কেবল স্ট্রিটের ৯০ বছর : ইতিহাসের মশাল হাতে লন্ডনে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের ডাক

যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী:

নব্বই বছর আগে এই কেবল স্ট্রিটেই ঘৃণা আর বিভেদের মিছিল থমকে দাঁড়িয়েছিল মানুষের ঐক্য ও প্রতিরোধের সামনে। ৯০ বছর পর, সেই একই জায়গায় আবারও উচ্চারিত হলো এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার- নয় ফ্যাসিবাদ, নয় বর্ণবাদ। আর নয় ইসলামবিদ্বেষ, নয় ইহুদিবিদ্বেষ। ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষকে ঘৃণা করার অধিকার কারও নেই। সভ্যতা কখনো ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে না- সভ্যতা গড়ে ওঠে মানুষের মর্যাদা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর।

৯০ বছর পর কেবল স্ট্রিটে যেন আবার আমাদের মনে করিয়ে দিল- ঐক্যই আমাদের শক্তি। মানবতাই আমাদের পরিচয়। আর বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই সভ্য সমাজে। দৃঢ় কন্ঠে আবারো উচ্চারিত হল- ঘৃণার বিরুদ্ধে, বিভেদের বিরুদ্ধে মানবতা জেগে উঠুক।

১৯৩৬ সালের ৪ অক্টোবর লন্ডনের ইস্ট এন্ডে ফ্যাসিবাদী নেতা অসওয়াল্ড মোসলির মিছিল প্রতিহত করার ঐতিহাসিক ঘটনা ‘কেবল স্ট্রিটের যুদ্ধ’। প্রতিরোধ আন্দোলনের ৯০তম বার্ষিকী উপলক্ষে রোববার লন্ডনে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য মিছিল ও সমাবেশ। এতে অংশ নেন রাজনীতিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ।

টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হল থেকে শুরু হওয়া মিছিল শেষ হয় কেবল স্ট্রিটের সেন্ট জর্জেস গার্ডেনে আয়োজিত সমাবেশে। সেখানে মহান মানবতাবাদী নেতাদের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে শান্তি, সমতা এবং মানবতার বাণী। তাদের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে ১৯৩৬ সালের সেই প্রতিরোধের স্মৃতি। উচ্চারিত হয়েছে বর্তমান সময়ের বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা।

মঞ্চে সাড়া জাগালেন করবিন, গ্রাহাম, লুতফুর, জালাল-সহ শীর্ষ নেতারা

লেবার পার্টির সাবেক প্রধান লন্ডন ইসলিংটন নর্থের এমপি জেরেমি করবিন, পপলার অ্যান্ড লাইমহাউসের এমপি আপসানা বেগম, ইউনাইটের সাধারণ সম্পাদক শ্যারন গ্রাহাম, টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান, টিইউসি’র সাধারণ সম্পাদক পল নওয়াক, এনইইউর সাধারণ সম্পাদক ড্যানিয়েল কেবেডে, আরএমটির সাধারণ সম্পাদক এডি ডেম্পসি, আলতাব আলী ফাউন্ডেশনের জালাল রাজনউদ্দিন-সহ বহু সংগ্রামী-মানবতাবাদী অংশ নিয়েছিলেন।

ইউরোপের বৃহৎ ইসলামী কমপ্লেক্স ‘লন্ডন মুসলিম সেন্টার ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের ইমাম ও খতিব শায়েখ সৈয়দ আনিসুল হক-সহ ইহুদি, মুসলিম, এশীয়, আফ্রিকান ও স্থানীয় কমিউনিটি ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন।

করবিনের কণ্ঠে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা

সমাবেশে জেরেমি করবিন বলেন, কেবল স্ট্রিটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একটি জনগোষ্ঠীর জন্য নয়। যেখানেই বর্ণবাদ মাথা তুলবে, সেখানেই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

অভিবাসী ও শরণার্থীদের নিয়ে বর্তমান রাজনীতিতে ব্যবহৃত বর্ণবাদী ভাষার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান মানে হলো সব ধরনের বর্ণবাদের বিরোধিতা করা। করবিনের বক্তব্যে ইসলামবিদ্বেষ এবং ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে।

শ্যারন গ্রাহাম: ‘এটি শ্রমজীবী মানুষের সময়’

ইউনাইটের সাধারণ সম্পাদক শ্যারন গ্রাহাম ‘কেবল স্ট্রিট’র ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের যোগসূত্র তুলে ধরে বলেন, ১৯৩৬ সালের ফ্যাসিবাদী আন্দোলন এবং আজকের অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে থাকা শ্রমজীবী মানুষের ক্ষোভকে উগ্র ডানপন্থীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

গ্রাহামের ভাষায়, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়- এটি শ্রমজীবী মানুষের সময়।” অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আরও দুর্বল হলে মানুষের ক্ষোভ ‘ফ্যাসিবাদী আগুনে’ পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

মেয়র লুৎফুর রহমান: ‘অভিবাসীদের অবদানেই আজকের টাওয়ার হ্যামলেটস’

টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান ইস্ট লন্ডনের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রের কথা তুলে ধরে বলেন, অভিবাসী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের সম্মিলিত অবদানেই গড়ে উঠেছে আজকের টাওয়ার হ্যামলেটস।

১৯৩৬ সালের কেবল স্ট্রিটের প্রতিরোধের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেদিন স্থানীয় মানুষ ফ্যাসিবাদীদের কার্যত জানিয়ে দিয়েছিল- “তোমরা পারবে না, তোমাদের অগ্রযাত্রা এখানেই থামবে।”

বর্তমানেও টাওয়ার হ্যামলেটসে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না- এমন দৃঢ় বার্তা দেন তিনি।

ডিক্লান কিয়ারনি: কেবল স্ট্রিট থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের গারভাঘি রোড

সমাবেশে সিন ফেইনের জাতীয় চেয়ারম্যান ও এমএলএ ডিক্লান কিয়ারনি কেবল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের গারভাঘি রোডের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তুলনা করেন। দুই ঘটনার মধ্যে “ঐতিহাসিক সাদৃশ্য স্পষ্ট” বলে উল্লেখ করেন তিনি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের বিষয়ে গুরুত্বরোপ করেন তিনি।

জালাল রাজনউদ্দিন: বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বান

কেবল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক লড়াই স্মরণে লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী সমাবেশে আলতাব আলী ফাউন্ডেশনের সংগ্রামী নেতা জালাল রাজনউদ্দিন বলেন, বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্য ও সংহতির আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ব্রিটেনের অতীত থেকে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে রাজনৈতিক মঞ্চ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন জনপরিসরে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্ণবাদের পাশাপাশি ইসলামোফোবিয়া-সহ সকল প্রকার বৈষেম্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়ে যেতে হবে।

১৯৭৮ সালের ৪ মে বর্ণবাদী হামলায় আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠার বর্ণনা দিয়ে জালাল রাজনউদ্দিন বলেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে বর্ণবাদী রাজনীতিকে শক্তিশালী হতে দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকারকর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন, কমিউনিটি সংগঠন এবং বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন।

ইমাম আনিসুল হক: ন্যায় ও সম্প্রীতির পক্ষে ইস্ট লন্ডন মসজিদ

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ইহুদি বাসিন্দা, আইরিশ ডকার, ট্রেড ইউনিয়নবাদী এবং শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন বজায় রেখে আসছে।

ইমাম আনিসুল হক তাঁর বক্তব্যে ন্যায়বিচারের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কুরআনের বাণী তুলে ধরেন। তিনি ইসলামোফোবিয়া, ইহুদিবিদ্বেষ এবং অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংহতি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান প্রতিফলিত হয়।

কেবল স্ট্রিটের ৯০ বছর: যে বার্তা আজো অমলিন

১৯৩৬ সালের কেবল স্ট্রিটের ঘটনা ছিল লন্ডনের ইস্ট এন্ডের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেদিন ইহুদি ও আইরিশ শ্রমজীবী মানুষসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে মোসলির ফ্যাসিস্ট মিছিল তার নির্ধারিত পথে এগোতে পারেনি। নব্বই বছর পর সেই ঘটনার স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বর্তমান ব্রিটেনের অভিবাসন, বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ, শ্রমজীবী মানুষের সংকট এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির প্রসঙ্গ।

সমাবেশের মূল স্লোগান ছিল ‘ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে’,’ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে’ তথা সব ধরনের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। কেবল স্ট্রিটের ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়- আগামীর শক্তি হিসেবে বর্তমান প্রজন্মের জন্যও একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা। বিভাজনের বদলে ঐক্য, বিদ্বেষের বদলে সহাবস্থান এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ।

* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *