গণভোটের রায় অস্বীকার করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে সরকার: গোলাম পরওয়ার

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

ঢাকা–খুলনা–যশোর–ঝিনাইদহ–কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে যশোরে সংবাদ সম্মেলন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংবিধান সংস্কারে গণভোটের রায় অস্বীকার করে সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। ৭০ শতাংশ মানুষের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পতিত সরকারের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে— এমন ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। তবে এ ধরনের ভয় দেখিয়ে জনগণের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ঢাকা–খুলনা–যশোর–ঝিনাইদহ–কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে ১১ অক্টোবর দুপুরে যশোর প্রেস ক্লাবের শহীদ সাংবাদিক গোলাম মাজেদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর–কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসূল এমপি এবং মোক্তার আলী এমপিসহ ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বানে ইতোমধ্যে ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–রংপুর অভিমুখে দুটি লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চও শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে তিনি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭২টি বৈঠকের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। কিন্তু গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যে আইনি কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে, তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারের আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করে অন্য দলগুলোকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে সংবিধান সংশোধনের এই প্রচেষ্টা জনগণের রায়ের পরিপন্থী। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সেই পরিষদের মাধ্যমেই সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ৩১ দফার প্রথম কর্মসূচিতে সংবিধান সংস্কারের কথা বলেছিল। অথচ এখন সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতেও সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জামায়াতের সাত দফা দাবির প্রথমটি তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো সংশোধন নয়; গণভোটে অনুমোদিত আইনি পদ্ধতিতেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এই পদ্ধতি অনুসরণ না করার অর্থ জনগণের আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

সরকারের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের কাছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাওয়া হয়েছিল। জনগণ চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছে, তাই সরকারকে সেই রায় মেনে নিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন; অনেকে চোখ হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং শরীরে বুলেটের স্প্লিন্টার নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দেশকে পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকেই মানুষ জীবন দিয়েছেন। তাই এত বড় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর গণভোটের রায় উপেক্ষা করা যায় না।

তিনি বলেন, অধিবেশনের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক আহ্বান এবং ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে জনগণের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানাতেই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, যার মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে জনমত সংগঠিত করা হবে।

সাত দফা দাবির দ্বিতীয় দফায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। খুলনায় পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশ দিয়ে পুলিশ সুপারের চিঠি জারির বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

তৃতীয় দফা দাবিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

চতুর্থ দফা দাবিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসনের কথা বলেন তিনি। বিএনপির কর্মীরাই সারের ডিলার হবেন—একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপির স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। কিন্তু বাস্তবে মনে হচ্ছে, ‘সবার আগে বিএনপি’।

পঞ্চম দফা দাবিতে সরকারি নিয়োগ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে দলীয়করণ বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, চাকরিতে নিয়োগ, হাট-বাজার ও স্কুল কমিটি গঠন, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা প্রণয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় লোকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে।

ষষ্ঠ দফা দাবিতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাকস্ট্যান্ড, বেবিস্ট্যান্ড, বালুর ঘাট ও নদীর ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি চলছে। তাঁর ভাষ্য, আগের সরকারের নাম পরিবর্তন হলেও চরিত্র ও আচরণে পরিবর্তন আসেনি।

সপ্তম দফা দাবিতে জুলাইয়ের গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তির বিচার হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। অনেকে পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া নিষিদ্ধ একটি দলের মিছিল এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে যে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে, তা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই তাঁদের এই কর্মসূচি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। লংমার্চের মাধ্যমে সরকারের বোধোদয় হবে এবং সরকার গণবিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে সঠিক পথে ফিরবে বলে তাঁরা আশা করেন।

তিনি জানান, এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের অধীনে দুটি লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণ থাকবে। তবে লংমার্চের কারণে সাময়িকভাবে যাতায়াত ও চলাচলে যে অসুবিধা হতে পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ব্যবসায়ী, পথচারী ও সর্বস্তরের মানুষের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

লংমার্চের কর্মসূচি

লংমার্চের বিস্তারিত তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্ধারিত দিনে সকাল ৭টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে সংক্ষিপ্ত জনসভার মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর পদ্মা সেতু হয়ে প্রায় এক হাজার গাড়ির বহর কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করবে। পথে যশোরের মুড়লী মোড় ও ঝিনাইদহে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। পরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে সমাবেশ হবে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন।

প্রায় ১২ ঘণ্টার এই কর্মসূচিতে গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসক, শিল্পী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেবেন বলে তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাবের শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান অডিটোরিয়ামে খুলনা বিভাগের সংসদ সদস্য ও জেলা নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে লংমার্চের প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *