নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পরমত সহিষ্ণুতা চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে, আলেম-ওলামাদের অন্যের রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি না হয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট নীতি, আদর্শ ও সাংগঠনিক শক্তির ভিত্তিতে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলমান ইসলামি বইমেলার মঞ্চে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তাঁর উত্তরসূরি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণে এনসিপির সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স প্রকাশিত সাময়িকী ‘তুরাস’র প্রথম সংখ্যা ‘উত্তরাধিকার পর্ব–১’-এর মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাচনের সময় এলে অতীতে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর অনেকে টুপি-পাঞ্জাবি পরে বিভিন্ন মাদরাসায় গিয়ে আলেমদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই আলেম সমাজকে প্রান্তিক ও অনগ্রসর হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।
তিনি বলেন, “আমাদের নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। আমরা যেন অন্য কারও রাজনৈতিক গেমের ঘুঁটি না হই, বরং নিজেদের খেলা নিজেরাই খেলি।”
বিগত সরকারের আমলে আলেম-ওলামাদের ওপর নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে আলেমদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে এসব ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স প্রকাশিত ‘তুরাস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ওই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ করে অনেক আগেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক মানের তথ্যভিত্তিক নথি তৈরি করা উচিত ছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা অনিরাপদ হয়ে পড়বেন- এমন রাজনৈতিক প্রচারকে ভুল প্রমাণে আলেমদের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্য ধর্মের উপাসনালয় পাহারা দিয়ে আলেম-ওলামারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় আলেম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এনসিপি নেতা বলেন, “আওয়ামী লীগ সব সময় একটা কার্ড খেলত— তারা যদি না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে থাকা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অনিরাপদ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো রাত জেগে পাহারা দিয়ে আমাদের আলেম-ওলামা ভাইয়েরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ মিথ্যার ওপর রাজনীতি করেছে।”
দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম-ওলামাদের উগ্রবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল এবং তাঁদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়- এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ ধরনের ধারণার জবাব কেবল বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বরং নিজেদের কাজ ও আচরণের মধ্য দিয়ে দিতে আলেমদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে অন্য ধর্মাবলম্বীরা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, “এটা যে মিথ্যা, তা আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আপনাদের এক নম্বর দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য ধর্মের যাঁরা আছেন, তাঁরা যেন নিজেদের ধর্মীয় আচার-আচরণ, কালচার-কৃষ্টি যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখা।”
পরমত সহিষ্ণুতা চর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ৫ আগস্টের পর ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও মতবিনিময় হবে। তবে মতপার্থক্য যেন অসহিষ্ণুতার অভিযোগে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে আলেমদের সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য নিজেদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, নিজস্ব গবেষণা, তথ্যভিত্তিক প্রকাশনা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে আলেম সমাজ নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে এবং প্রচলিত ধারণার জবাব দিতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যের পর হাসনাত আবদুল্লাহ-সহ এনসিপি ও ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের নেতারা ‘তুরাস’র প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।

