তত্ত্বাবধানে এই নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ মাওলানা সাবের আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ড.মাজেদুল ইসলাম। নাগোয়া শহর-সহ বৃহত্তর আইচি প্রিফেকচারে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থী, পেশাজীবী-সহ বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রবাসীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়।

নাগরিক সংবর্ধনায় সুধিজনের প্রতিক্রিয়া প্রাণময়তায় ভরপুর ছিল। প্রবাসীদের মতে, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে ডা.শফিকুর রহমান দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে বেশ সফলতা দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার সুসংহত অবস্থান ঠিকিয়ে রাখা,ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশ রক্ষা, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সরকারি বরাদ্ধে বৈষম্য দূর করে অবহেলিত ও অনগ্রসর অঞ্চলকে অগ্রাধিকার প্রদানে সরকারকে পরামর্শ প্রদান, আধিপত্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষাকারী দালাল বা এজেন্টদের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভাজন তৈরির অপচেষ্টা রোধে সর্বাত্মক প্রয়াস এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সংগ্রামে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ও অব্যাহত প্রচেষ্টা সর্ব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে শুধু শুধু উত্তাপ না ছড়িয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তিনি দেশের ঐক্য ও সংহতির প্রতিকে পরিনত হয়েছেন বলে সাক্ষাতে প্রবাসীদের অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন।

অনুষ্ঠানে ফুলেল শুভেচ্ছায় অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এমপি উপস্থিত প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান শেষে মূল বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, বিগত সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৫ জনসহ বিএনপির আরও একজন নেতা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। সুযোগ থাকার পরও তারা অন্যায়ের পক্ষে গিয়ে এক মুহূর্ত বাঁচতে চান নি বা ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করেননি।

উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আপনারা আমাকে সংবর্ধনা দিয়ে আসলে বাংলাদেশকেই সম্মানিত করেছেন। প্রবাসে থেকেও আপনারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীরা রেমিট্যান্স শাটডাউন-সহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আবার ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। এজন্য আমি আপনাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কারাবন্দী ৩৯ জন প্রবাসী ভাইয়ের মুক্তির বিষয়ে তিনি প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে প্রবাসীদের অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়েও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ইস্যুতে ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হবেই হবে, ইনশাআল্লাহ। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে গণভোট ব্যর্থ হয়েছে, সুতরাং বাংলাদেশেও গণভোট ব্যর্থ হবে না। দেশের প্রায় ৭০% মানুষ গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়ে নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছেন। এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা মানে দেশের প্রতিটি নাগরিককে অপমান করা। বিরোধী দল হিসেবে সংসদে এবং সংসদের বাইরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সকল প্রকার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন বলে উপস্থিত সকলকে আশ্বস্ত করেন। এ সময় “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শ্লোগানে অনুষ্ঠানের হল মুখরিত হয়ে ওঠে।

বিশ্বের অন্যতম উন্নত, সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ দেশ জাপানের প্রযুক্তি এবং জীবনযাত্রার কিছু উজ্জ্বল উদাহরণ দিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাপান বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। জাপানের আদলে একটি নৈতিক, শিক্ষিত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগামী রাষ্ট্র গড়তে তিনি কাজ করে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শুধু জাপান নয়, বিশ্বের সকল বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে একযোগে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিতে তিনি সব ধরণের প্রয়াস অব্যাহত রাখবেন।

ডা. শফিকুর রহমান দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ একদিন একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে, যেদিন দেশে কোনো গুম ও খুন থাকবে না, থাকবে না দারিদ্র্য কিংবা দুর্নীতি। এজন্য তিনি তরুণ সমাজকে কাজ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি এবং বাজার সিন্ডিকেটের কারণে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জাতির এই দুর্ভোগ কমাতে সরকারকে সকল প্রকার চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে। সকল চাঁদাবাজদের শেকড় উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেন তিনি।

উপস্থিত সকলকে দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং আল্লাহর দ্বীন মেনে চলা অপরিহার্য। একটি সমাজে যতদিন আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন দেশের গুম, খুন ও দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে না।

ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত সকলকে দেশের জন্য দোওয়া করতে বলেন এবং বিরোধী দলের যেকোনো ভুল নির্দ্বিধায় ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো ভুল হলে, তা জানালে তিনি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন। একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য বিরোধী দল হিসেবে যা যা করা দরকার তার সবকিছুই তিনি করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তাদের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে হারিয়েছে। জাতিসংঘের রেফারেন্স উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এত মানুষের ত্যাগের পরও এখনো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হয় তাহলে জনগণ কখনো আমাদের ক্ষমা করবেন না। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপর বিগত ফ্যাসিবাদের সময়কার নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে অন্য কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয় সেজন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি বলেন, ৭০% জনগণ যে গণভোটের রায় দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করতেই হবে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, প্রয়োজনে জান দেবেন, কিন্তু শহীদ ওসমান হাদীসহ হাজারো শহীদের জুলাইকে বৃথা যেতে দেবেন না। গণভোটের একটি দাড়ি-কমাও ছাড় দেওয়া হবে না। ক্ষমতাসীনরা যদি জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি করে তাহলে তাদেরকেও রাজপথে মোকাবেলা করা হবে। ‘হয় জন্মভূমি, নয়তো মৃত্যু’ এমন ঘোষণা দিয়ে তিনি জুলাইয়ের মতো আবারও সংগ্রামের জন্য সকল প্রবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
নাগরিক সংবর্ধনার পাশাপাশি ইসলামিক মিশন জাপানের উদ্যোগে একটি পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার প্রবাসীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এছাড়াও উপস্থিত শিশুদের জন্য ছিল ইসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ মাওলানা সাবের আহমদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তিনি নাগোয়াবাসীকে সুন্দর এই আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং বাংলাদেশী কম্যুনিটির জন্য ইসলামিক মিশন জাপানের সহায়তা সবসময় অবারিত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *