নাজিউর রহমান সোহেল
দেশে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হ্রাস, তাদের মানসিক ও আবেগীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার সমীক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তত্ত্বাবধানে বেসরকারি মানসিক স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘মনের বন্ধু’ এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কারিগরি নির্দেশনায় পরিচালিত ‘লাইভ লাইফ’ কর্মসূচির আওতায় যশোর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ— এই চারটি বিশেষ জেলায় প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মাউশি অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ চারটি জেলার নির্বাচিত উপজেলার (চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও শিবগঞ্জ, ঝিনাইদহের সদর ও শৈলকুপা, যশোরের সদর ও ঝিকরগাছা এবং সিলেটের সদর ও বিশ্বনাথ উপজেলা) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এ সমীক্ষা চালানো হবে। এতে সফলতা পেলে বাস্তবতা বিবেচনায় কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো হবে।
মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাসস’কে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যা প্রবণতার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। এই সমীক্ষার মাধ্যমে আমরা একটি বৈজ্ঞানিক উপাত্তভিত্তিক সমাধান খুঁজছি, যা ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি স্থায়ী মডেল হিসেবে কাজ করবে।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সমীক্ষার আওতায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে সরাসরি সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আত্মহত্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ নীতিমালা’ প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বাসস’কে বলেন, ‘দেশের কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি প্রশমনে একটি সমীক্ষা শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মনের বন্ধু’ দেশের নির্বাচিত উপজেলায় এ সমীক্ষা পরিচালনা করছে। এ সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সমীক্ষা কর্মসূচির প্রাথমিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যার মাধ্যমে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের মানসিক অস্থিরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ কার্যক্রম শেষে প্রাপ্ত ফলাফল ও প্রতিবেদন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ও প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত হলে, ভবিষ্যতে দেশজুড়ে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।’
২০ হাজার শিক্ষার্থী ও ২৮৮ শিক্ষক পাবেন বিশেষ প্রশিক্ষণ
মাউশি জানিয়েছে, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে নির্বাচিত ৪টি জেলার ২শ’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১শ’ জন করে মোট ২০ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। যেখানে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে এক ঘণ্টার বিশেষ সেশন পরিচালনা করা হবে।
মাউশির তথ্য অনুযায়ী, সমীক্ষার অধীনে ২৮৮ জন শিক্ষক ও কমিউনিটি স্টেকহোল্ডারদের জন্য ৮টি পৃথক কর্মশালা হবে। ২৫ থেকে ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিলেটে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া আগামী ৩ থেকে ৫ মে যশোর ও ঝিনাইদহে আরেকটি কর্মশালা হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ‘ফোকাল পারসন’ হিসেবে কাজ করবেন। একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করবেন।
সম্প্রতি মাউশি’র পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা থেকে জারিকৃত এক আদেশে মাঠ পর্যায়ের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের এ সমীক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সমীক্ষায় মানতে হবে যেসব শর্ত
সমীক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মাউশি অধিদপ্তর বেশ কিছু শর্ত বেধে দিয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্দেশনা এবং পরিপত্র বা কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এ সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত না করে এই সচেতনতামূলক সেশন ও তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করতে হবে; কার্যক্রম চলাকালীন জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনার পরিপন্থি কোনো কাজ বা প্রচারণা চালানো যাবে না।
শর্তানুযায়ী, প্রকল্পের সকল ধাপে তৈরিকৃত মডিউল ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সরাসরি মনিটরিং ও সুপারভিশনের আওতায় থাকবে; সমীক্ষায় সংগৃহীত তথ্যের যথাযথ গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। কার্যক্রম শেষে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন মাউশি অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে। পরবর্তীতে মাউশি অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্রও তৈরি করা হবে।
মাউশির সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মিনহাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে— পারিবারিক কলহের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের শিকার হওয়া কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ। সমীক্ষা প্রকল্পের আওতায় আমরা শিক্ষকদের ‘ট্রেইনার’ হিসেবে গড়ে তুলছি, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের একাকীত্ব বা অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করে সঠিক ‘কাউন্সেলিং’ করতে পারেন।’
এর আগে, প্রকল্পের প্রথম ধাপে (নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৫) এই ৪টি জেলায় আত্মহত্যার ঝুঁকি ও কারণ অনুসন্ধানে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি বিশেষ মডিউল তৈরি করা হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মনের বন্ধু’ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে; যেখানে বাংলাদেশেও কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উঠে এসেছে। বাসস

